নাশকতায় উল্টে পড়ল ময়মনসিংহ এক্সপ্রেস

সর্বোচ্চ সতর্কতার মধ্যেও ফোনে হুমকি দিয়ে রেলপথের স্থানে স্থানে নাশকতা চালানো হচ্ছে। নাশকতাকারীদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণার ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই রবিবার দিবাগত রাত থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথের কোথাও প্যান্ডরোল ক্লিপ, কোথাও ফিশপ্লেট খুলে আবার কোথাও বা ট্রেনে পেট্রলবোমা ছুড়ে নাশকতা চালানো হয়েছে। পূর্ব ও পশ্চিম রেলে অবরোধ চলাকালে এ নিয়ে কমপক্ষে ৭০টি নাশকতার ঘটনা ঘটল। কিন্তু মামলা হয়েছে ১১টি আর গ্রেপ্তার মাত্র ২৫ জন।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে মিরসরাইয়ের আমবাড়িয়ায় রেলপথের ১২৬ ফুট অংশে ১২০টি প্যান্ডরোল ক্লিপ খুলে রাখায় রবিবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে উল্টে পড়ে ময়মনসিংহ এক্সপ্রেস ট্রেনটি। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম-সিলেট রুটে ১২ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আবার নাশকতা বেড়ে যাওয়ায় রেলপথ গেছে এমন ২০০ উপজেলায় পাহারা জোরদার করতে জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা জোরদারে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও অন্যান্য জনপ্রতিনিধিকে নিয়ে সভা ডাকা হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নির্দেশ পাঠানোর পর যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি জ্বালানি তেল বহনকারী ওয়াগন চলাচলের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা বাড়ানো হচ্ছে।
২০ দলীয় জোটের অবরোধে রেলে নাশকতা শুরু হলে তা রোধ করতে গত ১১ জানুয়ারি রেলপথ মন্ত্রণালয় ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। এ ছাড়া দুই হাজার ৮৭৭ কিলোমিটার রেলপথ পাহারায় মোতায়েন করা হয় আট হাজার ৩২৮ জন আনসার। দুই কিলোমিটার পর পর এই পাহারা বসানো হয়। পূর্ব রেলে ৫৫৭ পয়েন্টে চার হাজার ৪৯৬ জন ও পশ্চিম রেলে ৪৮৪ পয়েন্টে তিন হাজার ৮৩২ জন আনসার মোতায়েন রয়েছে।
গতকাল পর্যন্ত পূর্ব রেলেই ৪০টি নাশকতার ঘটনা ঘটে। রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এসব ঘটনায় এ পর্যন্ত ১১টি মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২৫ জনকে। তবে বেশির ভাগ নাশকতাকারী থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। নাশকতার পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত কমিটির প্রধান রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কমলকৃষ্ণ ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমরা সব সময় সতর্ক আছি।’ এর বেশি তিনি কিছু বলতে চাননি।
ট্রেন ছাড়ার আগে মোটরট্রলি চালিয়ে রেলপথ পরীক্ষা করা হচ্ছে। এসব ট্রলিতে তিন থেকে আটজন পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য থাকছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় বিজিবিও মোতায়েন করা হয়েছে। নাশকতারোধে রেলওয়ে ট্র্যাক ও সেতু এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি আছে। ট্রেন স্টেশন ছাড়ার পর থেকে পরবর্তী স্টেশনে পৌঁছানো পর্যন্ত সব দরজা ও জানালা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাতে চলাচলকারী অ্যাডভান্সড ইঞ্জিন এবং যাত্রীবাহী ট্রেনের ইঞ্জিনে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তত দুই জন করে রেলওয়ে পুলিশ ও যাত্রীবাহী কোচে গার্ডরুমে প্রয়োজনীয় রেলপুলিশ নিয়োগ করা হচ্ছে।
মিরসরাইয়ে ট্রেন লাইনচ্যুত : রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, গত রবিবার সন্ধ্যায় ময়মনসিংহ ছেড়ে যাওয়া চট্টগ্রামগামী ময়মনসিংহ এক্সপ্রেস রাত ৩টা ১০ মিনিটে লাইন ক্লিয়ার পেয়ে মিরসরাইয়ের চিনকি আস্তানা স্টেশন ছেড়ে যায়। রাত সাড়ে ৩টার দিকে ট্রেনটি আমবাড়িয়ায় পৌঁছলে হঠাৎ এটির ইঞ্জিন (নং-২৯১০) ও লাগোয়া কোচটি (নম্বর-এস-১৮১২) প্রচণ্ড ঝাঁকি খেয়ে উল্টে পড়ে। দ্বিতীয় কোচের (নম্বর এস-২০০৯) সামনের ট্রলির চার চাকা এবং পেছনের ট্রলির দুই চাকাও লাইনচ্যুত হয়। ফলে চিনকি আস্তানা-আমবাড়িয়া স্টেশনের আপ ও ডাউন লাইন বন্ধ হয়ে যায়। দুর্ঘটনায় ট্রেনের চালক ইউসুফ চৌধুরী (৫৫) ও সহকারী কামরুল হোসেন (২৫) আহত হন। তাঁদের চট্টগ্রাম রেলওয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম জানান, রাত ৩টার পর হঠাৎ বিকট শব্দ হয়। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি ট্রেনের কয়েকটি বগি পড়ে গেছে। এরপর পুলিশ ও বিজিবি এসে ভেতর থেকে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
পরে চট্টগ্রাম ও লাকসাম থেকে দুটি রিলিফ ট্রেন ঘটনাস্থলে গিয়ে দুর্ঘটনাকবলিত ইঞ্জিন ও বগি সরিয়ে একটি রেলপথ সচল করে। এ দুর্ঘটনার কারণে রবিবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টা থেকে গতকাল সোমবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত দুটি রেলপথেই ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। বিকেল ৪টার পর একটি এবং রাত ১০টার পর আরেকটি লাইন চালু হয়। দুর্ঘটনার কারণে পূর্বাঞ্চল রেলের আটটি ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়েছিল। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বাতিল হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের সুবর্ণ এক্সপ্রেস, মহানগর প্রভাতী, মহানগর গোধূলী, কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, চট্টগ্রাম-চাঁদপুর রুটে সাগরিকা এক্সপ্রেস। এসব ট্রেনের হাজার-হাজার যাত্রী চরম দুর্ভোগে পড়েন। বড়কাতিয়া নাশকতায় ঢাকা-চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম-সিলেট, চট্টগ্রাম-চাঁদপুর, চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ রুটে ১২ ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল শুরু হয়। দুর্ঘটনা তদন্তে পূর্ব রেলের বিভাগীয় পরিবহন ব্যবস্থাপক ফিরোজ ইফতেখারকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রেলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা ফিরোজ ইফতেখার কালের কণ্ঠকে বলেন, তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আমাদের বলা হয়েছে।
আমাদের মিরসরাই প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকাল ৮টা থেকে বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত উদ্ধার কাজ চলে। আমবাড়িয়া রেল স্টেশন মাস্টার আব্দুল বাতেনের বরাত দিয়ে তিনি জানান, লাইন স্বাভাবিক হওয়ার পর আপলাইন হয়ে প্রথমে চট্টগ্রাম রেল স্টেশন থেকে তূর্ণা নিশিথা এক্সপ্রেস ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনের গার্ড  এস কে সিনহা কালের কণ্ঠকে জানান, রাত সাড়ে ৩টার দিকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়ে ট্রেনটির ইঞ্জিনসহ তিনটি বগি লাইনচ্যুত হয়। ট্রেনে বগি ছিল চারটি। তার মধ্যে ইঞ্জিন বগি একটি, মালবাহী একটি ও যাত্রীবাহী দুটি।  মোট ১৫ জন যাত্রী ছিল। তাঁদের কোনো ক্ষতি হয়নি।
শ্রীপুরে ট্রেনে পেট্রলবোমা : গাজীপুর থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক শরীফ আহমেদ শামীম জানান, গতকাল বিকাল সোয়া ৫টায় গাজীপুরের শ্রীপুর রেল স্টেশনের আউটার সিগন্যাল ও হোম সিগন্যালের মধ্যে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া জামালপুর কমিউটার এক্সপ্রেসের একটি বগি লক্ষ করে পেট্রলবোমা ছোড়া হয়। তাতে চারজন যাত্রী দগ্ধ হন। এরা হলেন ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার কাদিরপুরের মো. হোসেন (৬০), ভালুকা উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের এমএলএসএস আফাজ উদ্দিন (৫০), গাজীপুরের শ্রীপুর পৌর শহরের ভাংনাহাটির চাল ব্যবসায়ী কাজিম উদ্দিন (৪৫) ও শান্তিবাগের দিনমজুর মফিজ উদ্দিন (৬০)। কয়েকজন লাফিয়ে পড়ে আহত হন। তাঁদের শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। দগ্ধ দুজনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। স্টেশনে নিয়মিত যাত্রাবিরতি শেষে যাত্রী নিয়ে ট্রেনটি জামালপুরের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে।
ফোনে হুমকি : গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় চট্টগ্রামের পাহাড়তলির প্রধান ট্রেন নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা (সিটিএনএল) শাহাবুদ্দিনকে ফোনে শুকলাল হাট এলাকায় রেললাইনে নাশকতার হুমকি দেওয়া হয়। সর্বোচ্চ সতর্কতার মধ্যেও নাশকতা বন্ধ না হওয়ায় খোদ রেলওয়ের কর্মকর্তারাও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। পূর্ব রেলের প্রধান প্রকৌশলী আহমদ হোসেন মিয়া গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, রাতে ট্রেনের গতি ৭২ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার করা হয়েছে। গতকাল দুপুর ২টায় রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পূর্ব রেলের পাঠানো প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সোমবার সকাল সোয়া ৯টায় চট্টগ্রাম পোর্ট ইয়ার্ড ও ফৌজদারহাট রেলপথের একটি অংশ থেকে এক জোড়া ফিশপ্লেট তুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। বিষয়টি জানতে পেরে সকাল ১০টার মধ্যে ফিশপ্লেট লাগানো হয়।
তারও আগে রাত ১২টা ৫ মিনিটে লাকসাম-চাঁদপুর সেকশনে মেহেরগঞ্জ-হাজীগঞ্জ অংশে মেঘনা এক্সপ্রেস আন্তনগর ট্রেনের ইঞ্জিনে পেট্রলবোমা ছোড়া হয়। এতে বগির এক পাশে আগুন ধরে যায়। অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ব্যবহার করে আগুন দ্রুত নিভিয়ে ফেলা হয়। ওই ট্রেনে পুলিশ স্কট ছিল। তার আগে গত রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আউটার সিগন্যালের কাছে সুবর্ণ এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন লক্ষ্য করে পাথর মারা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.