আহলে হাদিসের অনুসারীরা জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করছেন !

জঙ্গিবাদ ছড়ানোর অভিযোগে সমপ্রতি সমপ্রচার বন্ধ করে দেওয়া ভারতীয় পিস টিভির বাংলাদেশি বক্তাদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন চট্টগ্রামের আলেম-ওলামারা।

গতকাল শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সন্ত্রাস ও জঙ্গি হামলা প্রতিরোধ বিষয়ে এক মতবিনিময় সভায় ওই দাবি জানানো হয়। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন আয়োজিত এ সভায় নগর ও জেলার বিভিন্ন মসজিদের ইমাম ও খতিবরা উপস্থিত ছিলেন।

আহলে হাদিসের অনুসারীরা জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করছেন বলে সভায় অভিযোগ করেন বক্তারা। বিভিন্ন মসজিদে ইমাম-খতিব হিসেবে যাঁরা দায়িত্ব পালন করছেন আহলে হাদিসের এমন অনুসারীদের গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখার জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানান তাঁরা।

এদিকে পিস টিভির বাংলাদেশি বক্তাদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি পিস পাবলিকেশন, পিস স্কুল ও পিস ক্লাবসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের আহ্বান জানানো হয় সভায়।

কালুশাহ সিনিয়র আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আবুল কালাম আমেরি অভিযোগ করে বলেন, ‘পিস টিভিতে বাংলাদেশি যাঁরা বক্তব্য দিতেন তাঁরা আগে ছিলেন জামায়াত নিয়ন্ত্রিত ইসলামী টিভিতে। সেটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তাঁরা দিগন্ত টিভিতে অনুষ্ঠান করতেন। এটাও যখন বন্ধ হয়ে গেল তাঁরা জায়গা করে নিল পিস টিভিতে। এখন পিস টিভি বন্ধ। তাঁদেরকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় না আনলে শিগগির তাঁরা অন্য চ্যানেলে গিয়ে ইসলামের নামে নানা অপব্যাখা করে বক্তব্য দেবেন। তাই অতিসত্বর তাঁদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে।’

তিনি ইসলামী আইনে জঙ্গিদের বিচারের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘কোরআনে দুনিয়াতে সন্ত্রাস সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির কথা আছে। জঙ্গিদের ইসলামের আলোকে তাঁদের কৃতকর্মের শাস্তি দিলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা কমে আসবে।’

নগরের কাটগড় ধানিপাড়া জামে মসজিদের খতিব রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ইসলামের অপব্যাখ্যা দেওয়ায় অনেক আগে আলেমরা জাকির নায়েকের পিস টিভি বন্ধ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। দেরিতে হলেও সে দাবি পূরণ হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। শুধু পিস টিভি বন্ধ করলে হবে না, পিস টিভির সাথে সংশ্লিষ্ট পিস পাবলিকেশন, পিস স্কুল ও পিস ক্লাবও বন্ধ করতে হবে।’ পাশাপাশি জঙ্গিবাদ দমন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সেদিকে লক্ষ রাখার জন্য তিনি সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান।

বন্দর এলাকার হাশেম সওদাগর জামে মসজিদের খতিব জসিম উদ্দিন তৈয়বী বলেন, ‘বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ততদিন পিস টিভিও বন্ধ রাখতে হবে। পিস টিভি ইসলামকে কলুষিত করছে। যাঁদের বক্তব্য পিস টিভিতে প্রচার করা হত তাঁদের নজরদারিতে রাখতে হবে। প্রয়োজনে রিমান্ডে নিতে হবে। কোনো মসজিদে কেন্দ্রীয় অভিন্ন খুতবার বাইরে বক্তব্য রাখা হচ্ছে কি-না সেটাও নজরদারি করতে হবে সরকারকে।’ জানা গেছে, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিনের সভাপতিত্বে শনিবারের ওই মতবিনিময় সভায় ১৬০টির বেশি মসজিদ থেকে ইমাম-খতিবরা অংশ নেন।

জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘পিস টিভিতে কারা বক্তব্য রাখত সে ব্যাপারে আমরা খোঁজখবর নেব। ইমামদের সাজেশনগুলো আমরা বাস্তবায়নের চেষ্টা করব।’

ইসলামিক ফাউন্ডেশন চট্টগ্রামের পরিচালক আবুল হায়াত মো. তারেক শাহ বলেন, ‘চট্টগ্রামে নয় হাজার ১০টি মসজিদ রয়েছে। আমরা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে অভিন্ন খুতবা মসজিদে পৌঁছে দিতে সক্ষম হব।’

সভায় আরো বক্তব্য দেন জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদের সিনিয়র ইমাম নুর মোহাম্মদ সিদ্দিকী, ছোবহানিয়া আলীয়া মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ জুলফিকার আলী ও কাতালগঞ্জ সেন্ট্রাল জামে মসজিদের খতিব আমির হোসেন বিলালী।

আহলে হাদিসের মতবাদে বিশ্বাসীরাই জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করছে অভিযোগ করে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলীয়া মাদ্রাসা শিক্ষক ও নাজিরপাড়া জামে মসজিদের খতিব আবুল আসাদ মো. জোবাইর রেজভি বলেন, ‘বিভিন্ন মসজিদে আহলে হাদিসের অনুসারী খতিব ও ইমাম রয়েছেন। তাঁরাই জঙ্গিবাদ সৃষ্টিতে কাজ করে যাচ্ছেন। এঁদের গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখতে হবে। সমপ্রতি বন্ধ করে দেওয়া পিস টিভির বক্তারা আহলে হাদিসের অনুসারী। এঁরা এখনো কোনো কোনো টিভিতেও বক্তব্য রাখছেন।’ এ সময় তিনি যেসব টিভি তাঁদের বক্তব্য প্রচার করে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের ইমাম সৈয়দ আনোয়ার হোসেন তাহের আল জাবেরি বলেন, ‘আলেমরা জন্মগতভাবেই সন্ত্রাসবিরোধী। ইসলামের সাথে সন্ত্রাসের কোনো সম্পর্ক নেই। ইসলাম পৃথিবীকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। ইসলামের নামে যারা মানুষের ক্ষতি করে তারা মুসলমান নয়; ইসলামের শত্রু।’

সোবহানিয়া আলীয়া মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ ও হামিদুল্লাহ খাঁ জামে মসজিদের ইমাম জুলফিকার আলী বলেন, ‘দেশের প্রতি ভালোবাসাই ইসলামের মূলকথা। যাদের মনে দেশ ও ইসলামের প্রতি ভালোবাসা নেই তারা জঙ্গিবাদ করে।’ হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘আত্মাহূতি দিয়ে কিংবা মানুষ হত্যা করে ইসলাম প্রচারের কোনো সুযোগ নেই।’ যারা এবং যেসব প্রতিষ্ঠান জঙ্গিবাদ শিক্ষা দেয় তাদেরও চিহ্নিত করার দাবি জানান তিনি।

খুতবা মনিটরিং সেল : জঙ্গিবাদে উস্কানি দেয় বা সন্ত্রাসবাদে উত্সাহিত করে এমন বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে কি-না তা খুঁজে বের করতে চট্টগ্রাম নগর ও জেলার মসজিদগুলোর খুতবা মনিটর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

নগর ও জেলার ৯ হাজার ১০টি মসজিদের খুতবা মনিটর করতে একটি সেল গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম কার্যালয়ের পরিচালক আবুল হায়াত মো. তারেক।

আজ রবিবার থেকে কমিটি কাজ শুরু করবে জানিয়ে তিনি বলেন,‘ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে কাজ করবেন।’

তিন মসজিদ নজরদারিতে : নগরের মেহেদীবাগ এলাকায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) পরিচালিত মসজিদ, আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ ও রহমতগঞ্জে গৃহায়ন ও গণপূর্তের মসজিদে সন্দেহভাজন লোকজনের যাতায়াত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মতবিনিময় সভায় উপস্থিত নগর পুলিশের (বিশেষ শাখা) সহকারী কমিশনার মো. কাজিমুর রশিদ বলেন, ‘সিডিএ, গৃহায়ন ও আন্দরকিল্লা মসজিদে সন্দেহভাজন লোকজনের আনাগোনা রয়েছে বলে আমাদের কাছে তথ্য আছে।’

জঙ্গি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত, তারা মসজিদগুলোতে কখন আসে এবং কাদের সঙ্গে কথা বলে সে বিষয়ে তথ্য দেওয়ার জন্য উপস্থিত ইমাম ও খতিবদের সহযোগিতা কামনা করেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা।

ইতিমধ্যে ৭ জন জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জানিয়ে চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজাউল মাসুদ বলেন, ‘সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে জঙ্গি তত্পরতা বন্ধ করা সম্ভব হবে।’

৯ হাজার মসজিদে একই খুতবা : ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নির্দেশনা অনুযায়ী তৈরি করা জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের জুমার খুতবা চট্টগ্রামের ৯ হাজার ১০টি মসজিদে পৌঁছানো হবে বলে জানিয়েছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক আবুল হায়াত মো. তারেক।

তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠক করব। উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও ও স্থানীয় চেয়ারম্যানদের নিয়ে ইফার মাঠ কর্মীরা বায়তুল মোকাররমের খুতবা মসজিদে মসজিদে পৌঁছে দেবেন।’

ইসলামের সব যুদ্ধ প্রতিরোধমূলক ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ইসলামে কোনো যুদ্ধই আক্রমণাত্মক ছিল না। ইসলামে হানাহানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।’

ইমাম ও খতিবদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা সচেতন হলে বাংলাদেশে কোনো সন্ত্রাস থাকবে না।’