জমিন বেইচে হজ করছি, আল্লাহ তুমি কবুল করো । আমীন ।

সামসুল হক। বয়স আনুমানিক ৭৫ বছর হবে। সঠিকভাবে বলতে পারেন না বয়সের তথ্য। ছোটবেলায় বাবা-মা মারা যাওয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পা পড়েনি। অভাব-অনটনের সঙ্গে সংগ্রাম করে জীবন অতিবাহিত করেছেন জামালপুর সদরের এই চাষি।

ঢাকা: সামসুল হক। বয়স আনুমানিক ৭৫ বছর হবে। সঠিকভাবে বলতে পারেন না বয়সের তথ্য। ছোটবেলায় বাবা-মা মারা যাওয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পা পড়েনি। অভাব-অনটনের সঙ্গে সংগ্রাম করে জীবন অতিবাহিত করেছেন জামালপুর সদরের এই চাষি।

খেয়ে না খেয়ে পরের বাড়িতে কৃষাণ খেটে তিন একর জমির মালিক হয়েছেন।

সাত মেয়ে, এক ছেলে আর স্ত্রী নিয়ে তার সংসার। নিজস্ব ধানী জমিতে চাষ করেই চলে তার জীবন। এক এক করে বিয়ে দিয়েছেন সাত মেয়ে ও তিন ছেলেকে। এতো অভাব-অনটনের মধ্যেও প্রবল ইচ্ছা ছিলো, একদিন হজ করবেন। সেই ইচ্ছা পূরণ হয়েছে।

কৃষিকাজই আয়ের প্রধান উৎস সামসুল হকের। যে কারণে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। হজে মোট খরচ হয়েছে তিন লাখ ২০ হাজার টাকা। এই টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে ২০ হাজার টাকা দরে নয় কড়া জমি বিক্রি করতে হয়েছে। নয় কড়া জমিতে মোট ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা এসেছে। বাকি অর্থের সংস্থান করেছেন মেজোছেলে জুয়েল হক ও ছোটছেলে মাজেদুল হক।

পবিত্র হজ পালন শেষে সৌদি আরব থেকে বুধবার (২১ সেপ্টেম্বর) দিনগত রাতে দেশে এসেছেন। বাংলাদেশ বিমানের  ফিরতি ফ্লাইট শাহজালাল
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাতেই আনন্দে আত্মহারা সামসুল। মধ্যরাতে তার মুখয়ায়ব দেখেই তা বোঝার বাকি রইলো না। কারণ, দীর্ঘদিন পর বহু কষ্টে পূর্ণ হয়েছে তার মনের আশা।

হজ প্রসঙ্গে সামসুল বলেন, হজে করে ভালো নাগলো। সব আল্লার ইচ্চা। হজ করবো আশা ছ্যালো (ছিলো)। নও (নয়) কড়া জমিন বেচছি। বাদ বাকি ট্যাকা দুই পুলাই দিইচে (দিয়েছে)। ওরাই ট্যাকা নাড়াচাড়া কইছে (করছে)। আমি ট্যাকা হাত দিইছি না (দেইনি)। হজ কইরা মিছা কতা কওন যাবে না। মাল্লমে (মোয়াল্লেম ফি) দিইছে তিন নাক (লাখ) ২০ হাজার। আমি তো জীবনে এল গাড়িতেও (ট্রেন) চড়ছি না (চড়িনি)। বিমান চড়ে ভালোই নাগলো (লাগলো)। হজে সবার জন্য দোয়া করচি। মক্কা, মদিনা, আরাফা মিনার সগল জমিনে দোয়া করছি। আর আল্লাহর কাছে কইছি, কষ্ট করে ট্যাকা জুগাড় করছি আল্লাহ হজ কবুল করো।

একই অবস্থা বগুড়া শেরপুরের চাষী জসিম উদ্দিনের। হজের সমস্ত খরচ সংগ্রহ করতে বিক্রি করেছেন ২৮ শতক জমি। জসিম মাত্র পাঁচ বিঘা জমির মালিক। এর মধ্য থেকে পাঁচ ছেলে ও পাঁচ মেয়েকে বড় করেছেন। একে একে সব মেয়ের বিয়েও দিয়েছেন।

শত অভাবের মধ্য থেকেও হজ শেষে আনন্দে আত্মহারা তিনি। এদিন মধ্যরাতে বিমান বন্দরে নেমেছেন তিনি। বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে রিজার্ভ বাসে ওঠার তাড়া জসিম উদ্দিনের। হজে মোট তিন লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

haji-bg20160922105238

জসিম উদ্দিন বলেন, হজে তিন লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ। ২৮ শতক জমি বেইচে হজ করছি। ভালোই লাগছে। আল্লাহর অনেক রহমত।

বগুড়ার আরেক কৃষক মহির উদ্দিন (৭৫)। ছয় ছেলে ও পাঁচ মেয়ের সংসার তার। সম্পদ বলতে ছয় বিঘা জমি। এর মধ্য থেকে দেড় বিঘা জমি বিক্রি করে হজ পালন করলেন তিনি।

বিলম্বে ফিরতি হজ ফ্লাইটসহ সৌদি আরবে নিম্নমানের বাড়িতে দু’জনের কক্ষে গাদাগাদি করে রাখা হয় পাঁচ থেকে ছয়জন।

এছাড়া সৌদি আরবে গুরুতর অসুস্থ হাজীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েই ছেড়ে দেয় হজ চিকি‍ৎসক দল। এসবসহ নানা অভিযোগের কথা উঠেছে। তবে এসব হাজিদের কাছে ম্লান। কারণ, এর চেয়ে শত কষ্ট পাড়ি দিয়ে বয়ে চলেছে জীবন নামক তরী। যে কারণে হজ পালন করতে গিয়ে কোনো সমস্যা ও কষ্ট খুঁজে পাননি মহির উদ্দিন।

মহির উদ্দিন বলেন, হজ সুন্দরমতো করছি। কোনো সমস্যা হয়নি। কোনো জিনিসের অভাব নাই। চাষি ছিলাম, এখন হজ করে মনের আশা পূরণ হইচে। আর জীবনে কুনু কিচ্চু (কোনোকিছু) চাওয়া নাই।