জুনায়েদ জামশেদ (রাহ.) যেভাবে পপ থেকে ইসলামী কিং অব সুলতান!

আলহামদুলিল্লাহ জামিয়া ইকরা ঢাকায় পড়ার বদৌলতে সরাসরি তাকে দেখার এবং আলতো করে হাতে হাত রাখার সৌভাগ্য হয়েছে দু’তিনবার। কথাও হয়ে দু’চার মিনিট। একদম সদামাটা এক মানুষ।

দু’বার সরাসরি তাঁর সংগীত শোনার তাওফিক হয়েছে। একবার বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টার বসুন্ধরা ঢাকা। আরো একবার আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ সাহেবের ইসলাহী ইজতেমা কিশোরগঞ্জ বেলংকায়। দু’জায়গায়ই শিল্পী নিজেই তাঁর বদলে যাবার কাহিনী শুনিয়েছেন।

যেভাবে গান থেকে ইসলামী সংগীত ক্যারিয়ারে:

তিনি বলেন আমার পিতা হলেন বিমানবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। আমি লাহোরের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ গ্রাজুয়েশন করার পর শখের বশেই রাহেল হায়াত ও শাহজাদ হাসানের সাথে ১৯৮৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দেশাত্মবোধক গান ‘দিল দিল পাকিস্থান’ গাওয়ার মাধ্যমে দেশের প্রথম পপ ব্যান্ড ভাইটাল সাইন প্রতিষ্ঠা করি। আমাদের প্রথম হিট এ্যালবাম ‘দিল দিল পাকিস্থান’ আকাশচুম্বী খ্যাতি এনে দেয়। এই গানটিই আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আমাকে একজন শৌখিন সংগীতসেবী থেকে পেশাদার শিল্পীতে পরিণত করে।

বিমানবাহিনীতে যোগ দিতে ব্যর্থ হয়ে আমি একজন পেশাদার প্রকৌশলী হতে চেয়েছিলাম। সংগীতকে কেবল শখের বশেই শুরু করেছিলাম। কিন্তু এই প্রাথমিক সফলতার কারনে রাহেল ও সাজ্জাদ আমাকে বুঝিয়ে রাজি করান। অনেকগুলো জনপ্রিয় ও হিট এ্যালবাম বের করার পর ১৯৯৫ সালে যখন ব্যান্ড ভেঙে যায় তখন আমি আমার একক ক্যারিয়ার শুরু করি। এতেও আমি অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করি। পাকিস্তানে প্রথম পপস্টার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমার সংগীত ‘কসম উস ওয়াক্ত কি’, পাকিস্থান বিমানবাহিনীর সংগীত ‘পালাটনা ঝাপাটনা’ -তে শিল্পী হিসেবে আমাকেই বাছাই করে।

এরপর বলেন:
যখন তিনি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে, একের পর এক হিট এ্যালবাম বেরুচ্ছে, তখন হঠাৎ করেই সঙ্গীত ছেড়ে দেয়ার ঘোষণা দেন । ২০০২ সালে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি যখন ঘোষণা করলেন যে তিনি গানবাজনা ছেড়ে দিবেন তখন সংগীতাঙ্গনে যেন ঝড় উঠলো। তার অসখ্য ভক্ত তাদের প্রিয়তম শিল্পীকে হারিয়ে শোকাহত হয়ে পড়লো। ২০০৩ সালের ১৪ আগস্ট তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সংগীতজগতকে বিদায় জানান। যে জায়গায় ‘দিল দিল পাকিস্থান’-গাওয়ার মাধ্যমে শিল্পীজীবন শুরু করেছিলেন ঠিক একই জায়গায় একই গানের মাধ্যমে সংগীত জীবনে পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন। এই মেধাবী শিল্পী তার ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করে খ্যাতি ও ভবিষ্যতের পরিবর্তে ঈমানকে বেছে নিলেন। এই নাটকীয় কাহিনী তিনি নিজেই বলেন এভাবে যে,

২০০৩ সালের কথা। একদিন জুন মাসের প্রচণ্ড গরমে করাচীর রাস্তা দিয়ে গাড়ী চালিয়ে যাচ্ছিলাম। বাইরে তখন লু-হাওয়া বইছে। রাস্তায় পায়ে হাঁটা মানুষের সংখ্যা খুব কমই পরিলক্ষিত হচ্ছিল। এমন সময় দেখি, তাবলীগের কিছু ভাই গাশতে (দ্বীনের দাওয়াতে) বের হয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। আর তাদের শরীর দিয়ে ঝর ঝর করে ঘাম ঝরছে। জামা-কাপড় সব ভিজে গেছে। তাদেরকে দেখে মনে মনে বললাম, লোকগুলো পাগল ছাড়া আর কি! নিজেদের আরামও নষ্ট করছে, অন্যদেরকেও বাড়ী থেকে বের করে কষ্টের মধ্যে ফেলার ফিকির করছে।

পরে চিন্তা করলাম, আমি এই এসি গাড়ীতে কত আরামে বসে আছি। কিন্তু এরা কিসের জন্য নিজেদেরকে এই কষ্টের মধ্যে ফেলছে? কেন তারা এই ত্যাগ স্বীকার করছে?

ওই জামা’আতে আমার স্কুল জীবনের এক সহপাঠী ছিল। সে আমায় বললো- ‘জুনায়েদ! এখন তুমি যে সম্মানের মধ্যে আছো, এটা চিরস্থায়ী নয়, এটা একদিন শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আমি তোমাকে যে পথে আহ্বান করছি-প্রকৃত সম্মান সে পথেই আছে। এখন হয়তো তুমি বুঝতে পারবে না। কিন্তু একদিন তোমার বুঝে আসবে যে, আমিই তোমার প্রকৃত কল্যাণকামী’।

আমি ভাবলাম, গান-বাদ্য তো আল্লাহর নাফরমানীর কাজ। তাই গান গাইতে ভালো লাগলো না। আবার চিন্তা করলাম, না গাইলে সংসার চলবে কি করে? এসব চিন্তা করে মনের সাথে লড়াই করে যেতে লাগলাম।

এদিকে শয়তান কিন্তু বসে থাকল না। আমার সংকল্প থেকে আমাকে টলাবার জন্য বিভিন্নভাবে সে জাল ফেলতে লাগলো। বড় বড় অফার আসতে লাগলো। একটা মাত্র গান গাওয়ার জন্য, একটা মাত্র শোতে অংশ নেয়ার জন্য লাখ লাখ টাকার প্রস্তাব আসতে লাগলো। কিন্তু আমি আল্লাহর উপর ভরসা করে সব লোভ ত্যাগ করলাম। ইতোমধ্যে আমার ঈমানী পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। বেতন দিতে না পারার কারণে ছেলে-মেয়েকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে আনলাম। গাড়ীটা বিক্রি করে দিলাম। এক সময় বাড়ীও বিক্রি করে দিলাম। স্ত্রী ঈমানের তালীম অর্জন করেছিল। বললো, আপনাকে সে চিন্তা করতে হবে না। আজ যিনি রিযিক দিচ্ছেন, আগামীকালও তিনিই রিযিক দিবেন।

এখন আমি পায়জামা-পাঞ্জাবী তৈরী করি। সারা পাকিস্তানে আমার ৪৫ টা শো রুম আছে। সবগুলো আমি চিনিও না। কোথাও আমার যাওয়াও লাগে না। আমি এখন একেবারে অবসর। প্রায় সারাবছর তাবলীগে সময় লাগিয়ে বেরাচ্ছি। আগে গান গাওয়ার জন্য সারা বিশ্ব সফর করেছি। এখন দাওয়াতের কাজে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছি। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ্‌ তা’আলা আমার গলাটাকেও কাজে লাগিয়ে দিলেন।”

সঙ্গীত যার পেশা, সঙ্গীত যার নেশা, রক্তের কণায় কণায় যার সঙ্গীত তার জন্য সঙ্গীত ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন। তিনি সেই দিনকে স্মরন করে বলেন আমি খুব বিষন্ন ছিলাম কারন সংগীত ছিল আমার রক্তকনিকায়, আমার চামড়ার নিচে, যাতে আমি ছিলাম অভ্যস্থ। কিন্তু আমি শুধু আল্লাহকে খুশী করতে চেয়েছি। আমি সেই ব্যক্তি হতে চাইনি যাকে আল্লাহর কিতাবে খারাপ বলা হয়েছে। আমি বর্তমানে পপস্টারের চেয়ে একজন দ্বীনের দাঈ হিসেবেই জীবন কাটাতে অনুপ্রানিত হয়েছি। আমি ১৬ বছর যাবৎ টাকা, খ্যাতি ও প্রচারণার পিছনে ছুটেছি। আমার এখন আর প্রচারনার প্রতি কোন আকর্ষন নেই। মানুষ চায়না আমি আল্লাহর হুকুম মেনে চলি। জুনায়েদ জামদেশেদের এই পরিবর্তন তার অসংখ্য ফ্যানকে আহত করেছে। তারা ধারনা করেছে যে, জুনায়েদ জামশেদ পাগল হয়ে গেছে। জামশেদ খুশি যে, তার পরিবার তাকে সহায়তা করেছে। তার স্ত্রী সহজেই এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছে। যে দিল দিল পাকিস্থান, এইতেবার, উস রাহ পার, দিল কি বাত এর মত হিট এ্যালবামের শিল্পী তিনিই আজ গেয়ে চলছেন বদরুদ্দোজা শামসুদ্দোহা, মেহবুবে ইয়াজদান, জালওয়ায়ে জানান এর মত উচ্চাঙ্গের নাশীদ-ইসলামী সংগীত। তার মধুর কন্ঠে গাওয়া ‘এ্যায় আল্লাহ তুহি আতা তো যুদো ছাখা’ সত্যিই চমৎকার। মুফতী তাকি উসমানী সাহেব (দামাত বারকাতাহুম) এর লেখা ‘এলাহি তেরি চৌকাঠ পার ভিখারী বানকে আয়াহু’ এবং ‘মুঝে যিন্দেগী মে ইয়া রব সারে বন্দেগী আতা কর’ জুনায়েদের কণ্ঠে শুনলে হৃদয়ের গভীর থেকেই এ দুআ আসে “আল্লাহ যেন তার মত আমাদেরও তার দুয়ারের ভিখারী হিসেবে কবুল করেন, আমাদের জিন্দেগীকে তাঁর বন্দেগীতে ভরে দেন”।

প্রান্তিতায় এসে দোয়া করি, আল্লাহ তাকে শাহাদাতের দু উচ্চ মাক্বাম দান করুন।

লেখক : শিক্ষার্থী, দারুল উলুম দেওবন্দ