পিস টিভি বন্ধের সিদ্ধান্ত

গুলশান হত্যাযজ্ঞের ৯ দিনের ব্যবধানে জঙ্গিবাদ উসকে দেওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশে পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছে। গতকাল রবিবার দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা সম্পর্কিত মন্ত্রিসভা কমিটির বিশেষ বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত কার্যকরের জন্য আজ সোমবার তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রশাসনিক আদেশ জারি করা হবে। তবে আদেশ জারির আগেই গতকাল সিদ্ধান্তের পর কেবল অপারেটররা ঢাকাসহ দেশের ৭০ শতাংশ এলাকায় বিতর্কিত টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছেন। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্তের পর গতকাল বিকেলে ঢাকার পিআইবিতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, পিস টিভি বহু ক্ষেত্রে মুসলমান সমাজের কোরআন, সুন্নাহ, হাদিস, বাংলাদেশের সংবিধান, দেশজ সংস্কৃতি, রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

বাংলাদেশে সম্প্রচার বন্ধের এ সিদ্ধান্তের আগে ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সে দেশে ওই টিভির সম্প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের বিতর্কিত ইসলামী বক্তা ডা. জাকির নায়েক পরিচালিত মুম্বাইভিত্তিক ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশনের একটি প্রতিষ্ঠান এই পিস টিভি। পিস টিভির আর্থ স্টেশন সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে।

জানা গেছে, ডা. জাকিরের বিরুদ্ধে ‘জঙ্গিবাদে উৎসাহ জোগানোর’ অভিযোগে তাঁর পরিচালিত এই টিভির সম্প্রচার বন্ধের এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পিস টিভিতে বক্তাদের উসকানির ফলেই জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে বিশেষ করে তরুণরা। ঢাকার গুলশানে জঙ্গি হামলায় অংশ নেওয়া অন্তত দুজন পিস টিভির উদ্যোক্তা ডা. জাকির নায়েকের অনুসারী বলে জানা যায়। জাকির নায়েকের অনুসারী ভারতের তরুণদের আইএসে যোগ দিতে সিরিয়া যাওয়ার মতো অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন জাকির নায়েক। আজ তাঁর ভারতে ফেরার কথা রয়েছে। ভারতীয় সূত্রে জানা গেছে, ভারতে তখন তাঁর বিরুদ্ধে আসা অভিযোগগুলোর বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে পিস টিভি ও জাকির নায়েকের বক্তব্য সম্প্রচার নিষিদ্ধ রয়েছে।

তবে সেসব দেশের যুবকরাও তাঁর বক্তব্যে জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ আছে। গত বছর উসকানিমূলক কথাবার্তার অভিযোগে ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে জাকিরকে নিষিদ্ধ করা হয়। পিস টিভি নিষিদ্ধের পর জাকিরের বিষয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারও একই সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে।

অভিযুক্ত জাকির নায়েক গত শনিবার এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, ‘আমি বাংলাদেশ সরকারের লোকদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁরা আমাকে বলেছেন, বাংলাদেশের জঙ্গিদের আমি নিরীহ মানুষকে হত্যা করতে অনুপ্রাণিত করেছি—এমন অভিযোগ তাঁরাও বিশ্বাস করেন না। তাঁদের মধ্যে একজন আমার ফ্যান ছিল, সেটা আলাদা বিষয়।’

সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে দুই দফা জঙ্গি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল ঈদের ছুটি শেষে অফিস শুরুর প্রথম দিন আইনশৃঙ্খলা সম্পর্কিত মন্ত্রিসভা কমিটির বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক সূত্র জানায়, পিস টিভি ও জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদ উসকে দেওয়ার অভিযোগ তথ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। আলেম সমাজসহ বিভিন্ন মহলের কাছ থেকে এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে। পিস টিভি ও জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে আসা এসব অভিযোগ নিয়ে বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে আলোচনা হয়। জঙ্গি তৎপরতা রুখতে শেষ পর্যন্ত পিস টিভি বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়।

গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তিন ঘণ্টাব্যাপী বিশেষ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। বৈঠকে অংশ নেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ও প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি। পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক, ঢাকার পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াসহ বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তাতে অংশ নেন।

মন্ত্রিসভা কমিটির সিদ্ধান্ত হওয়ার পর বিকেলে রাজধানীর সার্কিট হাউস রোডে প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি) মিলনায়তনে বেসরকারি টেলিভিশন মালিক ও প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। বৈঠকে তথ্যমন্ত্রী বলেন, আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি বাংলাদেশে পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত দিয়েছে। এ ব্যাপারে তথ্য মন্ত্রণালয় আগামীকাল (সোমবার) পুরো বিষয় পরীক্ষা করে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেবে।

কেবল অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও ডিজি টোয়েন্টি ওয়ান সিস্টেমস লিমিটেডের চেয়ারম্যান এস এম আনোয়ার পারভেজ গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে প্রায় তিন হাজার ৩০০ কেবল অপারেটর আছেন। ডাউন লিংকের মাধ্যমে তাঁরা পিস টিভিসহ অন্যান্য টিভি সম্প্রচার করে আসছেন। শান্তি রক্ষার জন্য ও বিতর্ক ওঠায় আমার প্রতিষ্ঠান ঢাকার ৪০ শতাংশ এলাকায় পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে আগেই। মন্ত্রিসভা কমিটির সিদ্ধান্তের পর অপারেটররা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এই টিভির সম্প্রচার বন্ধ করছেন। গতকাল বিকেল পর্যন্ত প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকায় ওই টিভির সম্প্রচার বন্ধ করা হয়েছে। যদিও আমরা এখনো বন্ধ করার জন্য তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে আদেশ পাইনি। আশা করছি কাল (আজ) এই আদেশ পাব।’

তবে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে সাম্প্রতিক এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছেন, ‘সারা বিশ্বে আমার কোটি কোটি ভক্ত আছে। বাংলাদেশের অর্ধেক মানুষই আমার ভক্ত। কিন্তু আমি তাকে মানুষ খুন করতে উৎসাহ দিয়েছি—এটা বলা শয়তানি।’ এই ইসলামিক বক্তার ভাষ্য, বিশ্বে একমাত্র যুক্তরাজ্যেই তাঁকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। মালয়েশিয়ায় তাঁকে নিষিদ্ধ করার খবরও অস্বীকার করেছেন তিনি।

-Source: kalerkantha