বেশি দামে চামড়া কিনে বিপাকে ব্যবসায়ীরা-প্রক্রিয়াজাত করতে না পারায় নদীতে ফেলে দেয়া হচ্ছে চামড়া!

ট্যানারি মালিক ও বড় ব্যবসায়ীরা এবার ঈদের আগে থেকে সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়ায় স্থানীয় ও মওসুমি ব্যবসায়ীরা পড়েছেন বিপাকে। তদুপরি, লবণের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এ বছর  এ ব্যবসায়  ধস নামিয়েছে বলা যায়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্বাভাবিক বাজার দরের চেয়ে প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম অনেক কম নির্ধারণ করাই এ মূল্য ধসের প্রধান কারণ। এ দিকে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও লবণের দাম বৃদ্ধির কারণে সংরক্ষণ করতে না পারায় চামড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মৌলভীবাজারের কোনো কোনো ব্যবসায়ীকে মনু নদীতে চামড়া ভাসিয়ে দিতে দেখা গেছে।
চট্টগ্রাম ব্যুরোর নূরুল মোস্তফা কাজী জানান, চট্টগ্রামে পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি হয়েছে নামমাত্র মূল্যে। ফলে এক দিকে কোরবানির পশুর চামড়ার টাকার জন্য দীর্ঘ অপোয় থাকা দরিদ্র জনগোষ্ঠী যেমনি বঞ্চিত হয়েছেন, তেমনি লাভের আশায় চামড়া কিনে বিপাকে পড়েছেন বিপুলসংখ্যক মওসুমি ব্যবসায়ী ও ফড়িয়া। একশ্রেণীর চামড়া ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের চামড়া ক্রয়ে গো স্লো (ধীরে চলো) নীতির কারণে এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নগদ টাকায় চামড়া কিনে তা বিক্রি করতে না পেরে ব্যাপক তির মুখে পড়েছেন মওসুমি ব্যবসায়ীরা। অনেকে আবার অর্ধেক দামেও চামড়া বিক্রি করার কথা জানিয়েছেন।
চামড়া ব্যবসায়ীদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, এ বছর চট্টগ্রামে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করার ল্য নির্ধারণ করেন স্থানীয় আড়তদাররা। ইতোমধ্যে সাড়ে তিন লাখ চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে এবং বাকি দুই লাখ প্রত্যন্ত অঞ্চলে লবণ দিয়ে সংরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যবসায়ীরা জানান, সরকার চামড়ার যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে এর চেয়ে বেশি ইতোমধ্যে ব্যয় হয়ে গেছে। তাই যথাযথ মূল্যপ্রাপ্তি নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন আড়তদাররা।
অন্য দিকে মওসুমি ব্যবসায়ীরা লাভের আশায় চামড়া কিনে মাথায় হাত দিয়েছেন। গেল বছর সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে চামড়া বিক্রি করতে পেরেছিলেন এসব মওসুমি ব্যবসায়ী। কিন্তু এবার সঙ্ঘবদ্ধভাবে চামড়া চক্র সংগৃহীত চামড়া ক্রয়ে গো স্লোনীতি অবলম্বন করছেন। ফলে অনেক মওসুমি ব্যবসায়ীকে মাথায় হাত দিতে হয়েছে এমন তথ্য মিলেছে। কক্সবাজার থেকে সংগ্রহ করা চামড়া নিয়ে আসা হোসেন এ প্রতিবেদককে জানান, ৫০০-৬০০ টাকা দরে চামড়া কিনে এনে ৩০০ টাকায়ও বিক্রি করা যাচ্ছে না।
ব্যবসায়ীরা জানান, চট্টগ্রামের সর্বশেষ চালু থাকা দু’টি ট্যানারিও পরিবেশ অধিদফতর কর্তৃক বন্ধ করে দেয়ায় সবচেয়ে বেকায়দায় পড়েছেন চট্টগ্রামের চামড়া ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কোরবানির পশুর চামড়া উৎকৃষ্টমানের। কোরবানির এক সপ্তাহ আগেও অপোকৃত নিম্নমানের চামড়া বিক্রি হয়েছে প্রতি বর্গফুট ৫৫ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু কোরবানির পশুর উৎকৃষ্ট চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি বর্গফুট ৪০ টাকা দরে (ঢাকার বাইরে)। এর ওপর লবণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কোনোভাবেই নির্ধারিত মূল্য যৌক্তিক নয় বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।
এ দিকে একাধিক কোরবানিদাতার সাথে আলাপ করে জানা গেছেÑ কোরবানির পশুর চামড়ার বিক্রীত টাকা কোরবানিদাতার ব্যবহারের সুযোগ নেই এবং তা গরিবদের মাঝে বণ্টনের শরয়ি বিধান রয়েছে। তাই প্রতি বছর বিপুল দরিদ্র জনগোষ্ঠী কোরবানিদাতাদের কাছে চামড়ার টাকার জন্য হাজির হন। কিন্তু এ বছর তারা হতাশ। এক কোরবানিদাতা আপে করে বলেন, দুপুর পর্যন্ত চামড়া কেনার জন্য কেউ আসেও নাই। ফলে গত বছর দু’টি গরুর চামড়া আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি করলেও এ বছর একই মানের চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে ১১শ’ টাকায়। তিনি জানান, এতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে তিগ্রস্ত না হলেও বঞ্চিত হলেন চামড়ার টাকার হকদাররা। সরকারিভাবে চামড়ার মূল্য কম নির্ধারণের কারণেই এমন পরিস্থিতি হয়েছে বলেও তার দাবি।
চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাবেক সভাপতি মুসলিম উদ্দিন নয়া দিগন্তকে জানান, চট্টগ্রামে সর্বশেষ চালু থাকা মদিনা ট্যানারি ও রিফ রেদার ট্যানারি দু’টি বন্ধ করে দেয়ায় আমরা মহা বেকায়দায় পড়েছি। এই দু’টি ট্যানারি নগদ টাকায় চট্টগ্রামের ৭০ শতাংশ চামড়া কিনে নিত। পাশাপাশি পরিশ্রম ও ব্যয় কম ছিল।
তিনি জানান, বাধ্য হয়ে আড়তদাররা ঢাকার ট্যানারির কাছে চামড়া বিক্রি করতে গিয়ে অর্ধেক টাকাই বাকি থাকে। তা ছাড়া সময় ও শ্রমের প্রশ্ন তো আছেই। তিনি জানান, ইতোমধ্যে সাড়ে তিন লাখ কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু এখনো চামড়া বিক্রি শুরু হয়নি। এসব চামড়া সংগ্রহে প্রতি বর্গফুটে প্রায় ৬০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে জানিয়ে তিনি প্রকৃত মূল্য পাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি সরকার নির্ধারিত মূল্য সংশোধনেরও দাবি জানিয়েছেন।
পটিয়া চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম) থেকে এস এম রহমান জানান, কোরবানির চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়েছেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা। লবণযুক্ত চামড়ার মূল্য কম নির্ধারণ, চট্টগ্রামের ট্যানারি বন্ধ ও লবণের মূল্য বেশি হওয়া এবং নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে চামড়া কেনায় চামড়ার মজুদ নিয়ে সংশয়ে রয়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রামর কয়েক শত চামড়া ব্যবসায়ী। গতকাল ১৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে পর্যন্ত চট্টগ্রামের কাঁচা চামড়া আড়তদাররা মজুদ চামড়া ক্রয়ের আগ্রহ প্রকাশ না করায় তারা এবার লাখ লাখ টাকা লোকশানের আশঙ্কা করছেন। গত দুই তিন বছর ব্যবসায়ীরা আড়তদারদের বাকিতে চামড়া বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা পাওনা রয়েছেন। তাই এবার চামড়া বিক্রি নিয়ে এক রকম দুঃশ্চিন্তায় রয়েছে।
চন্দনাইশ হাশিমপুর বড়পাড়ার চামড়া ব্যবসায়ী হাজী মোহাম্মদ বেদার আলী বলেন, কোরবানির দিন তিনি এক হাজার চামড়া সংগ্রহ করেছেন। প্রতিটি চামড়া ৬-৭ ও ৮ শ’ টাকায় কিনেছেন। লবণ ও আনুষঙ্গিক খরচসহ প্রতিটি চামড়া এক হাজার টাকা পড়েছে। তিনি বলেন, টেনারি মালিকেরা এবার রাজধানী ঢাকায় প্রতি ঘনফুট চামড়া ৫০ টাকা ঢাকার বাইরে ৪০ টাকা নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু ওই দরে চামড়া কেনা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, গত দুই বছর চট্টগ্রামের আড়তদারদের কাছে চামড়া বিক্রি করে এখনো টাকা পায়নি। তিনি বর্তমানে ১৫-২০ লাখ টাকা পাওনা রয়েছেন। তিনি বলেন, দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়া চন্দনাইশ, আনোয়ারা, বাঁশখালি, সাতাকানিয়া, লোহাগাড়া ও কক্সবাজারের চকরিয়ার কয়েক শ’ চামড়ার ব্যবসায়ী অন্তত ৩০-৩৫ হাজার কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করেছে। সবাই চামড়া নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। একই এলাকার মোহাম্মদ মিয়া এক হাজার মনির আহমদ এক হাজার কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে বিপাকে রয়েছেন।
রাজশাহী ব্যুরো থেকে মুহাম্মদ আব্দুল আউয়াল জানান, রাজশাহী অঞ্চলে বেশি দামে কোরবানির পশুর চামড়া কিনে বিপাকে পড়েছেন মওসুমি ব্যবসায়ীরা। আড়তগুলো সরকার নির্ধারিত দামের বাইরে যাচ্ছে না। ফলে বেশি ঝুঁকি এড়াতে ও পচনের ভয়ে লোকসান দিয়ে আড়তে চামড়া দিতে বাধ্য হচ্ছেন মওসুমি ব্যবসায়ীরা। তাদের লাভ দূরে থাক, লগ্নিকৃত পুঁজিতেই টান পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার ব্যাংক ঋণ নেই এবং স্থানান্তরের অজুহাতে ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে গত বছরের বকেয়া টাকা পাননি স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ীরা। ফলে এলাকায় গিয়ে সেভাবে চামড়া কিনতে পারেননি তারা। ফাঁকা মাঠে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন মওসুমি ব্যবসায়ীরা। আগে থেকে দাম নির্ধারিত হলেও বেশি দামে চামড়া কিনে এখন বিপাকে পড়েছেন তারা।
রাজশাহী নগরীর এক মওসুমি চামড়া ব্যবসায়ী জানান, তিনি ঋণ করে আরো কয়েজনকে সাথে নিয়ে চামড়া কিনতে মাঠে নামেন। কিন্তু চামড়া কেনার পর এখন আড়তে গিয়ে আর সেই দাম পাচ্ছেন না। তারা সর্বোচ্চ এক হাজার ৫ শ’ টাকা থেকে এক হাজার ৭ শ’ টাকা পর্যন্ত দরে চামড়া কিনেছেন। কিন্তু আড়ত মালিকেরা সেসব চামড়া ৯ শ’ টাকা থেকে এক হাজার টাকা বলছেন। আর লবণযুক্ত চামড়া এক হাজার ১ শ’ টাকার বেশি দাম দিতে চাচ্ছেন না। ফলে লাভ তো দূরের কথা, কিভাবে পুঁজির টাকা ফিরে পেয়ে ঋণ পরিশোধ করবেন তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছি।
মওসুমি ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পাড়া-মহল্লা থেকে প্রায় ৮০ শতাংশ চামড়াই কিনে নিয়েছেন। কিন্তু ওই চামড়ার একটি বড় অংশ এখনো তাদের হাতেই রয়েছে। তাই লোকসানের ভয়ে বেশি দাম চাওয়ায় তাদের কাছ থেকে চামড়া কিনছে না আড়তগুলো। ফলে তারা চামড়া নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন।
রাজশাহী চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির একটি সূত্র জানায়, প্রতি বছর ঈদে ৮০ থেকে ৯০ হাজার গরু-মহিষ ও প্রায় দেড় লাখ খাসি-ভেড়া কোরবানি হয়ে থাকে রাজশাহী জেলায়। বিপুল এই চামড়া তারা কিনে লবণ দিয়ে কয়েক দিন সংরণের পর নাটোরের আড়তগুলোতে নিয়ে যান। ঢাকার ট্যানারি মালিকেরা সেখান থেকে চামড়া কিনে নিয়ে যান।
 তানোর (রাজশাহী) থেকে লুৎফর রহমান জানান, রাজশাহীর তানোরে কোরবানির চমড়া কিনে মওসুমি ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন। কোরবানি ঈদে প্রত্যেক বছর পাড়া মহল্লায় গিয়ে এলাকার কিছু মওসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনে থাকেন। এবারই তারা লাভের আশায় চমড়া কিনে বিক্রয় করতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন। ফলে তারা মূল পুঁজি হারিয়ে লোকশানে পড়তে বসেছেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, এবার উপজেলায় গরু চার হাজার ৫ শ’, ছাগল সাত হাজার, ভেড়া এক হাজার কোরবানি হয়েছে। আর গরুর চামড়া ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা, ছাগলের চামড়া ৮০-১০০ টাকা ও ভেড়া ৫০ টাকা দরে বিক্রয় হয়েছে।
ইলামদহী বাজারের মওসুমি ব্যবসায়ী আজিজুল হক জানান, চামড়া কিনে বিক্রয় করতে না পেরে লবণ দিয়ে গুদামে রেখে দিয়েছি। গত বছর ঈদের দিনে কিনে তার পরের দিন বিক্রয় করে দিয়েছিলাম। কিন্তু এ বছর কোনো বড় ব্যবসায়ী না আশার ফলে বিক্রয় করতে পারছি না। এক থেকে দুই দিনের মধ্যে বিক্রয় করতে না পারলে মূল পুঁজিও হারিয়ে যাবে বলে জানান তিনি।
ঘিওর (মানিকগঞ্জ) আব্দুর রাজ্জাক জানান, লবণের বাজারের অস্থিরতার ঢেউ লেগেছে কাঁচা চামড়ার বাজারে। সবচেয়ে কম দামে চামড়া কিনেও লোকসানের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না মওসুমি ব্যবসায়ীরা। শুধু তাই নয়, চামড়া কিনে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন ঘিওর উপজেলাসহ জেলার পাইকারি চামড়া ব্যবসায়ীরা। তারা যে দামে চামড়া কিনেছেন, ট্যানারির মালিক ও আড়তদাররা তার চেয়েও কমদামে কিনতে চাইছেন। এ কারণে বেশির ভাগ চামড়া এখনো ঢাকার বাইরেই রয়ে গেছে। এ অবস্থায় বিপুল চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এবার ফড়িয়াদের অনেকেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে চামড়া সংগ্রহ করেছেন। পরে প্রতিযোগিতামূলক বাজারের কারণে অনেক পাইকারি ব্যবসায়ী বেশি দাম দিয়ে ফড়িয়াদের কাছ থেকে চামড়া কিনেছেন। এরপর লবণ এবং শ্রমিক মজুরি মিলে আরো আট টাকা বর্গফুটে খরচ করতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাই পূর্বনির্ধারিত প্রতি বর্গফুটের দাম ৪৫ টাকারও বেশি পড়েছে। কিন্তু পাইকারি ব্যবসায়ীরা কমমূল্যে চামড়ার দাম হাঁকালে মাথায় হাত পড়ে এসব মওসুমি চামড়া ব্যবসায়ীর। মজুদের ব্যবস্থা না থাকায় তারা সারা রাত জেগে থেকে ভোর রাতে ও সকালে গরুর চামড়া প্রতি ২০০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা ও ছাগলের চামড়া প্রতি ৩০ টাকা থেকে ৪০ টাকা লোকসানে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। এতে জেলার দুই শতাধিক মওসুমি চামড়া ব্যবসায়ীর মোটা অঙ্কের লোকসান গোনতে হচ্ছে।
বগুড়া অফিস থেকে আবুল কালাম আজাদ জানান, বগুড়ায় পানির দামে বিক্রি হয়েছে কোরবানি পশুর চামড়া। গত ১০ বছরের মধ্যে এবার চামড়ার দাম ছিল সবচেয়ে কম। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও ট্যানারি মালিকদের বেঁধে দেয়া দামের কারণে বাজারে চামড়া কেনাবেচা হয়েছে খুবই কম দামে। তবে নির্ধারিত দামের চেয়ে পাড়া মহল্লার যুবকরা বেশি দামে কিনে বিপাকে পড়েছেন। সেই সাথে তারা লাভের বদলে লোকশান গোনছেন।
জানা গেছে, বগুড়া জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য সংখ্যা ২৪৭ জন। এ ছাড়া রয়েছেন কয়েক হাজার যুবক, যারা কোরবানির দিন চামড়া কেনাবেচা করেন। তাই প্রতি বছর চামড়া ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি মওসুমি ফড়িয়া ও ুদ্র ববসায়ীরা চামড়া কিনে থাকেন। জেলা থেকে প্রতি বছর কোরবানির প্রায় দুই লাখ গরু এবং এক লাখ ছাগলের চামড়া ঢাকার ট্যানাারগুলোতে সরবরাহ করা হতো। লাভের আশায় ধারদেনা করে এবারো কোরবানির চামড়া কেনেন ব্যবসায়ীরা। এ বছর ঈদের আগে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করে দেয় ট্যানারি মালিকসহ চামড়া শিল্পের সাথে জড়িত সংগঠনগুলো। সেই বেঁধে দেয়া দামে সকাল থেকেই বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় এবং গ্রামাঞ্চলে কমদামে চামড়া বেচাকেনা করেন ব্যবসায়ীরা। গ্রামাঞ্চলে ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা যেভাবে কমদামে চামড়া কিনেছে, শহর পর্যায়ে তার চেয়ে আরো কম দামে চামড়া কেনাবেচা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে চামড়া কেনার পর অনেকেই শহরের বাজারে সেই চামড়া বেচতে এসে বিপাকে পড়েন। এ দোকান, সে দোকান ঘুরে লোকসান গুনে বাড়ি ফিরতে হয় তাদের।
বগুড়ায় চামড়ার বাজারখ্যাত বাদুড়তলা, চকসূত্রাপুর ও চকজাদু রোড ঘুরে দেখা গেছে, বড় আকৃতির গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ এক থেকে দেড় হাজার টাকায়। এ ছাড়া ছাগলের চামড়া আকৃতি ভেদে প্রতিটি ৫০ থেকে ৭০ টাকায় কেনাবেচা হয়েছে। এতে চামড়ার টাকার হকদার গরিব, মিসকিন, এতিমখানা, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ হতাশায় পড়েছেন। তাই এবার চামড়ার খাত থেকে দান সংগ্রহ হবে খুবই কম। কারণ চামড়ার টাকা দিয়ে বছরের বেশির ভাগ খরচ মেটাতে হয় তাদের। তাই তারা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
এ দিকে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ট্যানারি মালিক ও বড় ব্যবসায়ীরা এবার ঈদের আগে সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে। স্বাভাবিক বাজার দরের চেয়ে প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম অনেক কম নির্ধারণ করাই মূল্য ধসের প্রধান কারণ। জেলা চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতি বাজার ধসের জন্য ঢাকায় ট্যানারি স্থানান্তর ও ঈদের আগে চলতি বাজার দরের চেয়ে অনেক কম দর নির্ধারণ করে দেয়াকে দায়ি করেছেন।
বগুড়া জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মো: শোকরানা জানান, ঢাকায় ট্যানারি স্থানান্তর, জেলা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের টাকা ট্যানারি মালিকদের আটকে রাখা এবং সিন্ডিকেট করে লবণের দাম বাড়ানোই এবার চামড়ার বাজার ধসের কারণ। এসব কারণে তিনি নিজেও এবার চামড়া কেনেনি বলে জানান।
মৌলভীবাজার থেকে আব্দুল আজিজ জানান, মৌলভীবাজারের স্থানীয় আড়তদাররা চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। মনের দুখে কোরবানির পশুর চামড়া নদীতে ভাসিয়ে দিচ্ছেন। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচ বৃদ্ধি ও লবণের দাম অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণে এমনটাই হয়েছে। স্থানীয় আড়তদারদের অভিযোগ দেশীয় একটি চক্র সিন্ডিকেট করে চামড়া শিল্পে ধস নামায়। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা চামড়া পাচার করে। যে কারণে প্রতি বছর লোকশান গোনছেন স্থানীয় আড়তদারা। এক দিকে প্রক্রিয়াজাত করার খরচ বেড়েছে, অন্য দিকে বর্গফুটপ্রতি চামড়ার দর কম নির্ধারণ করায় স্থানীয়  ব্যবসায়ীরা এবার বড় ধরনের লোকসানে রয়েছেন।
জানা গেছে, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বালিকান্দি গ্রামে ২০০ বছর আগে গড়ে উঠেছে কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ আড়ত। বালিকান্দি গ্রামের ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগকৃত টাকা ট্যানারি মালিকরা আটকে রাখার কারণে অনেকে পুঁজির অভাবে বড় ধরনের লোকশান নিয়ে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। মওসুমি ব্যবসায়ীরা পানির দামে চামড়া ক্রয় করে আড়তদারদের কাছে প্রতি বর্গফুট ২০ থেকে ২৮ টাকা বিক্রি করেছে। কিন্তু প্রক্রিয়াজাতকরণ ও লবণের দাম বৃদ্ধির কারণে চামড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কোনো কোনো ব্যবসায়ীকে গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মনু নদীতে চামড়া ভাসিয়ে দিতে দেখা গেছে।
ট্যানারি মালিকেরা বছরের পর বছর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগকৃত টাকা আটকে রাখার কারণে পুঁজির অভাবে মৌলভীবাজারের চামড়া ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মধ্যে রয়েছেন। তারা চাহিদা মতো চামড়া সংগ্রহ করতে পারেননি। এ সুযোগে কোটি টাকার চামড়া পাচার হয়েছে বলে ব্যাবসায়ীদের অভিযোগ।
সম্প্রতি চামড়া ব্যবসায়ীদের তিন সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ হাইড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশন চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দর নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ টাকা।
একটি বড় গরুর েেত্র ২৫ থেকে ৩৫ বর্গফুট পর্যন্ত চামড়া হয় বলে চামড়ার আড়তদাররা জানান। মঙ্গলবার কোরবানির পর মওসুমি ব্যবসায়ীরা গড়ে বড় চামড়া কিনেছেন ১০০ থেকে ৪০০ টাকায়। এর ফলে যদি একটি চামড়া ৩০ বর্গফুট হয়, সে েেত্র কাঁচা চামড়ার দাম পড়বে বর্গফুটপ্রতি ৪০ টাকার কাছাকাছি। এরপর লবণ ও মজুরি মিলিয়ে প্রতিটি চামড়ার েেত্র আরো ৮-১০ টাকা খরচ রয়েছে বলে আড়তদাররা জানান। প্রতি বস্তা (৭৪ কেজি) লবণ এবার বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায়। গত বছর প্রতি বস্তা লবণের দাম ছিল ৫০০ টাকা।
জানতে চাইলে কাঁচা চামড়ার আড়তদার ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচ বৃদ্ধি ও ভারতের নিম্নমানে লবণ দ্বিগুণ দামে ক্রয় করে এখন বিপাকে পড়েছি। ভারতীয় লবণ দিয়ে ভালো কাজ হচ্ছে না। প্রক্রিয়াজাতকরণ না করতে পেরে অনেক চামড়া পাশের মনু নদীতে ফেলে দিয়েছি। একটি সিন্ডিকেট সুকৌশলে চামড়ায় ধস নামিয়ে চামড়া পাচার করছে বলে মনে হচ্ছে।
মৌলভীবাজারের কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী মোর্শেদ আহমদ লেদার হাউজের স্বত্বাধিকারী মো: হাবিব মিয়া বলেন, চামড়া প্রক্রিজাতকরণ খরচ বৃদ্ধি ও লবণের দাম বেশি এবং ট্যানারি মালিকদের দৌরাত্ম্যের কারণে লোকশান গুনে গুনে ব্যবসায় ছেড়ে দিয়েছি। এ ধরনের সমস্যা সমাধান না হলে দেশের চামড়া শিল্প ধ্বংস হবে।
মৌলভীবাজার জেলা শহরের বাইরের সিরাজ মিয়া নামে এক মওসুমি চামড়া ব্যবসায়ী বলেন, এবার আমার ছোট-বড় চামড়া সংগ্রহ করতে গড়ে ৩০০-৩৫০ টাকা করে খরচ পড়েছে। কিন্তু যদি আড়তদাররা সেগুলো বর্গফুট প্রতি ২০ টাকা কম দেয় তাহলে লোকসানে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অকিল মিয়া বলেন, পানির দামে চামড়া ক্রয় করেও লাভবান হতে পারব না।
শওকত লেদার এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শওকত মিয়া জানান, পরিকল্পিতভাবে চামড়া সস্তা করে দেয়া, প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচ বৃদ্ধি, লবণের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি ট্যানারি মালিকরা আমাদের বিনিয়োগকৃত টাকা মওসুমি চামড়া সংগ্রহে ছাড় না দিলে চামড়া শিল্পে বড় ধরনের ধস নামবে। সমস্যা চিহ্নিত করে আমাদের চামড়া শিল্পকে রক্ষার জন্য সরকারকে এগিয়ে আসার দাবি জানিয়েছেন এলাকার বাছিত মিয়া, আলমগীর মিয়া। এ দিকে চামড়া পাচার হওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা পুলিশ সুপার মো: শাহজালাল জানান, চামড়া পাচার রোধ করার জন্য বিজিবির সহযোগিতা নিয়ে সীমান্ত এলাকায় চেক পোস্ট বসানো হয়েছে।
চাটমোহর (পাবনা) থেকে মো: ইকবাল কবীর জানান, চাটমোহরে কোরবানিকৃত পশুর চামড়া প্রায় পানির দামে বিক্রি হয়েছে। গত বছর এ সময় চামড়া ব্যবসায়ীরা ব্যাপক লোকসানের সম্মুখীন হওয়ায় এবং এ বছর চামড়ার বাজার ভালো না থাকায় তারা চামড়া কিনতে আগ্রহ দেখাননি। ফলে যারা পশু কোরবানি করেছেন তারা স্বল্পমূল্যে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। একটা মাঝারি আকারের গরুর চামড়া এক হাজার টাকায় এবং খাশির চামড়া ৫০-৬০ টাকায়ও বিক্রি হতে দেখা গেছে। যেসব ব্যবসায়ী চামড়া লবণজাত করছেন তারা কমমূল্যে চামড়া কিনতে পারলেও লাভ করতে পারবেন কি না তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন।
উপজেলার ছাইকোলা হাফিজিয়া এতিমখানায় এলাকাবাসী ৩৩৭ পিস খাসির চামড়া, ২৪ পিস গরুর চামড়া দান করেছিলেন। মঙ্গলবার রাত ১০টায় হাফিজিয়া এতিমখানার সদস্য আবু তালেব নাটোরের আড়তে ২৪ পিস গরুর কাঁচা চামড়া ২৮ হাজার ৮ শ’ টাকায় বিক্রি করেন। প্রতি পিস চামড়ার দাম পান এক হাজার ২০০ টাকা। ৩৩৭ পিস খাসির চামড়া বিক্রি করেন ১৮ হাজার টাকা। প্রতি পিস চামড়া ৫৩ টাকায় বিক্রি করেন তিনি।
দোলং গ্রামের রবিউল করিম জানান, চাহিদা কম থাকায় ৭০ হাজার টাকা মূল্যের ১৮০ কেজি ওজনের কালো রঙের একটি গরুর চামড়া এক হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন তিনি। পৌর সদরের বালুচর এলাকার আবুল হোসেন জানান, দুইটি খাসির চামড়া বিক্রি করে তিনি পেয়েছেন ১৬০ টাকা। বিন্যাবাড়ি গ্রামের আকতার হোসেন জানান, বড় আকারের একটি গরুর চামড়া এক হাজার ৬ শ’ টাকায় বিক্রি করেছেন তিনি।
চান্দিনা (কুমিল্লা) থেকে রনবীর ঘোষ কিংকর জানান, চামড়ার দরপতনে লোকসানের মুখে পড়েছে কুমিল্লার মওসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা। আর মূল্যবৃদ্ধির আশায় পর্যাপ্ত চামড়া সংগ্রহ করে এখন লবণ মাখায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে আড়তদারা।
পশু কোরবানির ৮-১০ ঘণ্টার মধ্যে সংরক্ষিত চামড়ায় লবণ মাখার নিয়ম থাকলেও কোরবানির ৩৬ ঘণ্টায়ও তা সম্পন্ন করতে পারছে না কুমিল্লার আড়তদাররা।
কুমিল্লায় চামড়া সংরক্ষণে সরকারি কোনো ঠিকানা নেই। নেই কোনো সংগঠন। তাই আড়তদাররা যারযার সুবিধামতো চামড়া সংরক্ষণ করছেন। তবে তারা ট্যানারির বেঁধে দেয়া দামের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ মূল্যে চামড়া সংগ্রহ করায় এবং লবণের মাত্রাতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধিতে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
 জেলার সবচেয়ে বেশি চামড়া সংগ্রহকারী আড়তদার রয়েছে চান্দিনা ও দাউদকান্দি উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা সব্দলপুর-ইলিয়টগঞ্জে। ওই এলাকায় অন্তত ডজনখানেক আড়তদারকে চামড়া সংরক্ষণে ব্যস্ত সময় কাটাতে দেখা গেছে।
বুধবার বিকেলে দেখা গেছে তিন শতাধিক শ্রমিক চামড়া সংরক্ষণে ব্যস্ত। কেউ চামড়া থেকে মাংস ছাড়াচ্ছেন, কেউ বা উচ্ছিষ্ট অংশ কাটছেন আবার কেউবা লবণ মাখায় ব্যস্ত।