ক ও খ ইউনিটে ফল বিপর্যয়ের পরে এবার গ ইউনিটে ৯৪.৪৮ শতাংশ ফেল

ঢাবির গ ইউনিটে ৯৪.৪৮ শতাংশ ফেল, তিন কারণে ফল বিপর্যয়। চলতি শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদভূক্ত গ- ইউনিটের ফল প্রকাশ হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল অনুয়ায়ী এবার সর্বোচ্চ সংখ্যক ফেলের রেকর্ড হয়েছে। এ বছর ইউনিটটিতে ৯৪.৪৮ ভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেছে। পাশ করেছে ৫ দশমিক ৫২ ভাগ শিক্ষার্থী।

গত এক দশকে গ-ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় এত বেশি সংখ্যক ফেলের নজির নেই।

অন্যদিকে প্রকাশিত ফলাফলে টালমাটাল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন অসংগতি আর বিভ্রান্তিতে ভরা এ ফলাফলে চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা। তিন কারণে এ বছর গ- ইউনিটের ফল বিপর্যয় হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক আনুষ্ঠানিকভাবে গ-ইউনিটের ফলাফল প্রকাশ করেন।

প্রকাশিত ফলাফলে বলা হয়, মোট ৪২ হাজার ১২৪ জন ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে ৪০ হাজার ২৩৪ জন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে ২ হাজার ২২১জন উত্তীর্ণ হয়েছে। অনুত্তীর্ণ হয়েছে ৩৮ হাজার ১০ জন।

সেই হিসেবে পাশ করেছে ৫ দশমিক ৫২ ভাগ শিক্ষার্থী এবং ফেল করেছে ৯৪ দশমিক ৪৮ ভাগ শিক্ষার্থী। গ-ইউনিটে মোট আসন সংখ্যা রয়েছে ১ হাজার ২৫০টি।

ফেলের রেকর্ড: পরিসংখ্যান বলছে, এবছর গ- ইউনিটে সর্বোচ্চ ফেলের রেকর্ড হয়েছে। গত শিক্ষাবর্ষে (২০১৫-১৬) গ-ইউনিটের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ১৬ই অক্টোবর। ফলাফল প্রকাশ করা হয় ১৮ই অক্টোবর। এতে ৪০ হাজার ৯৫৬ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে ৭ হাজার ১৯৪ জন উত্তীর্ণ হন। পাশের হার ছিল ১৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে ৫ই সেপ্টেম্বর ‘গ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। ফলাফল প্রকাশ করা হয় ৯ই সেপ্টেম্বর। এতে ৪৮ হাজার ৫৭ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে ৯ হাজার ৯০৬ জন উত্তীর্ণ হন। পাশের হার ছিল ২০ দশমিক ৬১ শতাংশ।

২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ১৫ই নভেম্বর। আর ফলাফল প্রকাশ করা হয় ১৮ই নভেম্বর। এতে উত্তীর্ণ হয় ৮ হাজার ৯৬ জন শিক্ষার্থী। পাশের হার ছিল ১১ দশমিক ৪০ শতাংশ।

আর ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের পরীক্ষা ২৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। ফলাফল প্রকাশিত হয় ২৭ নভেম্বর। এতে ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়।

২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে ২৮ অক্টোবর পরীক্ষা হয়, ৩১ অক্টোবর ফল প্রকাশ হয়। ২২ নভেম্বর প্রশ্নে ভুলের জন্য হাইকোর্টে রিট হয়। পরে ৯ ডিসেম্বর পুনরায় ভর্তি পরীক্ষা হয়। এতে ১৩ দশমিক ১৯  শতাংশ পাশ করে।

এছাড়া বিগত বছরের ভর্তি পরীক্ষাসমূহেও এত কম সংখ্যক পাশের ঘটনা ঘটেনি।

ফলাফল প্রকাশে বিলম্বের রেকর্ড: অন্যদিকে এবছর ফলাফল প্রকাশেও বিলম্বের রেকর্ড গড়েছে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ। বিগত বছর সমূহের ফলাফল প্রকাশের দিন হিসেব করে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে পরীক্ষার ১ দিন পর, ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে ৩ দিন পর, ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে ২ দিন পর, ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে ৩ দিন পরে ফলাফল প্রকাশিত হয়। কিন্তু এবছর পরীক্ষার ছয়দিনের মাথায় ফলাফল প্রকাশ হয়। তাও প্রকাশ করা হয় রাত ৯টায়।

তিন কারণে ফল বিপর্যয়: এ বছর ফলাফল বিপর্যয়ের ঘটনা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রশ্নপত্রে ভুল থাকা, একটি প্রশ্ন কম থাকা, এইচএসসিতে মানসম্মত শিক্ষা না পাওয়াকেই দায়ী কারছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বছর বিশ্ববিদ্যালয়টির গ-ইউনিটের প্রশ্নে মোট ১৪টি ভুল পাওয়া গেছে। এর মধ্যে দু’টি ভুল সরাসরি শিক্ষার্থীদের ফলাফলে খারাপ করায় প্রভাব রেখেছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। এ বছর প্রশ্নের একটি সেটে ১০০টির স্থানে ৯৯টি প্রশ্ন ছিল। প্রশ্নটির ফিন্যান্স অংশে ৬ নম্বর প্রশ্নের পরে ৭ নম্বর প্রশ্ন না দিয়ে ৮ নম্বর প্রশ্ন দেয়া হয়েছে।

ফলে অনেক শিক্ষার্থীরা সেটি লক্ষ্য না করে ওএমআর ফরম পূরণ করেছে। এতে করে সিরিয়াল ঠিক না থাকায় তাদের পরবর্তী সকল প্রশ্নের উত্তরগুলো ভুল হয়েছে।

অ্যাকাউন্টিং অংশে শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি মাধ্যমেও পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ ছিল। এই অংশের ১৮ নম্বর প্রশ্নের সঠিক উত্তর বাছাইয়ে মোট পাঁচটি অপশন দেয়া হয়। প্রশ্নটির সঠিক উত্তর হবে ‘ডি’ অপশন। প্রশ্নপত্রে এই অপশনটি বাংলায় লেখা হয় ‘৫:৯:৫’ এবং ইংরেজিতে লেখা হয় ‘৬:৯:৫’। ফলে শিক্ষার্থীরা বাংলা নাকি ইংরেজিকে সঠিক অপশন হিসেবে ধরবে তা নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়। এই ভুলটিও ফলাফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

এছাড়া উচ্চমাধ্যমিকে মানসম্মত শিক্ষা না পাওয়ার ফলে শিক্ষার্থীরা খারাপ ফলাফল করেছে বলে মনে করছেন অনেকেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যানেজম্যান্ট বিভাগে ৪র্থ বর্ষে পড়ছেন ইসমাইল হোসেন জোসেফ। তার মতে, ‘অতীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্ন আরও অনেক বেশি কঠিন হতো। এবছর তুলনামূলকভাবে প্রশ্ন সহজ হয়েছে।’ একই মত ব্যাবসায় শিক্ষা অনুষদের একাধিক শিক্ষার্থীর। সহজ প্রশ্নেও এত কম সংখ্যক পাশ করার কারণ হিসেবে তারা উচ্চ মাধ্যমিকে মানসম্মত শিক্ষাদানের অভাবকেই দায়ী করছেন।

ফলাফলে টালমাটাল অবস্থা: প্রকাশিত ফলাফলে টালমাটাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ফলাফলে নানা অসংগতি হয়রানিতে ফেলছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবছর গ-ইউনিটে মোট পাশ করেছে ২ হাজার ২২১ জন। অথচ প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, রওনক জাহার চৌধুরী নামের এক শিক্ষার্থী (ভর্তি পরীক্ষা রোল- ৮৩২৫৬৯) মোট ১১৫ দশমিক ৪৬ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে তার মেধাক্রম এসেছে ১০ হাজার ১০৮। যা একেবারেই অসম্ভব।

মো. বেলায়েত হোসেন মোল্লা নামের একজন শিক্ষার্থী (ভর্তি পরীক্ষার রোল- ৮১০১৬৫) ইংরেজি বিষয়ে পাশ নম্বর ১০ এর মধ্যে ৮ দশমিক ৪০ পেয়ে ফেল করেছে। অথচ তার মেধাক্রম এসেছে ১ হাজার ১১৭। মিঠুন রয় নামের এক শিক্ষার্থী (ভর্তি পরীক্ষার রোল-৮৫০৭৮০) ইংরেজি বিষয়ে পাশ নম্বর ১০ এর মধ্যে ৮ দশমিক ৮৮ পেলেও তার মেধাক্রম এসেছে ৬৪০। তানভীর হোসাইন নামের এক শিক্ষার্থী (ভর্তি পরীক্ষার রোল- ৮৩৩১৪৩) ইংরেজি বিষয়ে ৬ দশমিক ৯৬ পেয়ে ফেল করলেও তার মেধাক্রম এসেছে ১৮৮।

প্রকাশিত ফলাফলে এ ধরনের অসংখ্য অসংগতি দেখা গেছে। এতে করে ভোগান্তিতে পরেছেন শিক্ষার্থীরা। কিভাবে ফেল করেও মেধাক্রম আসে তা নিয়েও তারা রয়েছেন বিভ্রান্তিতে।

অন্যদিকে যেখানে মাত্র ২ হাজার ২২১ জন পাশ করেছে সেখানে পাশ করেও কিভাবে মেধাক্রম ১০ হাজার ১০৮ হয় তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে ভর্তি পরীক্ষা দেয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

প্রশাসনের বক্তব্য: ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে ফল বিপর্যয়ের কারণ জানতে চাইলে ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজস্ব ধারায় সব সময় প্রশ্ন করে থাকে। শিক্ষার্থীরা সেই প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়েই চান্স পায়। শিক্ষার্থীরা প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারেনি বলেই ফেল করেছে। তবে প্রশ্ন ভুলের কারণে কোনো শিক্ষার্থীর ফলাফল বিভ্রাট হয়নি বলে জানান তিনি। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই ইংরেজি বিষয়ে ফেল করেছেন বলেও জানান ভিসি।

তিনি বলেন, যেই প্রশ্নটি ছিল না, সেই সেটে যারা পরীক্ষা দিয়েছে সকলকে প্রশ্নটির জন্য এক নম্বর দিয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য যেসব সেটে প্রশ্নটি ছিল সেসকল সেটে শিক্ষার্থীরা প্রশ্নটির সঠিক উত্তর দিয়ে পূর্ণ নম্বর পেয়েছে এবং যারা ভুল উত্তর দিয়েছে তাদের নম্বর কাটা হয়নি। উত্তরপত্র মূল্যায়নে অধিকতর স্বচ্ছতা আনয়নে ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব হয়েছে বলেও জানান তিনি। প্রশ্নপত্র ভুল কেন হলো- সেই বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নেয়া হচ্ছে বলেও জানান ভিসি।

গ-ইউনিট ভর্তি পরীক্ষার প্রধান সমন্বয়ক অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম বলেন, প্রশ্ন ভুলের কারণে কোনো শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি। এবছর শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ-ইউনিটেই নয়, অন্যান্য ইউনিটেও পাশের হার কম। এছাড়া অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও পাশের হার কম। এটি উচ্চ মাধ্যমিকে মানসম্মত শিক্ষার অভাবেই হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে এবছর প্রশ্নে যে ধরনের ভুল হয়েছে আগামীতে আর তেমনটি হবে না বলেও জানান এই শিক্ষক।

অনলাইন ভর্তি কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. হাসিবুর রশীদ জানান, ইংরেজি বিষয়ে পাশ নম্বর দশ পেয়েছে ৪ হাজারের কিছু বেশি শিক্ষার্থী। এই কারণেই পাশের হার কম।

প্রসঙ্গত, গত ৩০ সেপ্টেম্বর শুক্রবার এই ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ভর্তিচ্ছু পরীক্ষার বিস্তারিত ফলাফল বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে (admission.eis.du.ac.bd) জানা যাবে। তাছাড়া, যে কোন অপারেটরের মোবাইল ফোন থেকে DU GA ˂roll no˃  টাইপ করে ১৬৩২১ নম্বরে সেন্ড করে ফিরতি এসএমএস-এ ফলাফল জানা যাবে।

পাশকৃত ১ থেকে ১৩০০ মেধাক্রম পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের আগামী ৯ অক্টোবর থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষার ওয়েবসাইটে বিস্তারিত ফরম ও বিষয়ের পছন্দক্রম ফরম পূরণ করতে হবে।