এভাবে ছবি তুলব, নাকি মানুষ বাঁচাব? কোনটা করা উচিৎ?

সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রী খাদিজা বেগমের ওপর নৃশংস হামলার ভিডিও ইন্টারনেটে ও টেলিভিশনে দেখা গেছে। ওই দৃশ্য খুবই মর্মান্তিক। খাদিজার অবস্থা এখনো সংকটাপন্ন। হামলাকারী বদরুল আলম শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শাখা ছাত্রলীগের নেতা। জনতা তাঁকে ধাওয়া করেছে, পুলিশ তাঁকে আটক করেছে।
এরপর সেই পুরোনো বিতর্কটা নতুন করে দেখা দিয়েছে, এই সব ক্ষেত্রে আমরা কী করব, ছবি তুলব, ভিডিও করব, নাকি আক্রান্তকে বাঁচাতে এগিয়ে আসব। এই বিতর্কের অবসান হয়নি। নানা মুনির নানা মত। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে নিউইয়র্ক পোস্টএ একটা ছবি ছাপা হয়। একটা লোক পাতালরেলের স্টেশনে প্ল্যাটফর্মের নিচে রেললাইনের ওপরে। সে চেষ্টা করছে প্ল্যাটফর্মে উঠে পড়ার। পরের মুহূর্তে ট্রেন এসে পড়ায় সে মারা যায়। এই ছবি প্রকাশের পর সমালোচনার প্রচণ্ড ঝড় ওঠে। ছবি না তুলে আলোকচিত্রী কেন লোকটাকে বাঁচাতে এগিয়ে গেল না, এই ছিল সেই সমালোচনার মূল সুর।
তবে মোটের ওপরে যেটা এখন প্রতিষ্ঠিত, সবকিছুর ওপরে মানবতা। বিপন্নকে যদি বাঁচানো যায়, তাহলে ছবি না তুলে প্রথমে বাঁচানোর চেষ্টাই আমাদের করা উচিত।
খাদিজার আক্রান্ত হওয়ার ছবিটা যিনি তুলেছেন, তাঁর অবস্থান বেশ দূরেই ছিল, ক্যামেরার অবস্থান আর ছবির অ্যাঙ্গেল দেখলে তা বোঝা যায়। বরং আরেকজনকে দেখা গেল ওই ভিডিওতেই যিনি বেশ কাছে ছিলেন।

বাংলাদেশের মানুষ এখনো একের বিপদে অন্যে এগিয়ে আসে। সেটা আমরা রানা প্লাজা ধসের পরেও দেখেছি, ওয়াসার পাইপলাইনে শিশুর পড়ে যাওয়ার পরেও দেখেছি। অনেকগুলো বীরত্বপূর্ণ উদাহরণও আমাদের সামনে আছে। ছিনতাইকারীর কবলে পড়া নারীর পাশে দাঁড়াতে গিয়ে পথচারী নিহত হয়েছেন, এই ধরনের ঘটনা ঢাকাতেই ঘটেছে। আবার রাজশাহীর এক নারী একজন আহত বিপন্ন পুলিশ সদস্যকে ধরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন, সেই কাহিনিও আমরা সংবাদমাধ্যমে জেনেছি। ইভ টিজিংয়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজের জীবন দিতে হয়েছে, এ ধরনের খবরও বিরল নয়। আবার তৃতীয় লিঙ্গের কজন মানুষ ধাওয়া করে হামলাকারী খুনিকে ধরে পুলিশে দিয়েছেন, এই খবরও আমাদের জানা।

অন্যদিকে মানুষের হাতে হাতে মোবাইল ফোন, আর সেসবের ক্যামেরায় ছবি তোলা ও ভিডিও তোলার সুযোগের কারণে অনেকগুলো অন্যায়ের প্রতিবিধান হতেও আমরা দেখেছি। ঢাকায় একটা ছেলে আরেকটা ছেলেকে নির্মমভাবে প্রহার করছে, এই ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর ছেলেটিকে পুলিশ ধরেছিল। অন্তত দুটো শিশু নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে, সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো দেশ নড়ে উঠেছে। উভয় ক্ষেত্রে নির্যাতনকারীরা বিচারের মুখোমুখি হয়েছে। একটা ক্ষেত্রে তো অপরাধী দেশের বাইরে পালিয়ে যাওয়ার পরে জনমতের ব্যাপক চাপে তাকে ফিরিয়ে আনা হয় এবং বিচারের মুখোমুখি করা হয়। বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়ার পেছনেও হত্যাকাণ্ডের সময়ের ছবি প্রকাশিত হওয়া একটা বড় কারণ।

কাজেই মানুষের হাতে হাতে ভিডিও ক্যামেরা থাকাটা সমাজে স্বচ্ছতা, তথ্যের অবাধ প্রবাহ ইত্যাদি নিশ্চিত করছে। এবং স্বচ্ছতা ও তথ্যপ্রবাহ যা করে, তাই করতে বিকল্পপথে সাহায্য করছে। অন্যায়ের প্রতিবিধান হচ্ছে। শাস্তি হলে তা সমাজে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে। আরও অপরাধ সংঘটিত হওয়াকে তা নিরুৎসাহিত করে।

আমাদের মূলধারার গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধতা আছে। তা সব জায়গায় সব সময় পৌঁছাতে পারে না। সব সময় সব কথা বলতেও পারে না। সব ছবি প্রকাশও করতে পারে না। সামাজিক নেটওয়ার্ক বিকল্প গণমাধ্যমের ভূমিকা পালন করছে। ছবি অনেক সময়ই বিবেককে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দেয়।

আমরা সাম্প্রতিক দুটো ছবির কথা বলতে পারি। সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইউরোপে আশ্রয় খুঁজছিল যারা, যে সিরীয় বা মধ্যপ্রাচ্যের মানুষেরা, তাদের প্রতি মানবিক আচরণ করার কথা কতই না বলা হয়েছিল। কিন্তু এক শিশু আয়লানের পুতুলের মতো শরীরটা যখন পড়ে রইল বালুকাবেলায়, আর সেই ছবিটা প্রকাশিত হলো গণমাধ্যমে, পুরো বিশ্বের বিবেক উঠল কেঁপে। বহু দেশ তাদের শরণার্থী নীতি উদার করতে বাধ্য হলো। তেমনিভাবে শিশু ওমরানের সাম্প্রতিক ছবি আবারও নাড়িয়ে দিয়েছে বিশ্ববিবেক। মাথার ওপরে বাসভবন ভেঙে পড়েছে, আহত শিশুটিকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়েছে, শিশুটি নির্বিকার, ধূলিবালি-সিমেন্ট মাখা মুখে হাত দিয়ে সে আবিষ্কার করতে পারে নিজের শরীরের রক্তধারা। ওই খবর প্রচারের সময় সিএনএনের সংবাদ পাঠিকা নিজেই কাঁদছিলেন।

কাজেই কোনো ঘটনা ঘটলে তার ছবি ধারণ করা ও প্রচার করা নানাভাবে ইতিবাচক ফল রাখছে। ঢাকায় ট্রাফিক সার্জেন্ট প্রহার করছেন গাড়িচালককে, নির্মমভাবে, সেই দৃশ্য প্রকাশিত ও প্রচারিত হওয়ার পরেও ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।

কিন্তু যখন আপনার সামনে প্রশ্ন আসবে, আপনি ভিডিও ধারণ করবেন, নাকি মানুষকে বাঁচাতে এগিয়ে যাবেন, তখন এই প্রশ্নের উত্তর আমি কী দেব? প্রথমত এবং শেষ পর্যন্ত মানবতাই সবকিছুর ঊর্ধ্বে। মানুষ মানুষের জন্য। মানুষের বিপদে মানুষ এগিয়ে যাবে, হাত বাড়াবে, এই তো আমরা চাই। কিন্তু যখন আগ্নেয়াস্ত্রধারী কোনো পথচারীর কপালে ধাতব শীতল নলটা ধরে, তাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসা, বিশেষ করে আকস্মিকভাবে বুদ্ধি বের করা নিশ্চয়ই মুশকিল। চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। আর নিরাপদ দূরত্বে পরে বসে বড় বড় কলাম লেখা সোজা।

ছোটবেলায় জুনিয়র রেডক্রসের কাছ থেকে প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। ওই সময় আমাদের শেখানো হয়েছিল, কেউ যদি পানিতে ডুবে যায়, তাহলে তার কাছে যেতে হলে যথেষ্ট দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ ছাড়া যেয়ো না। কারণ সে তোমাকে জড়িয়ে ধরবে। নিজেও মরবে, তোমাকেও মারবে। তোমাকে যেতে হবে পেছন থেকে, তার কপালে জোরে আঘাত করতে হবে, সে অজ্ঞান হয়ে গেলে তাকে ধরে ডাঙায় তুলবে। থ্যাংক গড, ওই ধরনের পরিস্থিতির মুখে কখনো পড়িনি। পরীক্ষা দিতে হয়নি।

কিন্তু বাংলাদেশের বহু মানুষ এই ধরনের পরীক্ষার মুখোমুখি হয়ে নিজেকে এমনকি উৎসর্গও করেন। সেপটিক ট্যাংকে একজন ঢুকে আর বের হচ্ছে না, তাকে তুলতে আরেকজন ঢোকেন, আরেকজন, কেউই আর বের হয় না। বা পানিতে একজন ডুবে যাচ্ছেন, তাঁকে উদ্ধার করতে আরেকজন যাচ্ছেন, দুজনেই মারা গেছেন, এই ধরনের খবর মোটেও বিরল নয়।

অন্যদিকে,  ক্যামেরার যাচ্ছেতাই ব্যবহারের প্রশ্নও আছে। সেদিন আমি একটা সুইমিংপুলে নেমে সাঁতার কেটেছি, ওঠার পরে শুনলাম, কেউ একজন আমার পুরো সাঁতারটা ভিডিও করেছেন। শুনে আমি থ। আমার অনুমতি ছাড়া অপরিচিত কেউ কি আমার সাঁতারটা ভিডিও করতে পারেন? তবে আমি যদি ওই সময় সাঁতার কাটতে গিয়ে ডুবে মারা যেতাম, তাহলে ওই ভিডিওটার একটা মূল্য হয়তো দাঁড়াত।

আমরা কিন্তু আমাদের হাতের এই বিস্ময়কর যন্ত্রটা দিয়ে কী করা উচিত, আমরা তা বুঝছি না। শিশুরা এর অপব্যবহার করছে, বড়রাও করছে। যে ধরনের ভিডিও প্রকাশিত হওয়া উচিত নয়, তা প্রকাশিত হয়ে পড়ায় অনেকগুলো আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। আসলে তো এ ধরনের ভিডিও ধারণ করাই উচিত নয়। ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারের প্রশ্নটিও আছে। তথ্য জানা আমার অধিকার। স্বচ্ছতা ও তথ্যের অবাধ প্রবাহ ভালো। তাই বলে, আমার টেলিফোনালাপ রেকর্ড করা হবে, এটা আমি কোনো দিনও সমর্থন করি না। আমরা জানি, আমাদের দেশে আইন করা হয়েছে, নিরাপত্তার স্বার্থে টেলিফোনালাপ রেকর্ড করা যাবে। কিন্তু তা প্রকাশ করে দেওয়া নিশ্চয়ই আইনসম্মত নয়। এ বিষয়ে সবাইকে কঠোর সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। একটা ভয়াবহ খবর বেরিয়েছে গতকালকের ডেইলি স্টারএ। ইয়াহু তাদের সব ই-মেইল স্ক্যান করে আমেরিকার নিরাপত্তা বাহিনীকে তথ্য সরবরাহ করেছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারের পরিধি পৃথিবীব্যাপীই ছোট হয়ে আসছে। সেটা ভালো কথা নয়।

মিশেল ফুকো কারাগারের ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, কারাগারে একটা ওয়াচ টাওয়ার থাকে। সেখান থেকে সবকিছু নিরীক্ষণ করা হয়। আমাদের সমাজও তেমনি। প্যান-অপটিক সমাজ। সে স্তরে স্তরে সবকিছুর ওপরে নজর রাখে। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো—কারাগার, হাসপাতাল, অফিস, স্কুল—সবই আসলে কারাগার, যেখানে সবকিছু নিরীক্ষণ করা হচ্ছে। মোবাইল ফোন ও সিসিটিভির এই দুনিয়ায় সেটা এখন আক্ষরিক অর্থেই সত্য হয়ে গেছে।

আমার একজন প্রিয় লেখক মিলান কুন্ডেরা এই ধরনের সমাজ, যেখানে মানুষের গোপনীয়তার অধিকার নেই, সেটার সমালোচনা করেন তীব্রভাবে। তিনি বলেন, ফ্রানৎস কাফকার জগতে এ রকমটা ঘটে। জোসেফ কে নামের ব্যক্তিটিকে গ্রেপ্তার করতে এসেছে দুজন, তারা ঢুকে বসে আছে তারই শয়নকক্ষে। এই যে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হলো, এটাকে মিলান কুন্ডেরা এক ভয়াবহ অভিশাপ বলে মনে করেন। তাঁর আইডেন্টি  উপন্যাসে তিনি প্রশ্ন করেছেন, আমরা যে মায়ের পেটের ভ্রূণের ছবি তুলি, ভিডিও করি, দেখা যায়, ভ্রূণটি গোপন কী কাজ করছে, সেটা আমরা দেখে ফেলি, এটা কি উচিত?

আমি একটা গল্প লিখেছি। কালি ও কলম পত্রিকার একটা গল্পসংখ্যা সম্প্রতি বেরিয়েছে কলকাতা থেকে। তাতে এই গল্পটা আছে। একজন নারী একজন পুরুষকে খুন করতে চায়। খুন করার জন্য সে বেছে নেয় স্বচ্ছতাকে। মানে, ভদ্রলোক কোথায় কখন যাচ্ছেন, কী করছেন, কী খাচ্ছেন, তাঁর সঙ্গে কে আছে, সব ভদ্রমহিলা প্রকাশ করে দেন তাঁরই নামে খোলা একটা ফেসবুক পেজে। একটা মানুষ যদি সারাক্ষণই কাচের ঘরে থাকার মতো করে স্বচ্ছ ও প্রকাশিত জীবনযাপন করে, তার পক্ষে বাঁচা সম্ভব নয়। লোকটি মারা যায়—আমার গল্পে, অবশ্যই কাল্পনিক কাহিনিতে। তবে বাস্তবেও আমরা একাধিক মানুষের, বিশেষ করে তরুণীদের মৃত্যুর কারণ ঘটিয়েছি অপ্রকাশ্যকে প্রকাশ করে দিয়ে।

কাজেই আমার বলার কথা তিনটা: ১. মানুষ বাঁচানো না ছবি তোলা? মানুষ বাঁচানো। ২. সামাজিক গণমাধ্যম কি বিকল্প গণমাধ্যমের ভূমিকা পালন করবে? অবশ্যই। তা ভালো করছে। কার্যকরী হচ্ছে। ৩. আমরা কি ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে সম্মান করব? অবশ্যই। অবশ্যই।

আনিসুল হক: সাহিত্যিক  সাংবাদিক