গির্জা বা মন্দিরের মত মসজিদ নিছক উপাসনালয় নয়

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘একমাত্র তারাই আল্লাহর মসজিদগুলো আবাদ করবে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সালাত কায়েম করে, জাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না। আশা করা যায়, ওরা হেদায়েতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সূরা তওবা : ১৮)। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় স্থান দুনিয়ার মসজিদ এবং সবচেয়ে অপ্রিয় স্থান মেলা।’ (মুসলিম : ৬৭১)।

মসজিদ আল্লাহর ঘর। এটি মুসলিমদের মিলন কেন্দ্র। এখানে আমরা রোজ পাঁচবার মিলিত হয়ে রবের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের পাশাপাশি পারস্পরিক খোঁজখবর রাখি। গড়ে তুলি ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। সমাজে ছড়িয়ে পড়ে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ভালোবাসার আবেশ। গড়ে ওঠে এক সুশীল সমাজ। মসজিদ নির্মাণের বিনিময়ে পুরস্কারস্বরূপ রাসূলুল্লাহ (সা.) জান্নাতে ঘর নির্মিত হওয়ার সংবাদ দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কেবল আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার নিমিত্তে যে ব্যক্তি কোনো মসজিদ নির্মাণ করে, আল্লাহ তাঁর জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করবেন।’ (মুসলিম : ৫৩৩)।

মসজিদে গমনকারীর জন্য প্রতিটি কদমের বিনিময়ে উত্তম প্রতিদান, মর্যাদা ও গোনাহ মাফের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার বাড়িতে পবিত্রতা অর্জন করল অতঃপর ফরজ ইবাদত আদায়ের উদ্দেশ্যে আল্লাহর ঘরে (মসজিদে) গেল তার এক কদমের বিনিময়ে গোনাহ মার্জনা হবে এবং অপর কদমের বিনিময়ে মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে।’ (মুসলিম : ৬৬৬)।

দ্বীনের মূল ভিত্তি সালাত আদায়ের স্থান বিধায় দ্বীনের অন্য কার্যাবলি সম্পাদনেও মসজিদের ভূমিকা প্রাসঙ্গিক ও অনস্বীকার্য। মসজিদের সঙ্গে মুসলিমদের সম্পর্ক অন্য ধর্মাবলম্বীদের তাদের পূজা-অর্চনার মন্দির-গির্জার মতো নয়; বরং মসজিদের সঙ্গে মুসলিমদের দৈনন্দিন জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মদিনায় পদার্পণ করেই প্রথম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববি নির্মাণ করেন। তারপর এ মসজিদকে রূপ দেন তিনি মদিনা রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকান্ডের প্রাণকেন্দ্রে। রাসূল (সা.) বিনির্মিত ওই রাষ্ট্রে সমাজ পরিবর্তনে মসজিদের ভূমিকাই ছিল প্রধান। মসজিদ ছিল একইসঙ্গে দাওয়াতি কাজের প্রাণকেন্দ্র এবং রাষ্ট্রীয় ভবন। এখান থেকেই পরিচালিত হতো দাওয়াতি কার্যক্রম। বিভিন্ন বিষয়ের পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণও হতো এখানেই। রাসূলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন দেশ ও এলাকা থেকে আগত প্রতিনিধি এবং মেহমানদের মসজিদেই স্বাগত জানাতেন। সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে মসজিদেই তিনি মিলিত হতেন। মসজিদেই তিনি তাদের শিক্ষাদান করতেন। এক কথায়, মসজিদ ছিল তৎকালীন মুসলিম সমাজের যাবতীয় কাজের কেন্দ্রস্থল।

তাই মুসলিম জীবনের প্রতিটি পর্বের সঙ্গে মসজিদের রয়েছে প্রত্যক্ষ সংযোগ এবং সরাসরি যোগাযোগ। এটি বাস্তবায়িত হলেই তা হবে জীবন্ত মসজিদ। পরিতাপের বিষয় হলো, মুসলিমের জন্ম-মৃত্যু আর বিয়ের সংবাদ থেকে নিয়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার কর্মসূচি ঘোষণা হওয়ার কথা যেখানে মসজিদ থেকে, সেখানে মসজিদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে সালাতের জামাত অনুষ্ঠান পর্যন্ত। বিপুল মুসলিম জনগোষ্ঠীর গুটিকয় লোকের দৈনিক পাঁচবার এবং সিংহভাগের সপ্তাহে একবার হাজিরা দেয়ার ঘর। ইসলামী খেলাফতের অনুপস্থিতি আর বিশ্বমোড়ল পাশ্চাত্যের সংখ্যাগুরু খ্রিস্টধর্মের প্রভাবে আজকাল অনেকে মসজিদকে নিছক উপাসনালয়ে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.