এমন অদ্ভুত এক বিশ্ববিদ্যালয় দেখে বিস্ময়ে হতবাক ইউজিসি চেয়ারম্যান!

রোববার বেলা ১১টা। রাজধানীর বনানীর ১৪ নম্বর রোডের বি-ব্লকে অবস্থিত ‘ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া’য় তিন সদস্যের কমিটি নিয়ে ঝটিকা পরিদর্শনে যান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান। তিনি গিয়ে দেখেন, প্রধান ফটকে তালা। অনেক হাঁকডাকের পর বেরিয়ে এলেন একজন কর্মচারী। জানালেন, তিনি হিসাব বিভাগে কাজ করেন। তাকে সঙ্গে নিয়ে ওই বিশ্ববিদ্যালয় ভবনে ঢুকে ইউজিসি চেয়ারম্যান দেখলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো উপাচার্য নেই, উপ-উপাচার্য নেই, ট্রেজারার নেই, এমনকি রেজিস্ট্রারকেও খুঁজে পেলেন না তিনি। পরে তিনি জানতে পারলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে চ্যান্সেলর নিযুক্ত কোনো উপাচার্যই নেই! বিশ্ববিদ্যালয়টি চলছে উপাচার্য ছাড়াই! এতে তিনি বিস্মায়াভিভূত হন।

এরপর ক্যাম্পাসটি ঘুরে দেখতে গিয়ে বিস্ময় আরও বাড়ে ইউজিসি চেয়ারম্যানের। তিনি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, ভাড়া করা একজন লোককে ধরে এনে ভারপ্রাপ্ত ভিসির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো চাকরিই করেন না। প্রফেসর ড. আবদুল ওয়াদুদ মণ্ডল নামে পদার্থবিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত এই অধ্যাপক চাকরি করেন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। তিনি কেবল শুক্র ও শনিবার ‘ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া’য় এসে পার্টটাইম ভিসির দায়িত্ব পালন করে চলে যান। কাগজপত্রে ভিসির সই কোথাও লাগলে তিনি সেখানে সই করেন কেবল।

ইউজিসি টিমের খোঁজাখুঁজির খবর পেয়ে নিকটস্থ আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস থেকে তিনি ছুটে আসেন। তবে তিনি আসলে ‘ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া’র বিষয়ে কোনো তথ্যই জানেন না। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও তার থেকে কিছুই জানতে পারেনি ইউজিসি দল। এরপর খোঁজ পড়ে প্রোভিসির। কর্মচারীরা জানান, তিনি লন্ডনে থাকেন। মাঝে-মধ্যে দেশে আসেন। তিনি ইউনিভার্সিটির মালিক ডা. আবদুল মতিনের ছেলে। প্রোভিসি নিজেও বিশ্ববিদ্যালয়ে মালিকদের একজন, তিনি ট্রাস্টিবোর্ড সদস্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই কোনো ট্রেজারারও।

65887658_229056

সরেজমিন দেখা যায়, আজিম নামে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ মাধ্যমিক পাস এক কেরানির কাছে বিপুল পরিমাণ সাময়িক সনদপত্র রয়েছে। সনদগুলো ভিসি ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের সই করা। এ সনদগুলো বাইরে বিক্রি করা হয় কি-না তা নিশ্চিত হতে পারেনি ইউজিসির পরিদর্শক দল।

অভিযানের বর্ণনা দিয়ে অধ্যাপক আবদুল মান্নান সমকালকে বলেন, ‘সকালে গিয়ে দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ফটকে তালা মারা। কিছুক্ষণ ডাকাডাকির পর একজনকে পাওয়া গেল। তিনি নিজেকে অ্যাকাউন্স সেকশনের কর্মচারী হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি আমাদের ভেতরে নিয়ে যান। ভেতরে একটি পতাকার দণ্ড দেখা গেল। কিন্তু তাতে কোনোদিন পতাকা উত্তোলন হয় না। এরপর ভেতরে গিয়ে দেখা যায় বেশিরভাগ কক্ষই বন্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রোভিসি, রেজিস্ট্রার কাউকেই খুঁজে পেলাম না।’

ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘কাগজে-কলমে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ২ হাজার ৯০০ জন। কিন্তু ২০০ এর বেশি শিক্ষার্থী পাওয়া যায়নি। টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একটি কক্ষে মোট চারটি ব্যাচের ক্লাস অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এগুলো হলো- ছয়, সাত, আট ও নয় ব্যাচ। কেমিস্ট্রি ল্যাবে গিয়ে ধুলোবালিতে মাখা কয়েকটি চেয়ার-টেবিল ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলাম না। কম্পিউটার ল্যাবের কম্পিউটারগুলো নষ্ট। মনে হলো অনেকদিন ধরে এখানে কেউ প্রবেশ করেনি। ১০০ বর্গমিটারের একটি লাইব্রেরি রয়েছে। অল্পকিছু বই সেখানে দেখা গেছে।’ ঝটিকা অভিযানের সময় দেখা যায়, মাত্র তিনটি রুমে ক্লাস চলছে। বিবিএর একটি ব্যাচের ক্লাসরুম থেকে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বের করে দেন ইউজিসি চেয়ারম্যান। তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। উপস্থিত শিক্ষার্থীরা জানায়, আজিম নামে এক কেরানির কাছে প্রভিশনাল সার্টিফিকেট থাকে। ভিসি ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের স্বাক্ষর করা এসব সার্টিফিকেট নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অধ্যাপক মান্নান।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এহেন বেহাল দশার বিষয়ে কর্তব্যরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ইউজিসি কর্তৃপক্ষকে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি বলে জানা গেছে। এর আগে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী ঝটিকা অভিযান চালিয়েও একই পরিস্থিতি দেখতে পেয়েছিলেন বলে জানান ইউজিসির বর্তমান চেয়ারম্যান। তিনি জানান, অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি।

পরিদর্শনকালে ইউজিসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে আরও ছিলেন ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের উপ-পরিচালক জেসমিন পারভীন ও চেয়ারম্যান দপ্তরের উপসচিব শাহিন সিরাজ।