আসুন! জামাতের সাথে নামাজ পড়ি

উত্তম কাজ দলভুক্ত হয়ে আদায় করতে হয়। এটা আল্লাহর নির্দেশ। এরশাদ হচ্ছে, ‘এবং তোমরা সালাত কায়েম করো ও জাকাত আদায় করো আর রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু করো।’ (সূরা বাকারা : ৪৩)। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘তোমরা মোমিনদের সঙ্গে তাদের উত্তম কর্মগুলো সম্পাদনের ক্ষেত্রে তাদের দলভুক্ত হও।’ আর উত্তম কর্মগুলোর মধ্যে পরিপূর্ণ ও বিশেষ গুরুত্ববহ কর্ম হলো নামাজ। তাই জামাতে নামাজ আদায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় অনেক আলেম তো বলেছেন, ‘জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করা ফরজ।’ অবশ্য আয়াতটি মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
ইবনে কাইয়ুম (রহ.) কিতাবুস সালাতের ১১৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, যদি বলা হয়, জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করা হলো পুরুষের ওপর ফরজ, তবে নারীদের এ ব্যাপারে কী করণীয়? এ সম্পর্কে আমরা মহান রাব্বুল আলামিনের বাণী লক্ষ্য করলে দেখতে পাই, ‘হে মরিয়ম! তোমার প্রভুর ইবাদত করো, সেজদা করো এবং রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু করো।’ (সূরা আলে ইমরান : ৪৩)। এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মরিয়মকে রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু করার আদেশ প্রদান করেছেন, তাহলে এতে প্রতীয়মান হয়, মহিলাদেরও মসজিদে এসে জামাতবদ্ধ হয়ে নামাজ আদায় করতে হবে। অথচ মহিলাদের ওপর তো মাসজিদে এসে জামাতে শরিক হয়ে নামাজ পড়া ফরজ নয়?
এর উত্তরে বলা হয়েছে, উল্লিখিত আয়াত সব মহিলাকে লক্ষ্য করে বলা হয়নি, শুধু মরিয়মকেই আদেশ প্রদান করা হয়েছে। কেননা মরিয়মের মা মরিয়মকে আল্লাহ ও তাঁর ইবাদত এবং মসজিদের সঙ্গে সর্বদা সম্পৃক্ত থাকার জন্য মুক্ত করে দিয়েছিলেন। তাই তিনি কোনো সময়ই তা থেকে দূরে থাকতেন না। তাই তাকে মসজিদে অন্য রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু করতে আদেশ করা হয়েছে।
জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করাই হলো দ্বীনের উদ্দেশ্য ও ইসলামের প্রতীক এবং মুসলিম জাতির বাহ্যিকরূপ। আল্লাহর ঘরকে আবাদ রাখতে হবে। যারা মসজিদ আবাদ করে তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা ঈমানের সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং তারা ওইসব লোকের দলভুক্ত যাদের আল্লাহ তায়ালা হক ও সঠিক পথের দিকে হেদায়েত করেছেন। এরশাদ হচ্ছে, ‘নিঃসন্দেহে তারাই আল্লাহর মসজিদ আবাদ করে, যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও শেষ দিনের প্রতি এবং কায়েম করে নামাজ ও আদায় করে জাকাত; আর আল্লাহ ব্যতীত কাউকে ভয় করে না। অতএব আশা করা যায়, তারা হেদায়েতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সূরা তওবা : ১৮)।
এরশাদ হচ্ছে, ‘আল্লাহ যেসব গৃহকে মর্যাদায় উন্নীত করার এবং সেগুলোতে তাঁর নাম উচ্চারণ করার আদেশ দিয়েছেন, সেখানে সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে; এমন লোক যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে, নামাজ কায়েম করা থেকে এবং জাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না। তারা ভয় করে সেই দিনকে, যে দিন অন্তর ও দৃষ্টিগুলো উল্টে যাবে। তারা আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে, যাতে আল্লাহ তাদের উৎকৃষ্টতর কাজের প্রতিদান দেন এবং নিজ অনুগ্রহ আরও অধিক দেন, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত রিজিক দান করেন।’ (সূরা নূর : ৩৬-৩৮)।
এমনকি যুদ্ধাবস্থায়ও জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করার কথা বলা হয়েছে। এতেই জামাতে নামাজ আদায় করার সীমাহীন গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। এরশাদ হচ্ছে, ‘যখন আপনি তাদের মধ্যে থাকেন, অতঃপর নামাজে দাঁড়ান, তখন যেন একদল আপনার সঙ্গে দাঁড়ায় এবং তারা যেন স্বীয় অস্ত্র সঙ্গে নেয়। অতঃপর যখন তারা সেজদা সম্পন্ন করে, তখন আপনার কাছে থেকে যেন সরে যায় এবং অন্য দল যেন আসে, যারা নামাজ পড়েনি, অতঃপর তারা যেন আপনার সঙ্গে নামাজ পড়ে এবং আত্মরক্ষার হাতিয়ার সঙ্গে নেয়।’ (সূরা নিসা : ১০২)।
একদা এক অন্ধ সাহাবি রাসূল (সা.) এর কাছে এসে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় না করার অনুমতি চাইলেন। তিনি বললেন, আমার বাড়ি বহুদূরে এবং আমাকে মসজিদে নিয়ে আসার মতো কেউ নেই। তাছাড়া রাস্তায় রয়েছে পোকামাকড় ও আক্রমণাত্মক প্রাণী, আরও অন্য কারণ। রাসূল (সা.) তাঁকে বললেন, তুমি কি আজান শুনতে পাও। তিনি বললেন, হ্যাঁ! আমি আজান শুনতে পাই। রাসূল (সা.) তাঁকে বললেন, তবে তুমি তাতে সাড়া দাও। অর্থাৎ তুমি জামাতে এসো, নামাজ আদায় করো। অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (সা.) তাঁকে বললেন, আমি তাঁর জন্য কোনো অনুমতি দেখতে পাই না। আরেক বর্ণনায় এসেছে, ২৫ গুণ সোয়াব। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জামাতে নামাজ পড়া একাকী নামাজ পড়ার চেয়ে ২৭ গুণ সোয়াব বেশি।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
অন্য এক হাদিসে এরশাদ হচ্ছে, ‘যে ব্যক্তি আজান শুনে বিনা কারণে মসজিদে আসবে না, তার কোনো নামাজ হবে না।’ (ইবনে মাজা, দারে কুতনি)। রাসূল (সা.) আরও বলেন, ‘নিশ্চয়ই মোনাফেকদের ওপর সবচেয়ে কঠিন হলো ফজর ও এশার নামাজ। মানুষ যদি জানত এ দুই নামাজের মধ্যে কী মর্যাদা রয়েছে, তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তাতে আসত। আমার ইচ্ছা হয়, আমি নামাজ কায়েম করার আদেশ দিই, অতঃপর একজনকে নামাজের ইমামতি করার আদেশ প্রদান করি। অতঃপর লাকড়ি বা খড়ি বহনকারী একদল লোক নিয়ে যারা নামাজে আসে না তাদের বাড়ি-ঘর আগুন দিয়ে ভস্মীভূত করে দিই।’ (বোখারি ও মুসলিম)।

Leave a Reply

Your email address will not be published.