তালাক সম্পর্কিত হাদিস সমূহ

দেখি তালাক সম্পর্কে  হাদিস শরীফ কি বলে?

১. হাদিস শরীফে উলে­খ আছে, রাগের বশবর্তী হয়ে অর্থাৎ রাগের মাথায় তালাক দিলে তা তালাক বলে গণ্য হবে না। যেমন আবু দাউদ শরীফের কিতাবুত তালাক অধ্যায়ের ‘বাবু ফিত তালাক্বি আ’লা গাইজী’ অর্থাৎ ‘রাগান্বিত অবস্থায় তালাক দেয়া’ অনুচ্ছেদে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হাদিস শরীফটি নিম্নরুপঃ

অর্থাৎ মুহাম্মাদ ইবনে উবায়দ ইবনে আবু সালিহ (র) হতে বর্ণিত, যিনি (সিরিয়ার) ইলিয়া নামক স্থানে বসবাস করতেন। তিনি বলেন, আমি সিরিয়া হতে আদী ইবনে আলী আল কিন্দীর সাথে বের হই। এরপর আমরা মক্কায় উপনীত হলে, আমাকে সাফিয়্যা বিনতে শায়বার নিকট তিনি প্রেরণ করেন। যিনি আয়শা (রা) হতে এ হাদিসটি সংগ্রহ করেন। রাবী বলেন, আমি আয়শা (রাঃ) কে বলতে শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেছেনঃ গিলাক অবস্থায় কোন তালাক হয় না বা দাস মুক্ত করা যায় না। ইমাম আবু দাউদ (র) বলেন, গিলাক অর্থ রাগান্বিত অবস্থায় তালাক প্রদান করা। (আবু দাউদ শরীফ, ৩য় খন্ড, ২১৯১ নং হাদিস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

২. এছাড়া নিদ্রিত ও উন্মাদ (নেশাগ্রস্থ বা রোগগ্রস্থ) অবস্থায় তালাক হয় না। (সুনানু নাসাই শরীফ–৩য় খন্ড,-৩৪৩৩ নং হাদিস এবং সুনানে ইবনে মাজাহ শরীফ–২য় খন্ড–২০৪১, ২০৪২ নং হাদিস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

৩. তালাক হায়েজ তথা রজঃস্রাবের সাথে সম্পর্কিত। এ সম্পর্কে আবু দাউদ শরীফের কিতাবুত তালাক অধ্যায়ের ‘সুন্নত তরিকায় তালাক’ অনুচ্ছেদে উল্লে­খ আছে, “আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা) হতে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর যুগে তাঁর স্ত্রীকে হায়েজ (রজঃস্রাব) অবস্থায় তালাক প্রদান করেন। তখন উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) এ ব্যাপার রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, তুমি তাকে তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে বল এবং হায়েজ হতে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাকে নিজের কাছে রাখতে বল। এরপর সে পুনরায় হায়েজ এবং পুনরায় হায়েজ হতে পবিত্র হলে সে তাকে চাইলে রাখতেও পারে এবং যদি চায় তাকে তালাক দিতে পারে, এই তালাক অবশ্য তার সাথে সহবাসের পূর্বে পবিত্রাবস্থায় দিতে হবে। আর এ ইদ্দত আল্লাহ তায়ালা নারীদের তালাক প্রদানের জন্য নির্ধারিত করেছেন।” (আবু দাউদ শরীফ, ৩য় খন্ড, ২১৭৬ নং হাদিস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

৪. আবু দাউদ শরীফের কিতাবুত তালাক অধ্যায়ে ‘আলবাত্তাতা’ অর্থাৎ এক শব্দে তিন তালাক প্রদান করা বিষয়ে উল্লেখিত আছে, “নাফি ইবনে উজায়র ইবনে আবদ ইয়াযীদ ইবনে রুকানা (রা) হতে বর্ণিত। রুকানা ইবনে আবদ ইয়ায়ীদ তাঁর স্ত্রী সুহায়মাকে ‘আলবাত্তাতা’ (এক শব্দে তিন তালাক) শব্দের দ্বারা তালাক প্রদান করে। তখন এতদসম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) অবহিত করা হয়। তখন তিনি বলেন, আল্লাাহর শপথ! আমি এর দ্বারা এক তালাকের ইচ্ছা করি। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, আল্লাহর শপথ, তুমি কি এর দ্বারা এক তালাকের ইচ্ছা করেছ? তখন জবাবে রুকানা বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি এর দ্বারা এক তালাকের ইচ্ছা করি। এতদশ্রবণে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে স্বীয় স্ত্রী পুনরায় গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করেন। অতঃপর তিনি উমার (রা) এর খিলাফতকালে তাকে দ্বিতীয় তালাক দেন এবং তৃতীয় তালাক প্রদান করেন উসমান (রাঃ) এর খিলাফত কালে।” (আবু দাউদ শরীফ, ৩য় খন্ড, ২২০৩ নং হাদিস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

একসাথে তিন তালাক উচ্চারণকে ইসলামী শরিয়ার পরিভাষায় তালাকে বিদা বলে। একসাথে তিন তালাক উচ্চারণে তালাক হবে এ ধরণের কোন আইন নবীজি (সাঃ) এর সময়ে ছিল না। আসলে শারিয়ার এ আইন বানানো হয়েছে নবীজীর অনেক পরে। এ কথা বলেছেন কিছু বিশ্ববিখ্যাত শারিয়া–সমর্থকরাই। যেমন, “নবীজীর ওফাতের বহু পরে তালাকের এক নূতন নিয়ম দেখা যায়। স্বামী একসাথে তিন–তালাক উচ্চারণ করে বা লিখিয়া দেয়। এই তালাকে অনুতাপ বা পুনর্বিবেচনার সুযোগ নাই। অজ্ঞ মুসলমানেরা এইভাবে গুনাহ্ করে। নবীজী তীব্রভাবে ইহাতে বাধা দিয়াছেন” (সূত্রঃ বিশ্ব–বিখ্যাত শারিয়াবিদ ডঃ আবদুর রহমান ডোই–এর “শারিয়া দি ইসলামিক ল’  পৃঃ ১৭৯)।

“নবীজীর সময় থেকে শুরু করে হজরত আবু বকর ও হজরত ওমরের সময় পর্যন্ত একসাথে তিন–তালাক উচ্চারণকে এক–তালাক ধরা হত। কিন্তু যেহেতু লোকে তাড়াতাড়ি ব্যাপারটার ফয়সালা চাইত তাই হজরত ওমর একসাথে তিন–তালাককে বৈধ করেন এবং এই আইন চালু করেন” (সূত্রঃ আবু দাউদ শরীফ, ৩য় খন্ড, ২১৯৬নং হাদিস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং মুসলিম শরীফ, ৫ম খন্ড, ৩৫৩৮ নং হাদিস, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার)। এখানে দেখা যায় যে, নবীজি (সাঃ) এর আইনের সাথে হযরত উমর (রাঃ) এর আইনের অমিল দেখা যায়। এখন প্রশ্ন হতে পারে আমরা কার আইন মান্য করবো? সোজা উত্তর নবীজি (সাঃ) এর অর্থাৎ একসাথে তিন তালাককে এক তালাক ধরবো। কেননা নবীজি (সাঃ) এক সাথে তিন তালাক অপছন্দ করতেন। যেমন–

(ক) “এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তিন–তালাক একসাথে দিয়েছে শুনে রাসূল (সাঃ) রাগে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, তোমরা কি আল্লাহর কিতাবের প্রতি ঠাট্টা করছ? অথচ আমি এখনও তোমাদের মধ্যেই রয়েছি !  অনেকে এ হাদিসকে মুসলিম শরিফের সূত্রে সঠিক বলেছেন” (সূত্রঃ মওলানা মুহিউদ্দীনের বাংলা–কোরাণের তফসির পৃঃ ১২৮; মাওলানা আশরাফ আলী থানভী’র “দ্বীন কি বাঁতে” পৃঃ ২৫৪ আইন #১৫৩৭, ১৫৩৮, ১৫৪৬ ও ২৫৫৫)।

(খ) “এক সাহাবি তার স্ত্রীকে একসাথে তিন–তালাক বলেছে শুনে রসুল (দঃ) বললেন ‘এই তিন তালাক মিলে হল এক–তালাক। ইচ্ছে হলে এই তালাক বাতিল করতে পার।’ (সূত্রঃ বিশ্ব–বিখ্যাত শারিয়া–সমর্থক মওলানা ওয়াহিদুদ্দিনের “Women in Islami Sharia”–তে ফতহুল বারী’র সূত্রে – পৃঃ ১০৮ ও ১০৯)

৫. ইমাম আবু দাউদ (র) বলেন, ইবনে আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত, “যখন কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে একই সাথে তিন তালাক প্রদান করবে তাতে এক তালাকাই হবে।” (আবু দাউদ শরীফ, ৩য় খন্ড, ২১৯৪ নং হাদিস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

নবীজি তিন একসাথে তিন তালাককে এক তালাক ধরেছেন এবং পরবর্তীতে উমর (রা) তিন তালাককে তিন তালাকই বলে সাবস্ত্য করেছেন। ফলে তাৎক্ষণিক–তালাকে বৈপরিত্য পরিলক্ষিত হয়। এ ক্ষেত্রে কি করতে হবে তা ইমাম শাফি’(র) বলেছেন: “পরস্পর–বিরোধী দুইটি হাদিসের মধ্যে কোন্টি বেশি নির্ভরযোগ্য তাহার বিচার অন্য সুন্নত দ্বারা বা কোরাণ দ্বারা হইবে” (সূত্রঃ ইমাম শাফি’র বিখ্যাত কেতাব “রিসালা” পৃঃ ১৮২, এটিকে সমস্ত শারিয়া বিজ্ঞানের মূল কেতাব বলে ধরা হয়)

যেহেতু একসাথে তিন তালাক উচ্চারনে নিরুৎসাহিত করা, কঠোরভাবে নিষেধ করা এবং সেটাকে এক তালাক হিসাবে গণ্য করাটাকেই অনেক বেশি সুন্নাহর কাছাকাছি। তাই আমার নবীজি (সাঃ) এর সুন্নাহ অনুসরণ করবো অর্থাৎ একসাথে তিন তালাক উচ্চারণকে এক তালাক হিসেবে সাব্যস্ত করবো। ইহাই নবীজি (সাঃ) এর আইন। খলিফা উমর (রা) এর আমলের পাঁচশত বছর পর মুসলিম জাহানে কয়েকজন উদারপন্থী ইসলামী চিন্তাবিদদের আবির্ভাব হয় তাদের মধ্যে প্রখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী ইবনে রুশদ (১১২৬–১১৯৮) ছিলেন। তিনি হাদিস কিতাব আর ইতিহাস বিশ্লেষন করে মুসলিম বিশ্বকে নতুন করে মনে করিয়ে দেন যে সর্বক্ষেত্রে একসাথে তিন তালাক বলে ফেললে তালাক বৈধ হয়ে যায় না। বরং নবীজি (সাঃ) এর হাদিসের বিপরীত, যা পরিতাজ্য।

৬. আবু সাহবা (র) ইবনে আব্বাস (রা) এর নিকট এসে বললেন, হে ইবনে আব্বাস! আপনি কি জানেন না, রাসূল­াহ (সাঃ) এর যুগে এবং আবু বকর ও উমর (রা) এর প্রথম যুগে তিন তালাককে এক তালাক ধরা হতো? তিনি বললেন, হ্যাঁ। (সুনানে নাসাই, ৩য় খন্ড, ৩৪০৭ নং হাদিস ও আবু দাউদ, ৩য় খন্ড, ২১৯৭ নং হাদিস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং মুসলিম শরীফ, ৫ম খন্ড, ৩৫৩৭ নং হাদিস, বাংলাদেশ ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার)

এখানেও দেখা যাচ্ছে যে, তিন তালাককে এক তালাক ধরা হয়।

৭. অনেক সময় স্বামী রাগ করে তার স্ত্রী বলে তুমি আমার জন্য হারাম। কাঠমোল­ারা ফতোয়া দিয়ে থাকে যে, এ কথা বলার জন্য স্ত্রী তালাক হয়ে গেছে। আসলে ইহা মনগড়া। সাঈদ ইবনে যুবায়র (র) থেকে বর্ণিত। তিনি ইবনে আব্বাস (রা) কে বলতে শুনেছেন যদি কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে হারাম বলে ঘোষনা করে তবে তাতে তালাক হয় নাা (বুখারী শরীফ, ৯ম খন্ড, ৪৮৮৮ নং হাদিস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

৮. মহিলাদের তালাকের ক্ষমতা সম্পর্কেও হাদিসে বর্ণিত আছে, “আযেশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এক সময় আমাদের তালাকের ইখতিয়ার প্রদান করেন। তখন আমরা তাঁর নির্দেশ পালন করি এবং তালাকের ইখতিয়ার সম্পর্কে কিছু ঘটেনি। অর্থাৎ কেউ তালাক গ্রহণ করেনি, বরং নবীজীর স্ত্রী হিসাবে থাকাই পছন্দ করেছেন।” (আবু দাউদ শরীফ, ৩য় খন্ড, ২২০০ নং হাদিস, সুনানে নাসাই, ৩য় খন্ড, ৩৪৪২ নং হাদিস এবং বুখারী শরীফ, ৯ম খন্ড, ৪৮৮৪, ৪৮৮৫, ও ৪৮৮৬ নং হাদিস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)। সূরা আহযাবের ২৮–২৯নং আয়াতেও নারীর তালাক প্রদানের ক্ষমতা সর্ম্পকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। যা এই হাদিসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাংলাদেশে বিবাহ রেজিষ্ট্রেশন আইনেও নারীরা স্বামী কর্তৃক তালাক প্রদানের ক্ষমতা পান যদি সে অপশনের কথা নিকাহ নামায় উলে­খ থাকে। নিকাহনামার ১৮ নম্বর অপশনে নারীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতার ব্যাপারে উলে­খ করা আছে। এ বিষয়ে বিবাহের পূর্বে নারীকে চেক করে নিতে হবে যে, তালাক দেওয়ার ক্ষমতা তাকে দেওয়া হয়েছে কিনা অর্থাৎ অপশনটিতে টিক দেওয়া হয়েছে কিনা?

Leave a Reply

Your email address will not be published.