এমন মৃত্যু ক’জনার ভাগ্যে জুটে !

অনেকদিন ধরে অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে ছিলেন মাদ্রাসা শিক্ষক এই আলেম। বৃহস্পতিবার রাত তিনি বাড়ির সবাইকে ডাকলেন। ডাকলেন বাড়িতে আসা এক মেয়ে জামাইকেও। এবার অনেকটা সবার উদ্দেশেই বললেন, ‘আমি কিছুদিন ধরে নামাজ আদায় করতে পারিনি! কিছু রোজাও রাখার সুযোগ হয়নি! তার জন্য ২০ হাজার টাকা মসজিদে দিয়ে দিও! আর তোমাদের মায়ের মোহরানার কিছু টাকা বকেয়া ছিল। বকেয়া মোহরানার ২০ হাজার টাকা তোমাদের মা’কে দিও!’ পরিবারের জন্য আরও কিছু নির্দেশনা দিলেন অসুস্থ এই ব্যক্তি।

ওই রাতটা পার হলো। পরদিন শুক্রবার সকাল বেলা। মাদ্রাসা শিক্ষক এই আলেম আবার বাড়ির সবাইকে ডাকলেন। পাঁচ ছেলের মধ্যে এক ছেলে উপস্থিত ছিলেন না তাকেও ডাকা হলো। চার মেয়ের মধ্যে বিবাহিত দুই মেয়েও সেই সময় বাবার শয্যাপাশে উপস্থিত হলেন।

এবার তিনি বললেন, ‘আমাকে গোসল করাও, পবিত্র করে দাও!’ বেশি অসুস্থ বলে গোসল করানো গেল না। যতটুকু পরিচ্ছন্ন করা যায় করানো হলো। নতুন লুঙ্গি পরানো হলো, সাথে পরিষ্কার জামা।

এই আলেম বললেন, ‘আমি যে খাটে শুয়ে আছি সেটি হিন্দু কিংবা কোন বিধর্মীর বানানো কিনা জানি না! মুসলমানের বানানো নাহলে আমাকে নিচে মাটিতে বিছানা করে শুইয়ে দাও!’

এবার তিনি সবাইকে বললেন, ‘সবাই আমার সঙ্গে কলেমা পড়ো- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)!’

আর এভাবেই এক আল্লাহ ও তার রাসুলের (সা.) সাক্ষ্য দিতে দিতেই এক আলেম পৃথিবীর মায়া ছেড়ে গেলেন! ইন্নালিল্লাহি ওয়া…রাজিউন।

ঘটনাটি গল্পের মতো মনে হলেও বাস্তবে এমনই ঘটনা ঘটেছে। ২৬ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার রাত এবং ২৭ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার সকালে ঘটে যাওয়া সত্য ঘটনা। আর যিনি মৃত্যুর আগে সবকিছু বলে-কয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন তিনি গ্রামে বসবাসকারী নিতান্তই এক আলেম- মাওলানা আবদুচ্ছালাম (ক্বদিম)। সকাল সাড়ে ১০টায় তিনি এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে যান।

কক্সবাজার সদরের পাশের উপজেলা রামুর রাজারকুল ইউনিয়নের হালদারকুলের অজপাড়া গাঁয়ে বাস করতেন এই আলেম। তিনি গ্রামের অতি সাধারণ, সহজ-সরল এবং একজন মাদ্রাসা শিক্ষাক হলেও উনার প্রতিষ্ঠানটি ছিল বিখ্যাত। বাড়ির পাশের রাজারকুল আজিজুল উলুম মাদ্রাসায় তিনি প্রতিষ্ঠাকাল থেকে শিক্ষকতা করে আসছিলেন।

উনার ছাত্র ও একই মাদ্রাসার শিক্ষা হাফেজ মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুর জানিয়েছেন, রাসুলের (সা.) সুন্নাতের প্রতি অত্যন্ত যত্নবান, আচরণে বিনয়ী, ভদ্র ও সহজ-সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন বিজ্ঞ এই আলেম।

মাওলানা আবদুচ্ছালামের (ক্বদিম) মেজো জামাতা, কক্সবাজারে কর্মরত সংবাদ কর্মী এএইচ সেলিম উল্লাহ। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাতের ঘটনাসহ মৃত্যুর আগপর্যন্ত শ্বশুর বাড়িতে জামাতাদের মধ্যে তিনিই উপস্থিত ছিলেন। তিনি ঘটনার পরম্পরা বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘সবকিছুর নির্দেশনা দিয়েই আমার শ্বশুর পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। এমন মৃত্যু ক’জনের ভাগ্যে হয়!’

তিনি জানান, ইন্তেকালের সময় উনার বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। তিনি সহধর্মিনী, চার ছেলে, পাঁচ মেয়ে রেখে গেছেন।

এএইচ সেলিম উল্লাহ বলেন, ‘মৃত্যুর প্রায় দুই সপ্তাহ আগেই আমার শ্বশুর তার কাফনের কাপড় কেনার জন্য টাকার বরাদ্দ দিয়ে গেছেন। তার মৃত্যুর পর জানাযার নামাজ কে পড়াবেন সেটিও তিনি জানিয়ে গেছেন। তিনি দুইজন আলেমের কথা বলে রেখেছিলেন। তাদের একজন মুফতি মুর্শেদুল আলম চৌধুরী যিনি কক্সবাজার জেলা তাবলিগ জামাতের আমির, তিনি মাওলানা আবদুচ্ছালামের (ক্বদিম) জানাযার নামাজ পড়িয়েছেন।’

মাগরিব নামাজের পর বাড়ির পাশের চাষের জমিতে এই জানাযার আয়োজন ছিল। কিন্তু জানাযা যখন শুরু হচ্ছিল তখন সন্ধ্যা পৌনে ৭টা বাজে। চারদিকে অন্ধকার। আর তারই মাঝে কয়েক হাজার মানুষ লাইন ধরে অপেক্ষমান। একটু দূর থেকেও বুঝার উপায় নেই এতো মানুষ অন্ধকার মাঠে জানাযার অপেক্ষায় আছেন!

কক্সবাজারের প্রবীণ সাংবাদিক নুরুল ইসলাম হেলালী মনে করেন, ‘তিনি হয়তো বড় আলেম না হতে পারেন, কিন্তু তিনি ছিলেন এক পাক্কা ঈমানদার মানুষ!’

মাওলানা আবদুচ্ছালাম (ক্বদিম) ১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল রাজারকুল ইউনিয়নের হালদারকুলের এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭৪ সালের রাজারকুল আজিজুল উলুম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং প্রতিষ্ঠাকাল থেকে আজীবন এই মাদ্রাসার শিক্ষক হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে দ্বীনি শিক্ষার খেদমতে নিবেদিত ছিলেন।

তিনি পশ্চিম রাজারকুল আশরাফিয়া মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার সদরে মুহতামিম ও হালদারকুল জামে মসজিদের খতিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

উনারই ছাত্র হাফেজ মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুরের মতে, ‘হুজুর ছিলেন পাক্কা পরহেজগার আলেম! তিনি আজীবন ফেকাহ শাস্ত্র শিক্ষা দিয়েছেন।’

উৎসঃ   আরটিএনএন

Leave a Reply

Your email address will not be published.