ইসলাম ও বিজ্ঞানের ব্যাখ্যায় – কেমন হয় মৃত্যুর যন্ত্রণা, জানুন

মৃত্যু অবশ্যই আসবে, নির্দিষ্ট সময়ে, আগেও নয়, পরেও নয়। প্রাণ হরণের সময় মানুষের অবস্থা থাকে বিভিন্ন রকম। তাদের ঈমান, তাকওয়া কৃতকর্ম অনুযায়ী মৃত্যু যন্ত্রণা হয়ে থাকে। এরপর কবর হল প্রথম স্তর। কারো জন্য তা হবে জান্নাতের একটি অংশ কারো জন্য তা হবে জাহান্নামের একটি টুকরা।

মৃত্যুর চেয়ে বড় সত্যি আর কিছু কী আছে এই পৃথিবীতে?
উত্তর কিন্তু সবাই জানি ।
তবুও কিন্তু ব্যাক্তি জীবনের মোহে পড়ে আমরা বেশিরভাগ সময়েই মৃত্যুর মত অবধারিত সত্যি ভুলে গিয়ে নানান স্বার্থের দন্দে জড়িয়ে পড়ি। যে কোন সেকেন্ডে যে কোন মুহূর্তেই তো একেবারে বিনা নোটিশে আসতে পারে মৃত্যু ! আর মৃত্যুর পরেই সব মুছে গিয়ে আপনার আমার নাম হবে শুধু লাশ (যার কোন ক্ষমতা নেই) !
এতো প্রেম এত ভালোবাসা এত প্রতিপত্তি, এত হিংসা-বিদ্বেষ সবতো পড়েই রবে !!
আসুন না প্রতিদিন অন্তত একবার হলেও এই অমোঘ নিয়তি ‘ মৃত্যুর’ কথা মনে করি। আর এখন থেকেই নিজেকে একটু একটু করে প্রস্তুত করি অনন্ত কালের যাত্রায় ……
মৃত্যু একটি গোপন শক্তি।
এর মোকাবিলা করা পৃথিবীতে কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।
যার নির্দেশে মৃত্যু অবধারিত হয়, যদি অন্তত তার সাথে সম্পর্ক ভালো রাখা যায়, তার প্রতি আনুগত্যের প্রকাশ করা হয়, তাহলেই শুধু আশা করতে পারি মৃত্যু পরবর্তী জীবনে অনন্ত যন্ত্রনা আর দুর্ভোগের শিকার হতে হবে না আমাদের ।
সুরা- আল ইমরান- ১৮৫كُلُّ نَفْسٍ ذَآئِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَما الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلاَّ مَتَاعُ الْغُرُورِ
প্রত্যেক প্রাণীকে আস্বাদন করতে হবে মৃত্যু। আর তোমরা কিয়ামতের দিন পরিপূর্ণ বদলা প্রাপ্ত হবে। তারপর যাকে দোযখ থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, তার কার্যসিদ্ধি ঘটবে। আর পার্থিব জীবন ধোঁকা ছাড়া অন্য কোন সম্পদ নয়।

মৃত্যুর সময় কেমন বোধ করে মানুষ?

মৃত্যু যন্ত্রণা কতই না কঠিন!

মৃত্যু এবং মৃত্যু যন্ত্রণা প্রত্যেক মানুষের জন্য অনিবার্য। মহান আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় রাসূল (সা:) কে মৃত্যুর স্বাদ নিতে হয়েছিলো  । আর যখন তিনি মৃত্যুর কিনারায় পৌছেছিলেন, যখন তিনি মৃত্যু যন্ত্রণায় আক্রান্ত হলেন। তখন নিজের সাথে এক জগ পানি রেখেছিলেন , আর সেখান থেকে নিজের হাত ডুবিয়ে নিয়ে মুখ মুছতেন এবং বলতেন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ইন্না লিল মাওতি লা সাকারাত, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।” -অর্থাৎ: নিশ্চয়ই মৃত্যু যন্ত্রণা বড়ই তীব্র
এবং বড়ই কঠিন!

যদি খোদ রাসূল(সা:) মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর হন,  তাহলে আমাদের কেমন হবে? অবশ্যই কঠিন। আর কাফির বা অবিশ্বাসীগণদের শাস্তি হবে সর্বোচ্চ।
তাদেরকে মৃত্যুর সময় ফেরেস্তারা বলবে, বেড়িয়ে আয় হে পাপি আত্মা! আর তোদের জন্য অপেক্ষা করছে আল্লাহর শাস্তি! হে তবে কিছু মানুষের মৃত্যু
যন্ত্রণা হবে খুবই কম। যেমন একটি পিপড়ার কামরের মত। আর তারা হলেন শহীদগণ।

—ঈমাম আনোয়ার আল আওলাকীর মৃত্যুর পরের জীবন লেকচার সিরিজ অবলম্বনে।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মৃত্যু যন্ত্রনার উপলব্ধিঃ

এবার আসুন জেনে নিই বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে নিউইয়র্ক শহরের উইল কর্নেল মেডিকেল সেন্টারের একদল গবেষকের দৃষ্টিতে মৃত্যু যন্ত্রনার ভয়ানক কষ্ট আর অনুভুতির কথা ।

এতদিন ভাবা হতো মৃত্যুর হিমশীতল ভুবন থেকে কেউ যেহেতু ফিরে আসেনি, সেহেতু মানুষ কোনোদিন জানতে পারবে না মৃত্যুর স্বাদ; কিন্তু বিজ্ঞানীরা কেন থেমে থাকবেন! শুরু হয়ে গেছে মৃত্যুকে জানতে ব্যাপক তোড়জোড়। যদিও এখন পর্যন্ত জানা হয়েছে খুবই কম। মৃত্যু নিয়ে গবেষণা শুরু করেছেন মৃত্যু বিশেষজ্ঞ নিউইয়র্ক শহরের উইল কর্নেল মেডিকেল সেন্টারের গবেষক ড. সাম পার্নিয়া। সম্প্রতি পার্নিয়া ও তার সহকর্মীরা প্রকাশ করেছেন তাদের ৩ বছরের গবেষণার উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার। এই গবেষণা অডঅজঊ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। ইউরোপ, কানাডা ও ইউএসের ২৫টি মেডিকেল সেন্টারের ১৫০০ রোগী, যারা ‘কোমা অবস্থা’ থেকে ফিরে এসেছেন জীবনে, পার্নিয়া গবেষণা করেছেন মূলত তাদের নিয়ে।

পার্নিয়ার গবেষণা থেকে জানা যায় মৃত্যু মুহূর্তের কোনো ঘটনা নয়; হৃৎপিন্ডের কম্পন বন্ধ হলে ধীরে ধীরে জীবকোষগুলো ক্ষয় হতে শুরু করে। জীবকোষগুলো চলাচলে অক্ষম হতে থাকে আর সব ক্রিয়া বন্ধ হতে সময় লাগে ১০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা। ওই সময়গুলোর অনুভূতি সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা নেই। তবে ১০ অথবা ২০ শতাংশ মানুষ যারা ‘কোমা অবস্থা’ থেকে ফিরে এসেছেন, কিছুক্ষণ বা ঘণ্টা খানিক পর তিনি চেতন ফিরে পেয়ে কি দেখে এসেছেন সে বিষয়ে স্বকল্পিত বিবরণ দিতে পারেন। প্রায়-মৃত্যু থেকে ফিরে আসা রোগিদের অনেকে কোমা অবস্থায় নানামাত্রিক রঙের কারুকাজ দেখেছেন বলে মনে করেন। এই বিবরণ কতটা সত্য বা কতটা অলীক কিংবা মনের ভুল তা নিশ্চিত করে অবশ্য বলা সম্ভব নয়।

সাধারণভাবে মনে করা হয় মৃত্যু প্রাণীর জীবনে আচমকা এসে সবকিছু লন্ডভন্ড করে দেয়; কিন্তু চিকিৎসা শাস্ত্রে বলে মৃত হতে হলে প্রথমে হৃদয়ের কম্পন বন্ধ হতে হবে, ফুসফুস তার ক্রিয়া বন্ধ করবে, যার ফলে মস্তিষ্ক তার সব কাজ বন্ধ করে দেবে। ডাক্তার চোখের মণিতে আলো ফেললে যদি স্নায়ুর ওপর কোনো উদ্দীপনা সৃষ্টি না করে তবে তাকে মৃত বলে ঘোষণা দেয়া হয়।

‘মরণ রে তুঁহুঁ মম শ্যাম সমান’ মৃত্যু নিয়ে এমন ভাবনা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। আর মৃত্যুর পরের সময় নিয়ে নির্মলেন্দু গুণের ভাষায় ‘মৃতেরা থাকে না গৃহে বেশিক্ষণ, গৃহহীন আপনার গৃহে/রেখে যায় তার স্পর্শ, স্মৃতি, প্রাণ।’ মৃত্যুর মতো সত্য আর কিছু নেই। মানুষ হয়তো একদিন ঠিকই জেনে যাবে মৃত্যুর স্বাদ, মৃত্যুর গন্ধ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.