ঢাকায় দ্রুত ধেয়ে আসছে বন্যা

ঢাকার আশপাশে বুড়িগঙ্গা, বালু, শীতলক্ষ্যা প্রভৃতি নদ-নদীর পানি বাড়ছে, যা পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে- রোববার সন্ধ্যায় বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বিশেষ খবরে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি জানানো হয়েছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় পদ্মা নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে।

এতে পদ্মাসংলগ্ন রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুর জেলাগুলোর নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত থাকতে পারে। গত কয়েক দিনে দেশের উত্তর-পূর্ব-দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আগামী দু-তিন দিনের মধ্যে অমাবস্যার জোয়ারের প্রভাবে সপ্তাহের শেষভাগে আরেক দফা ভারি বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে। মধ্যাঞ্চলে বন্যার পানি থমকে থাকা এবং তার সঙ্গে জোয়ারের প্রভাবে এবার এক যুগের মধ্যে ঢাকা সবচেয়ে বড় বন্যায় প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি জোরালো হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্যবারের মতোই বন্যার পানি ঢাকায় ঢুকবে পূর্বাঞ্চলের অরক্ষিত বন্যাপ্রবণ এলাকা দিয়ে। গত দু-তিন দিনে যার লক্ষণ দেখা দিয়েছে শীতলক্ষ্যা আর বালু তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে পানির স্তরের ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান থেকে।

ঢাকা মহানগরী রক্ষা বাঁধের একাংশ সমাপ্ত হলেও পূর্বাঞ্চলীয় বাঁধ না হওয়ায় এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকার গত এক দশকের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার ফলাফলেও ঢাকার পূর্বাঞ্চলকে বন্যার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পূর্বাঞ্চল দিয়ে বন্যার পানি ঢাকায় ঢুকলে তা সরতে অনেক সময় লাগবে। তাই সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় দ্রুত ঢাকার সব সেবা সংস্থাকে সক্রিয়ভাবে প্রস্তুত করা দরকার। যদিও সে রকম ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।

তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, ঢাকার বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। একই কথা বলেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারাও।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ সংক্রান্ত ৯০টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণ অনুসারে গতকাল ৪৬ পয়েন্টে পানি বিভিন্ন হারে বেড়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ধলেশ্বরীর এলাসিন পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ১৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ঢাকার পাশে তুরাগ নদের পানি বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যার পানিও বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে।

ঢাকার কাছে টঙ্গী খালেও পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। বালু নদের পানিও একই ধারায় বিপদসীমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে ৩৯ নদীর পানি আগের তুলনায় কমেছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক সেলিম ভূঁইয়া বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার দেশ একটি বড় বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। উত্তরাঞ্চলে পানি কমতে থাকলেও মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চল এখন বন্যার কবলে পড়েছে। ঢাকাও ইতোমধ্যে বন্যাক্রান্ত হয়ে পড়েছে।

বন্যা পরিস্থিতির তথ্য-উপাত্ত পর্যবেক্ষণ করে তিনি বলেন, দুই-তিন দিন বৃষ্টি কম থাকায় বন্যার পানির একটানা ঊর্ধ্বগতিতে কিছুটা থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। কিন্তু অমাবস্যা এবং এর পরপরই আবারো ভারি বর্ষণের পূর্বাভাস রয়েছে। অমাবস্যার প্রভাবে সমুদ্রে পানির উচ্চতা বেশি থাকে। ফলে বন্যার পানি যেমন সহজে সমুদ্রে নেমে যেতে পারবে না, তেমনি ভেতরের সব নদ-নদীতেও বাড়তি জোয়ার থাকবে। যার সঙ্গে বন্যার পানি যুক্ত হয়ে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হবে, সঙ্গে যোগ হবে ভারি বৃষ্টির পানি। তাই অবস্থা সহজেই অনুমেয়।

তবে অস্বাভাবিক কারণে চলতি সপ্তাহের শেষভাগে বা মধ্য আগস্ট নাগাদ আর ভারি বৃষ্টি না হলে হয়তো কিছুটা রেহাই পাওয়া যাবে। বালু ও শীতলক্ষ্যার পানি না কমে থমকে থাকলে বা ধীরগতিতে কমতে থাকলে তা ঢাকার জন্য বিপজ্জনক। এর মধ্যে বালু-শীতলক্ষ্যায় পানি আরো বাড়ছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ১৯৫৪-২০০৯ সাল পর্যন্ত ৫৫ বছরে বড়, মাঝারি ও ছোট ধরনের ৫০টি বন্যা রেকর্ড করা হয়। এত বছরে সবচেয়ে বড় ব্যাপ্তির পাঁচ বন্যার মধ্যে ২০০৪ সালের বন্যা অন্যতম।

এবার পরিস্থিতি সে রকম হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বেশি হবে। কারণ ২০০৪ সালের চেয়ে এখন ঢাকার ঘনবসতি যেমন বেড়েছে, তেমনি জনসংখ্যা ও অবকাঠামোগত নানা প্রতিবন্ধকতাও বেড়েছে। ফলে পানি দ্রুত না সরাতে পারলে অবস্থা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

সূত্র জানায়, সীমান্তের ওপারে পাহাড়ি ঢল ও ভারি থেকে ভারি বর্ষণের প্রভাবে অন্যবারের মতোই এবারও প্রথমে উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে আগাম বন্যা দেখা দেয়। সরকারি হিসাবেই এখন পর্যন্ত ১৬টি জেলা প্লাবিত হয়েছে। গত দুই দিনে উত্তরাঞ্চলের পানি কমতে শুরু করলেও তার গতি অনেকটা ধীর।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ৫৫ বছরে সবচেয়ে বড় বন্যাটি হয় ১৯৯৮ সালে। তাতে দেশের এক লাখ ২৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হয়। ১৯৮৮ সালের বন্যায় প্লাবিত হয় ৮৯ হাজার ৯৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকা।

২০১৪ সালে প্রকাশিত ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের গবেষণার ফল অনুযায়ী, ১৯৯৮ সালের পর ২০০৪ সালের জুলাইয়ে ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা বড় বন্যায় প্লাবিত হয়। যা ওই বছর আগস্ট পার হয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী ছিল।

২০০৭ সালে আরেকটি বড় বন্যা শুরু হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এ পর্যন্ত যতবার ঢাকা প্লাবিত হয়েছে তার প্রতিবারই পানি ঢুকেছে পূর্বাঞ্চল হয়ে। আর ডিএনডি বাঁধ নির্মাণের পর ঢাকার পশ্চিমাঞ্চল আগের তুলনায় বেশি সুরক্ষিত হলেও পূর্বাঞ্চল রয়ে গেছে আগের মতো অরক্ষিত। অবশ্য ঢাকা মহানগরীর বাইরে মানিকগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ সংলগ্ন ঢাকা জেলার অন্যান্য এলাকা প্লাবিত হয় পদ্মার প্রভাবে।

ঢাকাকে বন্যার কবল থেকে রক্ষায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা কয়েক বছর ধরেই সরকারের প্রস্তাবিত ঢাকা পূর্বাঞ্চলীয় বাঁধ নির্মাণের ওপর জোর দিচ্ছেন। তা সত্ত্বেও ১৬ বছর ধরে অরক্ষিত পড়ে আছে রাজধানীর পূর্বাঞ্চলীয় এলাকা। এবার পূর্বাঞ্চলীয় নিচু এলাকাগুলোতে পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ আরো বেড়ে গেছে।

পাউবোর কেন্দ্রীয় জোনের প্রধান প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বন্যা এলেই ঢাকায় যে উৎকণ্ঠা দেখা দেয় পূর্বাঞ্চলীয় বাঁধ নির্মিত হলে তা দূর হবে। আমরা জানি, বন্যা অবস্থা তৈরি হলে পূর্বাঞ্চল দিয়েই ঢাকায় পানি ঢুকে পড়ে। তবে এবার বন্যা ঢাকায় আসতে যাচ্ছে- এমন আশঙ্কা মাথায় রেখেই আমরা আমাদের দিক থেকে সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।’

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) বাঁধের কারণে রাজধানী ঢাকার একাংশ সুবিধা পেলেও বেশির ভাগ এলাকা থেকে গেছে অরক্ষিত।

এ কারণেই ১৯৯৮ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার প্রায় ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ঢাকা পূর্বাঞ্চলীয় বাঁধ ও বাইপাস’ প্রকল্পটির পরিকল্পনা করে। পাউবোর মাধ্যমে প্রথমবারের প্রস্তাবে দুই হাজার ৪৭৫ কোটি টাকার প্রাক্কলন ব্যয়ের প্রকল্পটি তখনই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পায়। এই টাকার মধ্যে প্রায় সাড়ে ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয় শুধু বাঁধ নির্মাণের জন্য।

বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকসহ আরো একাধিক সংস্থা এ প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ সহায়তা দিতে আগ্রহ দেখায়। এমনকি প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নানামুখী সমীক্ষা চলে অনেক দিন। তবে টাকা না পাওয়ার অজুহাতে চারদলীয় জোট সরকার ২০০৫ সালে প্রকল্পটি স্থগিত করে দেয়।

এর পর থেকে প্রতিবার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য পাউবো তোড়জোড় শুরু করে। ব্যয় পরিধিও বাড়ে। তবে দাতা সংস্থাগুলো পিছুটান দেওয়ায় প্রকল্পটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। পরে প্রকল্পটি নতুন বৃহত্তর একটি প্রকল্পের আওতায় নিয়ে কয়েকটি মন্ত্রণালয়কে এর সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা ধরে নতুন করে প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হয়।

পাউবোর কেন্দ্রীয় জোনের প্রধান প্রকৌশলী জানান, গত বছর নতুন প্রস্তাবটির আওতায় উপযোগিতা সমীক্ষার জন্য একটি চীনা কোম্পানির সঙ্গে সরকারের চুক্তি হয়। এখন ওই সমীক্ষার কাজ চলছে। পাশাপাশি প্রকল্পটি সরকারের অনুমোদনের জন্য জমা দেওয়া হয়েছে ইআরডিতে।

ওই প্রকৌশলী বলেন, এত বছরেও প্রকল্পটি আলোর মুখ না দেখার মূল কারণ হচ্ছে টাকা। প্রকল্পের জন্য দাতা খোঁজা হচ্ছে। বড় প্রকল্প হওয়ায় এমন সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। পাউবো প্রকল্পটি একা বাস্তবায়ন করবে না, আরো সাতটি সরকারি সংস্থাকে যুক্ত করে একটি ‘আমব্রেলা প্রজেক্ট’ করার প্রস্তাব রয়েছে।

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের গত মেয়াদে এই প্রকল্পের সঙ্গে শুধু পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে না রেখে রাজউক, ঢাকা সিটি করপোরেশন, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, সড়ক ও জনপথ বিভাগকেও যুক্ত করা হয়। নতুন পরিকল্পনায় অনেকটা পরিবর্তন আসতে পারে। আগে বাঁধের সঙ্গে দুই লেন সড়কের পরিকল্পনা ছিল, এখন চার লেন সড়কের পরিকল্পনা যুক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে খরচও আগের চেয়ে অনেক বেড়ে যাবে।