এ যেন সতিই শায়েস্তা খাঁর আমল!

দুই টাকা লিটার দুধ, ৯০ টাকা কেজি খাসির মাংস, সয়াবিন তেল ও মসুর ডাল ৫০ টাকায়, পাঁচ টাকা কেজি দরে লবণ, ১০ টাকা কেজিতে শুকনা ও কাঁচা মরিচ, জিরা, এলাচ, আদা। নিত্যপ্রয়োজনীয় এসব পণ্যের দর দেখে যে কারোরই চোখ কপালে উঠতেই পারে! মনে হতে পারে, এ বুঝি শায়েস্তা খাঁর আমলের কথা স্মরণ করানো হচ্ছে। বাস্তবতা হচ্ছে, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমন অবিশ্বাস্য দরেই রোগীর খাদ্য সরবরাহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের এমন অসামঞ্জস্যপূর্ণ দর দেখিয়ে দরপত্র (টেন্ডার) দাখিল করার পর সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে রোগীর খাদ্য সরবরাহকাজের জন্য সম্প্রতি উপজেলার পোরজনা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অনিল কুমার ঘোষকেই বেছে নেয় কর্তৃপক্ষ। তবে এমন দরে কেমন খাবার সরবরাহ করা সম্ভব হবে—এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

100007

এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২০১৬-১৭ অর্থবছরের খাদ্যতালিকা অনুযায়ী, প্রতি রবিবার প্রত্যেক রোগীকে দুপুর ও রাতে ৭০০ গ্রাম করে খাসির মাংস সরবরাহ করার কথা রয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে দুই বেলায়ই ২০০ গ্রামের কম পাঙ্গাশ কিংবা সিলভার কার্প মাছ দেওয়া হয়। প্রতি মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার দুই বেলা জনপ্রতি ৬৩০ গ্রাম মুরগির মাংস দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয় ২০০ গ্রামের কম ব্রয়লার মুরগির মাংস। প্রতি শুক্রবার ও শনিবার দুই বেলা ৬৩০ গ্রাম করে রুই, কাতলা অথবা মৃগেল মাছের বিপরীতে দেওয়া হয় ২০০ গ্রামের কম পাঙ্গাশ অথবা সিলভার কার্প মাছ। সকালে দুটি ডিমের পরিবর্তে একটি ডিম সরবরাহ করা হয়। সকালের নাশতায় ১০০ গ্রাম করে চিনি দেওয়ার কথা থাকলেও কখনোই তা দেওয়া হয় না। এর ওপর খাবারের মান এতটাই খারাপ যে অনেক রোগীই তা না খেয়ে ফেরত দেয়।

গত বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে ১২ নম্বর বেডের রোগী শাহজাদপুর পৌরসভা এলাকার রওশন আলী জানান, দুই দিন আগে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। খাদ্যের মান অত্যন্ত নিম্নমানের হওয়ায় তিনি এখানকার খাবার খেতে পারছেন না। বাইরে থেকে কিনে খাচ্ছেন। এমন অভিযোগ ২৬ নম্বর

বেডের রোগী নাদিয়া খাতুন, ২৮ নম্বও বেডের শান্তনা খাতুন, ৮ নম্বও বেডের রাজু বেপারী, ৩১ নম্বর বেডের আয়শা খাতুনসহ অনেকেরই। তা ছাড়া খাবার বিছানায় পৌঁছে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও পুরুষ ওয়ার্ডের সামনে থেকে দুস্থদের রিলিফ নেওয়ার মতো করে খাবার সরবরাহ করা হয়।

ওই হাসপাতালের বাবুর্চি অকপটে এসবের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘আমাকে যা এনে দেওয়া হয় আমি তা-ই রান্না করে পরিবেশন করে থাকি।’ তিনি আরো বলেন, দাম বেশি বলে খাসির মাংস কখনোই রোগীদের দেওয়া হয় না। এর পরিবর্তে কম দামের সিলভার কার্প অথবা পাঙ্গাশ মাছ দেওয়া হয়।

খাদ্য সরবরাহকারী ঠিকাদার শাহজাদপুর উপজেলার পোরজনা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অনিল কুমার ঘোষের সঙ্গে কথা বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ভুয়া ও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে তিনি দুই বছর ধরে খাদ্য সরবরাহ করছেন। এ-সংক্রান্ত টেন্ডারে তিনি আসলে অংশই নেননি। শিডিউলে তাঁর স্বাক্ষরও নেই। তাঁর ঠিকাদারি লাইসেন্সের ফটোকপি দিয়ে শাহজাদপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সোহেল রানা এ কাজ আদায় করেছেন। অনিল আরো বলেন, হাসপাতালের প্রধান সহকারী-কাম-হিসাবরক্ষক তোরাব আলীর মাধ্যমে এ কাজ বাগিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন।

তবে হাসপাতালের পাশের বাসিন্দা ছাত্রলীগ নেতা সোহেল রানা দাবি করেন, অনিল কুমার ঘোষই মূল ঠিকাদার। তিনি যেভাবে বলেন সেভাবেই খাবার সরবরাহ হয়ে থাকে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কাজ পেতে দর কম দেখাতে হয়। এটা হাসপাতালের সবাই জানে। বরাবর এভাবেই সব হয়ে আসছে।

তবে হাসপাতালের প্রধান সহকারী-কাম-হিসাবরক্ষক তোরাব আলী এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, টেন্ডার কমিটি যাচাই-বাছাই করেই নিয়োগ দিয়ে থাকে। আর টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি থেকে শুরু করে অনুমোদনের সব কিছুই হয়ে থাকে জেলা সিভিল সার্জন অফিস থেকে। তিনি আরো বলেন, সিভিল সার্জন এ বছরের খাদ্যতালিকা এখনো অনুমোদন দিয়ে পাঠাননি। তাই নতুন খাদ্যতালিকা টাঙানো সম্ভব হয়নি। তিনি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন বলে দাবি করেন।

শাহজাদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জাফরুল হোসেন বলেন, মানহীন খাদ্য সরবরাহের ব্যাপারে ঠিকাদারকে সতর্ক করা হয়েছে। এর পরও এমন অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভুয়া কাগজপত্রে ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আহম্মেদ বলেন, ‘দুই টাকা লিটার দুধ পাওয়া যায়, বিষয়টি জেনে আমি হতবাক হয়েছি। তদন্ত করে অপরাধীদের অবশ্যই শাস্তি দেওয়া হবে।’

ওই খাদ্যতালিকা অনুযায়ী পণ্যের দর শায়েস্তা খাঁর আমলকেও হার মানিয়েছে। দুধ প্রতি লিটার দুই টাকা, লবণের কেজি পাঁচ টাকা, সবজির কেজি পাঁচ টাকা, শুকনা মরিচ, হলুদ, জিরা, এলাচ, দারুচিনি, ধনিয়া, আদা, পেঁয়াজ ইত্যাদি ১০ টাকা কেজি, রসুনের কেজি আট টাকা, খাসির মাংস প্রতি কেজি ৯০ টাকা, মুরগির মাংস প্রতি কেজি ১০০ টাকা, মাছ প্রতি কেজি ১০০ টাকা, সয়াবিন তেল ৫০ টাকা লিটার, মসুর ডাল ৫০ টাকা কেজি, সবরিকলা আট টাকা হালি উল্লেখ করা আছে।

এ ব্যাপারে সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. শেখ মো. মনজুর রহমান জানান, টেন্ডারপ্রক্রিয়ার সব কিছুই হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সিভিল সার্জন শুধু অনুমোদন দিয়ে থাকেন। আর খাদ্যতালিকার অসংগতি চিহ্নিত করে তা দ্রুত সংশোধন করতে অনেক আগেই শাহজাদপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তালিকা পাঠানো হয়েছে। ভুয়া কাগজপত্রে টেন্ডার বাগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

এ ব্যাপারে টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির অন্যতম সদস্য উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ‘জেনে অবাক হয়েছি যে দেশের সব হাসপাতালেই নাকি এভাবে টেন্ডার হয়ে থাকে। বিকল্প উপায় না পেয়ে খাবারের মান ও পরিমাণ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক বুঝে নেবেন—এ শর্তে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়া হয়েছে।’

হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মনোয়ার হোসেন জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এক সপ্তাহ খাবারের মান ও পরিমাণ যাচাই-বাছাই করবে। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটলে ওই ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

– See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/news/2016/11/07/425927#sthash.QbZCHUDi.dpuf