পুরান ঢাকার সোহরাওয়ার্দী কলেজে শ্রেণিকক্ষ কম, আড়াই শ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক।

পুরান ঢাকার  সোহরাওয়ার্দী কলেজে নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ। শিক্ষার্থীদের জন্য নেই আবাসন ও পরিবহনের ব্যবস্থা। নেই খেলার জায়গা। বইয়ে ভরা পুরোনো একটি গ্রন্থাগার থাকলেও সেটি ব্যবহারের পরিবেশ ভালো নয়।

এই বেহাল চিত্র পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের। কলেজটিতে এ বছর শিক্ষার্থী ১৮ হাজার ১৯৯ জন। এঁদের পড়াতে শিক্ষকের অনুমোদিত ৭২টি পদ থাকলেও ২৫টিই শূন্য। অবশ্য সাময়িকভাবে ২৩ জন শিক্ষক সংযুক্ত (অন্য জায়গায় পদায়ন ও বেতন নেন কিন্তু এখানে ক্লাস নেন‍) আছেন। এ হিসাবে ৭০ জন শিক্ষক কর্মরত ধরা হয়। তাতেও শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত দাঁড়ায় ১: ২৬০। জাতীয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় বাদে দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত ১: ১৯।

তবে কলেজটির একজন শিক্ষক বলেন, এখানে কোনো কোনো বিষয়ে শিক্ষক আরও কম। কলেজটিতে শ্রেণিকক্ষ প্রয়োজন প্রায় ১০০টি। আছে মাত্র ২৪টি। একাধিক শিক্ষক বললেন, শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষের অভাবে শিক্ষার্থীদের ঠিকমতো পাঠদান করানো সম্ভব হয় না। এভাবে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়।

পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কের পূর্ব পাশে লক্ষ্মীবাজারে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী কলেজটি স্থাপিত হয় ১৯৪৯ সালের ১১ নভেম্বর। প্রতিষ্ঠার সময় এর নাম ছিল কায়েদ-ই-আজম কলেজ। ঢাকার নলগোলার ভাওয়ালরাজ এস্টেটের জমিতে অবস্থিত ভবনে কলেজের যাত্রা শুরু হলেও পরে লক্ষ্মীবাজারে কলেজটি স্থানান্তরিত হয়। নলগোলার আদি ভবনটিকে তখন ছাত্রাবাস করা হয়। কিন্তু সেই ছাত্রাবাসটিও এখন বেদখল হয়ে গেছে।

প্রাথমিকভাবে আইএ, আইকম ও বিকম কোর্স চালু ছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে কলেজটির নাম পরিবর্তন করে রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে নামকরণ করা হয়। ১৯৮৪ সালের ১ নভেম্বর কলেজটি সরকারীকরণ করা হয়। এখন কলেজটিতে উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক ছাড়াও ১৭টি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও ১১টি বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়ানো হয়।

পাঠ্য বিষয়ের কলেবর বাড়লেও বাড়েনি অবকাঠামো-সুবিধা। কলেজে যে ২৪টি শ্রেণিকক্ষ আছে, তা চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। এর মধ্যে ছয়টি বড় শ্রেণিকক্ষ, বাকিগুলো ছোট। কয়েকটি দিনের বেলাতেই অন্ধকার থাকে। সব বিভাগের জন্য স্বতন্ত্র শ্রেণিকক্ষ না থাকায় একাধিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা ভাগাভাগি করে শ্রেণিকক্ষ ব্যবহার করেন। শ্রেণিকক্ষের অভাবে অনেক সময় ক্লাস হয় না।

স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর পড়ানো হলেও মাত্র বাংলা, অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগে অধ্যাপকের পদ আছে। বাকি ১৩টি বিভাগে অধ্যাপকের পদই নেই। দর্শন বিভাগে সর্বোচ্চ পদ সহকারী অধ্যাপক। অথচ এটি একটি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কয়েকজন শিক্ষক বললেন, শিক্ষার্থী বেড়েছে, নতুন নতুন বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর চালু করা হয়েছে, কিন্তু বাড়েনি শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ। ফলে সমস্যাও বাড়ছে। এনাম কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী যেসব বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়ানো হয়, সেগুলোতে কমপক্ষে ১২ জন শিক্ষক থাকার প্রয়োজন। কিন্তু তা তো হয়নি, উল্টো এই কলেজে অনুমোদিত পদের তিন ভাগের এক ভাগ শূন্য।

শিক্ষকের অভাবটা টের পাওয়া গেল ইংরেজি বিভাগে গিয়ে। একজন শিক্ষক জানালেন, উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক (সম্মান), স্নাতক (পাস) কোর্সে সব মিলিয়ে তিন হাজারের বেশি শিক্ষার্থী আছে। এসব শিক্ষার্থীর ইংরেজি পড়ানোর জন্য একজন সংযুক্তসহ মোট শিক্ষক মাত্র চারজন। পাঁচটি পদ থাকলেও সংযুক্তি বাদে দুটিই শূন্য। এই শিক্ষক দৈনন্দিন ক্লাসের হিসাব দিতে গিয়ে বলেন, উচ্চমাধ্যমিক থেকে স্নাতক পর্যন্ত প্রায় গড়ে ২২টি ক্লাস থাকে। ফলে চারজন শিক্ষকের একেকজনের ভাগে প্রতিদিন গড়ে চার-পাঁচটি ক্লাস পড়ে।

ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. এবাদুল হক ভূঁঞা প্রথম আলোকে বলেন, প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় তাঁদের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে। ঠিকমতো ক্লাস নেওয়াই কঠিন।

ইংরেজি ও বাংলা বিভাগের ক্লাসের জন্য ইংরেজি বিভাগের পাশে একটি ছোট কক্ষ বরাদ্দ। সেখানে ১৭টি বেঞ্চ নিয়ে শ্রেণিকক্ষ সাজানো। বিভাগের একজন শিক্ষক বললেন, প্রতিটি বেঞ্চে তিনজন করে বসালেও ৫১ জনকে পড়ানোর মতো ব্যবস্থা আছে। ভাগ্যিস, সব শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে না।

ছোট পরিসরে পুরোনো তিনতলা ভবন ছাড়াও কলেজে পাঁচতলা ও তিনতলার আরও দুটি ছোট ভবন আছে। মূল ভবনের কিছু কক্ষের ওপর থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে থাকেন। কলেজটিতে শিক্ষার্থীদের খেলার জায়গাও নেই। এইচএসসি পরীক্ষার্থী রাইসুল ইসলাম বললেন, খেলার জায়গা নেই, খুব খারাপ লাগে। ক্লাসের সময় অনেক শিক্ষার্থী উপস্থিত হলে খুবই সমস্যা হয়।

পুরোনো ভবনের নিচতলায় একটি গ্রন্থাগার রয়েছে। কিন্তু পড়ার পরিবেশ ভালো নয়। অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে থাকে। নিচতলা ছাত্র সংসদ ভবনটি এখন ক্ষমতাসীন দলের ভাতৃপ্রতিম ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ব্যবহার করেন। এখন একচেটিয়া ছাত্রলীগের দাপট কলেজে। নিচতলার অন্য কক্ষগুলোও ছোট ছোট, কয়েকটি কক্ষ ঘিঞ্জি। দোতলায় কয়েকটি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, সেমিনার কক্ষ ও শিক্ষকদের কক্ষ একাকার। অথচ যেসব কলেজে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়ানো হয়, সেগুলোতে আলাদা সেমিনার কক্ষ থাকার কথা।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জানালেন, ছাত্রাবাস না থাকায় দূরের শিক্ষার্থীদের মেস করে থাকতে হয়। মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, ডেমরাসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। কিন্তু কোনো পরিবহন নেই।

কলেজের অধ্যক্ষ শেখ আবদুল কুদ্দুস প্রথম আলোকে বলেন, শ্রেণিকক্ষের অভাবসহ অবকাঠামোর সমস্যায় তাঁদের প্রতিনিয়ত সমস্যায় পড়তে হয়। এ জন্য সরকারের কাছে তাঁদের দাবি, যেন বর্তমান ভবনগুলো ভেঙে বহুতল ভবন করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি উচ্চমাধ্যমিক কিংবা অনার্সের জন্য পার্শ্ববর্তী কোনো স্থানে আলাদা ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।