ছাত্রলীগের অনৈতিক দাবি না মানায় ঢাবি ভিসির গাড়িতে হামলা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিককে লাঞ্ছিত করা ও তার গাড়িতে হামলার ঘটনায় জড়িত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শাস্তি তো দূরে থাক, ঘটনা তদন্তে এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়নি।

গাড়িতে হামলার সুস্পষ্ট স্থিরচিত্র ও ভিডিওচিত্র থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে অগ্রগতি দেখাতে পারেনি প্রশাসন। এদিকে প্রশাসনের নীরবতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রকাশ্যে দিব্বি ঘুরে বেড়াচ্ছে হামলাকারীরা। অনৈতিক দাবি না মানায় ছাত্রলীগ সেদিন বার বার অবস্থান পরিবর্তন করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক যুগান্তরকে বলেন, ২১ জুলাই সিন্ডিকেটের সভায় ওই দিনের ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়েও সেদিনের সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। সেদিন একটি তদন্ত কমিটিও গঠিত হবে। সিন্ডিকেটে আলোচনা করে ঘটনায় জড়িত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বিরুদ্ধে একাডেমিক ও আইনি ব্যবস্থা এবং বহিরাগতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে বলেও জানান তিনি।

১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক রেজাউর রহমান ‘স্মৃতি অম্লান’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। ওই ক্রোড়পত্রের প্রকাশনার দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। প্রবন্ধে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের পরিচিতি তুলে ধরতে গিয়ে তিনি লেখেন, ‘জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি, সাবেক সেনাপ্রধান ও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।’

এ ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। তারা ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সৈয়দ রেজাউর রহমানকে তার কক্ষে তালাবন্দি করে রাখে। দুপুর থেকে শুরু করে সহিংস আন্দোলন। ভাংচুর করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের গাড়ি। তার বাসভবনে ঢোকার প্রধান ফটকে ঝুলিয়ে দেয়া হয় তালা। সড়ক অবরোধ করে আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবাদ করে। পদত্যাগ দাবি করে ভিসি ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের। পরে ওইদিনই ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।

সেদিনের অহিংস আন্দোলন কেন সহিংস হয়ে উঠল : ১ জুলাই দুপুরে ছাত্র-শিক্ষক মিলনায়তনে (টিএসসি) বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের আলোচনা সভা চলাকালে বিষয়টি ছাত্রলীগের দুই নেতার নজরে আসে। তারা অনুষ্ঠানস্থলেই এর প্রতিবাদ জানান। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ওই স্মরণিকা বাজেয়াপ্ত করার ঘোষণা দেন।

সভা শেষে দুপুর ১২টা থেকে পৌনে একটা পর্যন্ত ছাত্রলীগ নেতা মেহেদী ও আদিত্যের নেতৃত্বে ছাত্র সংগঠনটির কয়েকজন নেতাকর্মী ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সৈয়দ রেজাউর রহমানকে তার কার্যালয়ে তালাবন্দি করে রাখেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. এম আমজাদ আলী ঘটনাস্থলে গিয়ে রেজাউর রহমানকে তালামুক্ত করে বের করে আনেন।

শুক্রবারের জুমার নামাজ শেষে ঢাবি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ভিসির কার্যালয়ের সামনে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে। এতে যোগ দেন বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাও। সেখান থেকে ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসান ও সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্সের নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে ফের ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান নেয়। এ সময় পর্যন্ত অনেকটা অহিংস আন্দোলনই করছিলেন তারা।

কিন্তু বিকাল ৩টার দিকে ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক গাড়ি নিয়ে বাসভবনের দিকে ঢুকতে চাইলে শুরু হয় সহিংস আন্দোলন। এ সময় ছাত্রলীগ কর্মীরা গাড়ির দিকে তেড়ে যায় এবং গালাগাল দিতে থাকে। চারদিক থেকে ভিসির গাড়িতে হামলা হয়। মারধর করা হয় তার ড্রাইভারকেও। পরে উপস্থিত পুলিশ সদস্য ও গণমাধ্যমকর্মীদের সহায়তায় ভিসি তার বাসভবনে প্রবেশ করেন। এরপর ভিসির বাসভবনের মূল ফটকে অন্তত পাঁচ দফায় হামলার ঘটনা ঘটে। কিন্তু হঠাৎ করেই অহিংস একটি আন্দোলন কেন সহিংস হয়ে উঠল, তা এখনও রহস্যই রয়ে গেছে।

ক্ষণে ক্ষণে অবস্থান পাল্টেছে ছাত্রলীগ : ঘটনার দিন আন্দোলনের পুরো সময়টাতেই রহস্যময় ভূমিকায় ছিল ছাত্রলীগ। তাদের কার্যক্রমে প্রতিফলিত হয়েছে- তারা কার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছেন। যার প্রমাণ মেলে ঘটনার দিন ভিসি বাসভবনে প্রবেশ করলেও রেজিস্ট্রারের অপসারণ দাবি ও স্মরণিকা কমিটির সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ছাত্রলীগ কর্মীরা তার বাসভবন ঘেরাও করে রাখে।

বিকাল ৪টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. এম আমজাদ আলী ভিসির কার্যালয় থেকে বের হয়ে আসেন। ঢাবি ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে সঙ্গে নিয়ে এ সময় তিনি এক ব্রিফিংয়ে জানান, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সৈয়দ রেজাউর রহমানকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহিত দেয়া হয়েছে। পরে ঢাবি ছাত্রলীগ সভাপতি হাসান ও প্রিন্স সাংবাদিকদের জানান, তাদের প্রাণের দাবি রেজিস্ট্রারকে চাকরিচ্যুত করা পূরণ হয়েছে। তবে কমিটির অন্যদেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

এদিকে বিকাল পৌনে ৫টার দিকে ভিসি যখন তার বাসভবনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন তখন ভিসির পদত্যাগের নতুন দাবি নিয়ে ছাত্রলীগ কর্মীরা ভিসি চত্বরে আবার জড়ো হতে থাকেন। রাত ৮টার মধ্যে ভিসিকে পদত্যাগের আলটিমেটাম দেয়া হয়। পদত্যাগ না করলে ২ জুলাই থেকে লাগাতার ধর্মঘট দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় অচল করে দেয়ার ঘোষণা দেন তারা। বিষয়টি নিয়ে সবার মধ্যেই কৌতূহল সৃষ্টি হয়। কারণ আন্দোলন স্থগিতের পর নতুন করে জড়ো হয়ে এ ধরনের দাবির কারণ কী, তা কেউই বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

রাত পৌনে ৮টার দিকে ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইন এবং ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসান ও সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্স ভিসির বাসভবনের সামনে আসেন এবং ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু মূল ফটক ভেতর থেকে তালাবদ্ধ থাকায় প্রবেশ করতে পারেননি। পরে রাত ৮টা ১৬ মিনিটে তারা ভিসির বাসভবনে প্রবেশ করেন।

রাত ৯টা ২৫ মিনিটে ভিসির বাসভবন থেকে বেরিয়ে তারা কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। পরে জানা যায়, ওইদিন ভিসি তাদের সাক্ষাৎই দেননি। ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর জানান, ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। ভিসি তাদের সাক্ষাতের সুযোগ দেননি।

আন্দোলনের পুরো সময়জুড়ে ছাত্রলীগের এ ধরনের নাটকীয় ও রহস্যময় ভূমিকা সবার মধ্যেই প্রশ্ন তৈরি করছে। ছাত্রলীগ কেন সেদিন বারবার অবস্থান পরিবর্তন করেছে, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা গুঞ্জন। ছাত্রলীগের অনৈতিক দাবি না মানার ফলেই এমনটি হতে পারে সংশয় প্রকাশ করছেন কেউ কেউ। তবে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। ইতিহাস বিকৃতির প্রতিবাদেই তাদের এ আন্দোলন।

রেজাউর রহমানকে চাকরিচ্যুত নয়, পদচ্যুত করা হয়েছে : ইতিহাস বিকৃতির ঘটনায় সৈয়দ রেজাউর রহমানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের পদ থেকে অব্যাহিত দেয়া হলেও তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়নি বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে। ১২ জুলাই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) উপপরিচালক হিসেবে যোগদান করেছেন বলে যুগান্তরকে নিশ্চিত করেছেন টিএসসির পরিচালক এএম মহিউজ্জামান চৌধুরী ময়না।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. এম আমজাদ আলী যুগান্তরকে বলেন, যেহেতু তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন তাই তদন্ত শেষ করে প্রশাসন তার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক যুগান্তরকে বলেন, তাকে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার পদ থেকে পদচ্যুত করা হয়েছে, চাকরিচ্যুত করা হয়নি।