আল্লাহ মৃতদেহ নিয়ে কি করবেন? কবর বলতে কি বুঝায়?

কবর সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমে জানতে হবে, মৃত্যুর পর মানুষের রুহ বা আত্মা কোথায় যায় এবং কোথায় অবস্থান করে। কিয়ামত সংঘটিত হবার পরে বিচার শেষে মানুষ জান্নাত বা জাহান্নামে অবস্থান করবে। কিন্তু এর পূর্বে সুদীর্ঘকাল মানুষের আত্মা কোথায় অবস্থান করবে? কোরআন-হাদীসে এর স্পষ্ট জবাব রয়েছে। মৃত্যুর পরের সময়টিকে যদিও পরকালের মধ্যে গণ্য করা হয়েছে, তবুও কোরআন-হাদীস মৃত্যু ও বিচার দিনের মধ্যবর্তী সময়কে আলমে বরযখ নামে অভিহিত করেছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
এবং তাদের পেছনে রয়েছে বরযখ- যার সময়কাল হচ্ছে সেদিন পর্যন্ত যেদিন তাদেরকে পুনর্জীবিত ও পুনরুত্থিত করা হবে। (সূরা মুমিনুন-১০০)

এই আয়াতে যে বরযখ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, এর অর্থ হলো যবনিকা পর্দা। অর্থাৎ পর্দায় আবৃত একটি জগৎ-  যেখানে মৃত্যুর পর থেকে আখিরাতের পূর্ব পর্যন্ত মানুষের রুহ্‌ অবস্থান করবে। ইসলাম পাঁচটি জগতের ধারণা মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছেপ্রথম জগৎ হলো, রুহ্‌ বা আত্মার জগৎ-  যাকে আলমে আরওয়াহ্‌ বলা হয়েছেদ্বিতীয় জগৎ হলো মাতৃগর্ভ বা আলমে রেহেমতৃতীয় জগৎ হলো আলমে আজসাম বা বস্তুজগৎ-  অর্থাৎ এই পৃথিবীচতুর্থ জগৎ হলো আলমে বরযাখ বা মৃত্যুর পর থেকে আখিরাতের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত যে সুক্ষ্ম জগৎ রয়েছে, যেখানে মানুষের আত্মা অবস্থান করছেপঞ্চম জগৎ হলো আলমে আখিরাত বা পুনরুত্থানের পরে অনন্তকালের জগৎ 
এ কথা স্পষ্ট মনে রাখতে হবে যে, রুহ বা আত্মার কখনো মৃত্যু হয় না। মৃত্যুর পর এই পৃথিবী থেকে আত্মা আলমে বরযখে স্থানান্তরিত হয়। অর্থাৎ আত্মা দেহ ত্যাগ করে মাত্র, তার মৃত্যু হয় না। আলমে বরযখের বিশেষভাবে নির্দিষ্ট যে অংশে আত্মা অবস্থান করে সে বিশেষ অংশের নামই হলো কবর।
বাহ্যিক দৃষ্টিতে কবর একটি মাটির গর্ত মাত্র যার মধ্যে মৃতদেহ সমাহিত করা হয়। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই দেহ পচে গলে যায়। মাটি এই দেহ খেয়ে নিঃশেষ করে দেয়। কিন্তু প্রকৃত কবর এক অদৃশ্য সুক্ষ্ম জগৎ। যা মানুষের জ্ঞান, বুদ্ধি ও কল্পনারও অতীত। প্রকৃত ব্যাপার হলো, মৃত্যুর পর মানুষ কবরস্থ হোক, চিতায় জ্বালিয়ে দেয়া হোক, বন্য জন্তুর পেটে যাক অথবা পানিতে ডুবে মাছ বা পানির অন্য কোনো প্রাণীর পেটে যাক, সেটা ধর্তব্য বিষয় নয়। মানুষের দেহচ্যুত আত্মাকে যে স্থানে রাখা হবে সেটাই তার কবর। অর্থাৎ মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে আখিরাতের পূর্ব পর্যন্ত যে অদৃশ্য জগৎ রয়েছে, সেই জগতকেই আলমে বরযখ বলা হয় এবং আলমে বরযখের নির্দিষ্ট অংশ, যেখানে মানুষের আত্মাকে রাখা হয়- সেটাকেই কবর বলা হয়। মাটির গর্ত কবর নয়-  আলমে বরযখে দুটো স্থানে মানুষের আত্মাকে রাখা হবে। একটি স্থানের নাম হলো ইল্লিউন আর আরেকটি স্থানের নাম হলো সিজ্জীন। ইল্লিউন হলো মেহমানখানা, অর্থাৎ পৃথিবীতে যারা মহান আল্লাহর বিধান অনুসারে নিজেদের জীবন পরিচালিত করেছে, তারাই কেবল ঐ মেহমানখানাই স্থান পাবে। আর যারা পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান অমান্য করেছে, নিজের খেয়াল-খুশী অনুসারে চলেছে, মানুষের বানানো আইন-কানুন অনুসারে জীবন চালিয়েছে, তারা স্থান পাবে সিজ্জীনে। সিজ্জীন হলো কারাগার। আল্লাহর কাছে যারা আসামী হিসেবে পরিগণিত হবে, তারা কারাগারে অবস্থান করবে।
কোরআন-হাদীস স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, কবরে ভোগ-বিলাস অথবা ভয়ঙ্কর আযাবের ব্যবস্থা থাকবে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত রয়েছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের যে কেউ মৃত্যুবরণ করে, তাকে তার অন্তিম বাসস্থান সকাল-সন্ধ্যায় দেখানো হয়সে জান্নাতী হোক বা জাহান্নামী হোকতাকে বলা হয়, এটাই সেই বাসস্থান যেখানে তুমি তখন প্রবেশ করবে যখন আল্লাহ তা’য়ালা কিয়ামতের দিনে দ্বিতীয়বার জীবনদান করে তাঁর কাছে তোমাকে উপস্থিত করবেন। (বোখারী, মুসলিম)
ইন্তেকালের পরপরই কবরে বা আলযে বরযখে গোনাহ্‌গারদের শাস্তি ও আল্লাহর বিধান অনুসরণকারী বান্দাদের সুখ-শান্তির বিষয়টি মহাগ্রন্থ আল কোরআন এভাবে ঘোষণা করেছে-
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
যদি তোমরা সে অবস্থা দেখতে যখন ফেরেশ্‌তাগণ কাফিরদের আত্মা হরণ করছিলো এবং তাদের মুখমন্ডলে ও পার্শ্বদেশে আঘাত করছিলো এবং বলছিলো, নাও, এখন আগুনে প্রজ্জ্বলিত হওয়ার স্বাদ গ্রহণ করো। (সূরা আনফাল-৫০)
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনের আরেক আয়াতে বলেন-
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
ঐসব আল্লাহভীরু লোকদের রুহ্‌ পবিত্র অবস্থায় যখন ফেরেশ্‌তাগণ বের করেন তখন তাদেরকে বলেন, আস্‌সালামু আলাইকুম। আপনারা যে সৎ কাজ করেছেন এর বিনিময়ে জান্নাতে প্রবেশ করুন। (সূরা নহল-৩২)
বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, আলমে বরযখে বা কবরে মানুষকে শ্রেণী অনুসারে জান্নাত বা জাহান্নামে প্রবেশের কথা শুনানো হয়। আখিরাতে বিচার শেষে জান্নাত বা জাহান্নামে প্রবেশের পূর্বে আলমে বরযখে বা কবরে আযাবের মধ্যে সময় অতিবাহিত করবে আল্লাহর বিধান অমান্যকারী লোকজন এবং যারা কোরআনের বিধান অনুসারে চলেছে তারা পরম শান্তির পরিবেশে সময় অতিবাহিত করবে। সুতরাং মৃত্যুর পরে মানুষের দেহ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক, এটা কোনো বিষয় নয়, যা কিছু ঘটবে তা আত্মার ওপর ঘটবে অথবা আল্লাহ তা’য়ালা ইচ্ছে করলে ঐ দেহ তৎক্ষণাত প্রস্তুত করতেও সক্ষমকবর ভেঙ্গে যাক বা নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যাক এটা ধর্তব্য বিষয় নয়কবরে শান্তি বা আযাবের বিষয়টি অবধারিত সত্য, কোরআন-হাদীসে এ ব্যাপারে স্পষ্ট কথা বলা হয়েছে।
পরকালীন জগৎ কাল্পনিক কোনো জগৎ নয়
এ কথা স্পষ্ট মনে রাখতে হবে যে, এই পৃথিবীর জীবন হলো একজন মুসাফীরের অনুরূপ। এই জীবন মাকড়সার জালের ন্যায় অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। যে কোনো মুহূর্তে ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর এই জীবন ধ্বংস হয়ে যাবে। আর এই দৃশ্য আমরা সময়ের প্রত্যেক মুহূর্তে অবলোকন করছি। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ার ক্ষমতা কারো নেইবৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষিত-অশিক্ষিত এবং পৃথিবীর সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি পর্যন্ত কেউ-ই মৃত্যুর অমোঘ ছোবল থেকে সুরক্ষিত কোনোকালে থাকেনি মহান আল্লাহর চিরন্তন বিধানে প্রাণীজগতের সকল প্রাণীকেই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার জীবন ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে, হতে হচ্ছে এবং আগামীতেও হতে হবে। গতকাল সমাজের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় সমাসীন ব্যক্তি আজ কফিনে আবৃত হয়ে নিরব-নিস্তব্ধ অবস্থায় পরকালের অনন্ত জগতে প্রবেশ করতে বাধ্য হচ্ছে।
বিষয়টি এখানেই শেষ নয়, মাতৃগর্ভে অবস্থানকালে অবোধ শিশুটি এই পৃথিবীর বিশালত্ব সম্পর্কে সামান্যতম ধারণা লাভ করেনি, তাই বলে এই চলমান পৃথিবীর ক্রিয়াকলাপ অস্তিত্বহীন ছিলো নাঅনুরূপভাবে বুঝতে হবে, মানুষ এই পৃথিবীতে অবস্থানকালে পরকালীন জগৎ সম্পর্কে কোনো কিছু অনুভব করতে সক্ষম না হলেও পরকালীন জগৎ কাল্পনিক কোনো জগৎ নয় মৃত্যুর পরের জগৎ একটি অটল বাস্তবতা, একটি কঠিন সত্য এবং অনঢ় অবিচল বাস্তব সত্য। পৃথিবীর যাবতীয় কর্মকান্ডের পুক্মখানুপুক্মখ হিসাব দিতে হবে এবং হিসাবের পরে কেউ সৎকর্মের পুরস্কার হিসাবে জান্নাত লাভ করবে আবার কেউ অসৎ কর্মের শাস্তি হিসাবে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। এসব বিষয় কোনো উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা নয়, অবশ্যই পরকাল ঘটবে এবং মহান আল্লাহর সামনে সমস্ত মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে। এ জন্য পৃথিবীর এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের ওপর পরকালীন জীবনকে প্রাধান্য দিতে হবে। দুনিয়ার জীবনে পরকালীন জীবনকে প্রাধান্য দিতে সক্ষম না হলে কোরআন সুন্নাহর বিধি-বিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য করা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। আর পরকালীন জীবনকে প্রাধান্য দিতে না পারলে তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত। পরকালীন জীবনে সফলতা অর্জন করতে হলে এই পৃথিবী থেকেই মুক্তির যাবতীয় উপায়-উপকরণ সংগ্রহ করতে হবে। এ জন্য দুনিয়ার এই স্বল্পকালীন জীবনকে মুক্তির সম্বল হিসাবে কাজে লাগাতে হবে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন- 
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
হে ঈমানদাররা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করোআর প্রত্যেক ব্যক্তির অপরিহার্য কর্তব্য হলো, সে যেনো পরকালের জন্য পূর্বেই কি সম্বল সংগ্রহ করেছে তা ভেবে জীবন পথে অগ্রসর হওয়া। (আবার শোন) তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই তোমরা যা করছো আল্লাহ তা’য়ালা তার সবটাই জানেনতোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির উপযোগী যা করছো তাও তিনি দেখেন ও জানেন। (কোরআন)

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অসন্তুষ্ট হতে পারেন, এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ড তোমাদের দ্বারা সংঘটিত হলে সেটাও তিনি পরিপূর্ণরূপে দেখেন ও জানেন। পৃথিবীর জীবনে অন্যায় ও অপরাধমূলক কর্মের সমুদ্রেও যদি তোমরা নিমজ্জিত হও, তাহলে পরকালের জীবনে আল্লাহ তা’য়ালাকে বিচার এড়িয়ে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারবে না। কারণ তিনি তোমাদের আদি-অন্ত, প্রকাশ্য-গোপন, ন্যায়-অন্যায় ও ইনসাফ-জুলুম সমস্ত কিছুই জানেন ও দেখেন। সুতরাং সাবধান! আমার সাথে হঠকারিতা করো না। অনন্ত অসীম পরকালের জীবনে চিরস্থায়ী শান্তির স্থান জান্নাত লাভ ও মহান আল্লাহ তা’য়ালার দর্শন লাভের সম্বল সংগ্রহের স্থান এই পৃথিবীর জীবনকে অবহেলায় কাটিয়ে দিও না। পৃথিবীর জীবনের সদ্ব্যবহার করো তাহলে তোমরা আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করে জান্নাত লাভ করতে পারবে। পৃথিবীর জীবনের প্রত্যেকটি মুহূর্ত পরকালের জীবনে মুক্তির পথে ব্যয় করবে
পাঁচটি প্রশ্নের জবাব দিতে হবে
তিরমিযী হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন- 
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
পাঁচটি অবস্থার পূর্বে পাঁচটি অবস্থাকে গনীমত বলে গণ্য করবে। (১) বার্ধক্যের পূর্বে যৌবনকে। (২) অসুস্থতার পূর্বে সুস্থতাকে। (৩) অভাবের পূর্বে স্বচ্ছলতাকে। (৪) অধিক ব্যস্ততার পূর্বে অবসরকে। (৫) মৃত্যুর পূর্বে হায়াতকে
অর্থাৎ সৎকাজে অলসতা করো না, গোনাহের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তোমার জীবন আর কতক্ষণ অবশিষ্ট রয়েছে, তুমি কতক্ষণ সুস্থ থাকবে আর অবসর পাবে কিনা তুমি জানো না। তাই আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে নিজেকে নিয়োজিত করো। আল্লাহর অসন্তুষ্টির কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখো। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু বর্ণনা করেছেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- 
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
কিয়ামতের দিন আদম সন্তানের দুই পা কোনো দিকে নড়াতে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে। (১) পৃথিবীতে তাকে যে হায়াত দেয়া হয়েছিলো, সে হায়াত কোন্‌ পথে ব্যয় করা হয়েছে। (২) সে তার যৌবনকে কোন্‌ পথে ব্যয় করেছে। (৩) সম্পদ কোন্‌ পথে উপার্জন করেছে। (৪) সম্পদ কোন্‌ পথে ব্যয় করেছে। (৫) যে জ্ঞান তাকে দেয়া হয়েছিলো, তা কোন্‌ কাজে লাগিয়েছে। (তিরমিযী)
 এই পাঁচটি প্রশ্নের যথাযথ জবাব দিতে হবে এবং সন্তোষজনক জবাবের ওপর নির্ভর করবে মানুষের মুক্তি ও পুরস্কার। আর যথাযথ জবাব দিতে ব্যর্থ হলে, তাকে ভোগ করতে হবে অবর্ণনীয় শাস্তি এবং তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। এই পৃথিবীতে প্রত্যেক মানুষকেই উল্লেখিত প্রশ্নের জবাব দিতেই হবে, কারণ প্রত্যেকেই নিজের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। সে যাকিছু পৃথিবীতে করছে, এর দায়-দায়িত্ব একান্তভাবেই তার নিজের ওপর বর্তাবে এবং তাকে জবাবদিহি করতে হবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন-
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
ভালো করে জেনে রাখো, তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন- 
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
যে ব্যক্তি তার রব-এর মহাবিচারের সম্মুখে উপস্থিতিকে ভয় করলো এবং নিজের সত্তাকে কু-প্রবৃত্তির তাড়না থেকে বিরত রাখলো তার ঠিকানা হলো জান্নাত
পক্ষান্তরে যারা মৃত্যুর পরের জীবনকে অবিশ্বাস, অবহেলা ও অবজ্ঞা করে পৃথিবীর ক্ষণস্থায়ী জীবনকে একমাত্র জীবন বলে ভোগ-বিলাসে মেতে থাকবে, ন্যায় অন্যায়বোধ বিসর্জন দেবে, ইনসাফকে উপেক্ষা করে চলবে, আল্লাহর দাসত্ব ত্যাগ করে শিরক্‌-এ লিপ্ত হবে, হারাম-হালালবোধ বিস্মৃত হয়ে অন্যের অধিকার হরণ করে সম্পদের স্তুপ গড়বে, মানুষের সম্মান-মর্যাদাবোধের প্রতি আঘাত হানবে, জুলুম-অত্যাচার করবে তথা পরকালীন জীবনের তুলনায় দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিবে, তারা অবশ্যই মৃত্যুর পরের জীবনে এক ভয়াবহ বিপদের সম্মুখিন হবে। এসব লোকদেরকে আখিরাতের ময়দানে মহান আল্লাহ শুনিয়ে দেবেন- 
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
তোমাদের (জন্য বরাদ্দকৃত) নে’মাতসমূহ তোমরা দুনিয়ার জীবনে শেষ করে এসেছো, আর সবকিছু তোমাদের ইচ্ছা মতোই ভোগ করেছোআজ তোমরা অপমানকর শাস্তি পাচ্ছো এ জন্য যে, তোমরা দুনিয়ার যমীনে অহঙ্কার করতে আর এ জন্য যে, তোমরা অপরাধ করছিলে। (কোরআন)
প্রথমে মুসলমান হতে হবে
আখিরাতের ময়দানে মানুষকে যে পাঁচটি প্রশ্ন করা হবে এবং এই প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাবের ওপর নির্ভর করবে মানুষের মুক্তি ও কল্যাণ। আখিরাতের ময়দানে উল্লেখিত পাঁচটি প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব কেবলমাত্র তারাই দিতে সক্ষম হবে, যারা কোরআন-হাদীসের মানদন্ডে মুসলমান হিসেবে পৃথিবীতে জীবন-যাপন করবে। বর্তমানে মুসলিম হিসেবে পরিচিত পিতা-মাতার মাধ্যমে পৃথিবীতে আগমন করলেই মুসলিম পরিচিতি লাভ করা যায়কোরআন-হাদীস অনুযায়ী মুসলিম দাবীদার ব্যক্তি আদৌ মুসলিম কিনা-  তা যাচাই করে দেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা হয় না। বর্তমানে মুসলিম নামে পরিচিত সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিন যাবৎ এই ধারণার জন্ম দেয়া হয়েছে যে, মুসলিম নামে পরিচিত পিতামাতার ঘরে জন্ম গ্রহণ করলেই মুসলমান হওয়া যায়। মুসলমান হওয়ার জন্য কোরআন-হাদীস তথা ইসলামী নীতিমালা অনুসরণের প্রয়োজন নেই এবং খান, সর্দার, চৌধুরী, ভূঁইয়া, প্রামাণিক, দেওয়ান, শিকদার, সরকার ইত্যাদি পদবিধারী ব্যক্তির সন্তান যেমন স্বাভাবিকভাবেই উল্লেখিত পদবি ব্যবহার করতে পারে, তেমনি মুসলিম হিসেবে পরিচিত ব্যক্তির সন্তানও নিজেকে মুসলিম হিসেবেই দাবী করতে পারে।

এ কথা বিশেষভাবে স্মরণ রাখতে হবে যে, চিকিৎসকের সন্তান যেমন চিকিৎসা বিদ্যা অর্জন না করে চিকিৎসক হতে পারে না, প্রকৌশলীর সন্তান যেমন প্রকৌশল বিদ্যা অর্জন না করে প্রকৌশলী হতে পারে না, আইনজ্ঞের সন্তান যেমন আইন শাস্ত্রে ডিগ্রী অর্জন না করে আইনজ্ঞ হতে পারে না অনুরূপভাবে মুসলমানের ঘরে জন্ম গ্রহণ করলেই মুসলমান হওয়া যায় না। নিজেকে মুসলমান হিসেবে দাবী করতে হলে প্রথমে ইসলাম সম্পর্কে ততটুকু জ্ঞান অর্জন করতে হবে, যেটুকু জ্ঞান অর্জন করলে ইসলাম ও কুফরের পার্থক্য বুঝা যায়। মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে পার্থক্য কি-  তা বুঝার মতো জ্ঞান অর্জন করতে হবে। মুসলিম হতে হলে তার দায়িত্ব-কর্তব্য কি এবং কি কি কাজ করলে মুসলমান থাকা যাবে এবং কোন্‌ কাজ করলে নিজেকে মুসলমান বলে দাবী করা যাবে না, সেটুকু জ্ঞান অর্জন করতে হবে।
মুসলমানের ঘরে জন্ম গ্রহণ করলে বা কালেমা পাঠ করলেই মুসলমান হওয়া যায় না। যে কালেমা পাঠ করা হলো, সেই কালেমার অর্থ, গুরুত্ব, তাৎপর্য, এই কালেমার দাবী কি-  তা জানতে হবে এবং কালেমার দাবী অনুসারে জীবন পরিচালনা করতে হবে, তাহলেই নিজেকে মুসলমান হিসেবে পরিচয় দেয়া যাবে। আর এই মুসলমানরাই আখিরাতের ময়দানে উল্লেখিত পাঁচটি প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে।
ইসলাম ও মুসলিম শব্দের অর্থও যে বুঝে না, মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে পার্থক্য কি এবং কোন্‌ কারণে পার্থক্য রেখা টানা হয়েছে, এ সম্পর্কে যার নূন্যতম ধারণাও নেই, কোরআন-হাদীস কি-  এ সম্পর্কে যার ভাসাভাসা জ্ঞানও নেই, আল্লাহ, রাসূল, ফেরেশ্‌তা, আখিরাত এসব বিষয় সম্পর্কে যে ব্যক্তি সম্পূর্ণ অন্ধকারে, সে ব্যক্তিও মুসলমানের ঘরে জন্ম গ্রহণ করার কারণে নিজেকে মুসলমান বলে দাবী করছে এবং মৃত্যুর পর তাকে কবরস্থ করা হচ্ছে ইসলাম প্রদর্শিত পন্থা অনুসারে। তার মৃতদেহ কবরে নামানোর সময় বলা হচ্ছে-
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
আল্লাহর নামের ওপরে এবং রাসূলের দলের ওপরে।
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
আল্লাহর নামের ওপরে এবং রাসূলের সুন্নাতের ওপরে।
জীবিতকালে যে ব্যক্তির সাথে কোরআনের পরিচয় ঘটেনি, সেই ব্যক্তির কবরে যখন মাটি দেয়া হচ্ছে তখন কোরআনের আয়াত তিলাওয়াত করা হচ্ছে-
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
এই মাটি থেকেই আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, এরই মধ্যে আমি তোমাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবো এবং এই মাটি থেকেই পুনরায় তোমাদেরকে বের করবো। (সূরা ত্বা-হা-৫৫)
কবরে নামানোর সময় কি বলা হচ্ছে?
কবর হলো পৃথিবীর জীবনের শেষ মঞ্জিল আর আখিরাতের জীবনের প্রথম মঞ্জিল। এই কবরের জগতে যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর পাঠানো ফেরেশ্‌তাদের প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে পারবে, সেই ব্যক্তি আখিরাতের জীবনে মুক্তি লাভ করবে। আর কবরের জগতে যে ব্যক্তি ফেরেশ্‌তাদের প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে পারবে না, আখিরাতের জীবনে সে গ্রেফতার হয়ে জাহান্নামে যেতে বাধ্য হবে। কবরের জগতে কেবলমাত্র ঐ ব্যক্তিই ফেরেশ্‌তাদের প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে সক্ষম হবে, যে ব্যক্তি পৃথিবীতে জীবনকালে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ অনুসারে জীবন-যাপন করেছে। এ বিষয়টি অবশ্যই স্মরণে রাখতে হবে যে, ঐ ব্যক্তিকেই মুসলমান বলা হয়, যে ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ অনুসারে জীবন-যাপন করে। এ জন্যই মৃত্যুর পরে একজন মুসলমানের মৃতদেহকে কবরে নামানোর সময় বলা হয়-  ‘তোমাকে মহান আল্লাহর নামে এবং রাসূলের আদর্শের ওপরে এখানে রাখা হচ্ছে।’
একজন মুসলমানের মৃতদেহ কবরে নামানো হচ্ছে এবং বলা হচ্ছে যে, ‘তোমাকে মহান আল্লাহর নামে এবং রাসূলের আদর্শের ওপরে এখানে রাখা হচ্ছে।’ পৃথিবীতে জীবনকালে যে ব্যক্তি রাসূলের আদর্শ অনুসারে জীবন-যাপন করেছে, মৃত্যুর পরও সেই রাসূলের আদর্শের ওপরেই তাকে দুনিয়ার শেষ মঞ্জিলে ও আখিরাতের প্রথম মঞ্জিলে প্রেরণ করা হলো। যে কথা বলে একজন মুসলমানের মৃতদেহ কবরে রাখা হলো, সেই কথাটি শুধুমাত্র একজন মুসলমানের জন্যই প্রযোজ্য এবং একজন মুসলমানের জন্যই সামঞ্জস্যশীল। একজন মুসলমানের জীবন-যাপন পদ্ধতির সাথে কবরে নামানোর সময় বলা কথাটির কোনো ধরনের স্ববিরোধিতা নেই। বরং সত্য সঠিক কথা বলেই তাকে কবরে নামানো হলো।
এরপর কবরে যখন মাটি দেয়া হচ্ছে তখন বলা হচ্ছে, ‘এই মাটি থেকেই আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, এরই মধ্যে আমি তোমাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবো এবং এই মাটি থেকেই পুনরায় তোমাদেরকে বের করবো।’ যে মুসলমানের কবরে মাটি দেয়ার সময় পবিত্র কোরআনের এই আয়াত তাকে শোনানো হচ্ছে, সেই মুসলমানের কাছে এই কথাটি মোটেও নতুন নয়। কারণ সে তার জীবন বিধান মহাগ্রন্থ আল কোরআনে অনেকবার পড়েছে, তার আল্লাহ তাকে বলছেন-  বান্দা! তোমাকে আমি এই মাটির সার-নির্যাস থেকেই সৃষ্টি করেছি। পৃথিবীতে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমাকে হায়াত দেয়া হয়েছে, এই হায়াত শেষ হলে পুনরায় তুমি এই মাটির মধ্যেই মিশে যাবে। এখানেই তুমি শেষ হয়ে যাবে না, পৃথিবীর জীবনকাল তুমি কিভাবে কোন বিধান অনুসারে পরিচালিত করেছো এবং তোমার জীবনের যাবতীয় কাজের চুলচেরা হিসাব আদালতে আখিরাতে দেয়ার জন্য তোমাকে এই মাটি থেকেই উঠানো হবে। অর্থাৎ তোমার পুনরুত্থান ঘটবে।
যে ব্যক্তি জীবনের কোনো এক অসতর্ক মুহূর্তে কখনো স্বপ্নেও কল্পনা করেনি যে, সে এই পৃথিবীতে যা কিছু করছে, এর প্রত্যেকটি কাজের হিসাব আখিরাতের ময়দানে দিতে হবে, তাকে এই মাটি থেকেই উঠানো হবে। আদালাতে আখিরাতকে সে অবিশ্বাস করেছে। আখিরাতের বিষয় নিয়ে সে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেছে, পুনরুত্থানকে অসম্ভব বলেছে। আর সেই ব্যক্তির কবরে মাটি দেয়ার সময় বলা হচ্ছে-  তোমার জীবনকালের যাবতীয় হিসাব দেয়ার জন্য তোমাকে এই মাটি থেকেই পুনরায় উঠানো হবে। এই কথাটি পরকালের প্রতি অবিশ্বাসী এই ব্যক্তির জীবন-যাপন পদ্ধতির সাথে সম্পূর্ণ স্ববিরোধী এবং অসামঞ্জস্যশীল।
আপনি চিন্তা করে দেখুন তো, কবরে নামানোর সময় আপনার মৃতদেহকে লক্ষ্য করে যে কথাগুলো বলা হবে, সেই কথাগুলোর ব্যাপারেই যদি ফেরেশ্‌তারা আপনাকে প্রশ্ন করে-  আল্লাহর বান্দা! তোমার আত্মীয়-স্বজন ও সাথিরা যে কথা বলে কবরে তোমার লাশ দাফন করলো, তুমি কি জীবিতকালে সেই রাসূলের আদর্শ অনুসরণ করেছো?
প্রত্যেক নবী-রাসূলই পরকালে আদালতে আখিরাতে মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহির কথা বলেছেন এবং মানুষের মনে পরকালের ভীতি সঞ্চার করার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী-রাসূলদের প্রতি যে ওহী অবতীর্ণ হয়েছে, তার সিংহভাগ জুড়ে থেকেছে পরকাল সম্পর্কিত আলোচনা। সর্বশেষে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি মানব জাতির জন্য যে সর্বশেষ জীবন বিধান- আল কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে, এর মধ্যেও পরকালের বিষয়টিই সর্বাধিক আলোচিত হয়েছে।
গোটা ত্রিশপারা কোরআনে পরকাল সম্পর্কিত যে আলোচনা এসেছে, তা একত্রিত করলে প্রায় দশ পারার সমান হবে। পরকালে জবাবদিহির ভীতি ব্যতীত কোনক্রমেই মানুষের মন-মস্তিষ্ক অপরাধের চেতনা থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। সর্বাধিক কঠোর আইন প্রয়োগ করেও মানুষকে অপরাধ মুক্ত সৎ জীবনের অধিকারী বানানো যায় না। কারণ অপরাধীর প্রতি শাস্তির দন্ড প্রয়োগ করতে হলে প্রয়োজন হবে সাক্ষ্য প্রমাণের। পক্ষান্তরে যে অপরাধী কোন ধরনের সাক্ষ্য-প্রমাণ না রেখে অপরাধমূলক কর্ম সম্পাদন করে, সে থাকে আইনের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে এবং তার প্রতি পৃথিবীতে দন্ডও প্রয়োগ করা যায় না।
সুতরাং পৃথিবীতে এমন কোন আইন-কানুনের অস্তিত্ব নেই, যে আইন মানুষকে নির্জনে লোক চক্ষুর অন্তরালে একাকী অপরাধ করা থেকে বিরত রাখতে সক্ষম। এই অবস্থায় মানুষকে অপরাধ থেকে মুক্ত রাখতে পারে কেবল পরকাল ভীতি তথা আদালতে আখিরাতে মহান আল্লাহর দরবারে জবাবদিহির অনুভূতি। এ কারণেই মানব মন্ডলীর জন্য প্রেরিত সর্বশেষ জীবন বিধান মহাগ্রন্থ আল কোরআনে পরকালের বিষয়টি সর্বাধিক আলোচিত হয়েছে।