মঙ্গলতরীতে ১২

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবট মঙ্গলতরী আজ ব্রিটেনে যাচ্ছে। সেখানে সে একটি আন্তর্জাতিক রোবট প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে।

সাইফুর রহমান, ফাহিম শাহরিয়ার, শাকিলুজ্জামান, আলী আহসান, ইনতিসার হাসনাইন, জহিরুল ইসলাম, নিয়াজ শরীফ, ড. খলিলুর রহমান, মনির হোসেন, মাসনূর রহমান, আবীর মোহাম্মদ ও কামরুজ্জামান সবাই মিলে একটি ছবি দেখেছিলেন। সেটির নাম হলো ‘স্পেয়ার পার্টস’। এই ছবি দেখার পরই মনে হলো—একটি রোবট বানাব আমরা। এরপর এই বিষয়ে কথা বলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবট ক্লাবের এক বড় ভাইয়ের কাছে গেলেন। জানতে চাইলেন, কিভাবে একটি রোবট বানানো যাবে? তিনি বললেন, ‘টাকাপয়সাসহ আরো ব্যাপার আছে। সে জন্য রোবট বানানোর আগে তোমরা স্যারের সঙ্গে কথা বলো।’ এরপর সবাই মিলে গেলেন সিএসসি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. খলিলুর রহমানের কাছে। শুরুতে তিনিও রাজি হতে চাইলেন না। তারপর তাঁকে ছবিটি দেখানো হলো।

ক্লাস ফাইভের একদল ছেলেমেয়ে ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েদের একটি রোবটের প্রতিযোগিতায় হারিয়ে দেয়। ছবিটি দেখে তিনি বললেন, ‘রোবট নিয়ে খোঁজখবর নাও। আগে জানো কোথায় কী হচ্ছে?’ এভাবেই গেল বছরের জুনে শুরু ‘ব্র্যাকইউ অ্যাভেঞ্জার’।

শুরুতে ছিলেন পাঁচজন, সবাই সিএসসির ছাত্র। কাজ ভাগ করে নিলেন তাঁরা—বৈজ্ঞানিক কাজ ও কারিগরিতে আলী আহসান, ইলেকট্রনিকসে মাসনূর রহমান, কন্ট্রোলে জহিরুল ইসলাম, যোগাযোগে সৈয়দ মোহাম্মদ কামরুজ্জামান। দলনেতা নিয়াজ শরীফ নিজেও কাজ করবেন যোগাযোগে।

আবার খলিল স্যারের সঙ্গে আলাপে বসল ব্র্যাকইউ অ্যাভেঞ্জার। স্যার কাজ শুরু করে দিতে বললেন। এবার আরো সদস্য যুক্ত হলেন দলে—সাইফুর রহমান, ফাহিম শাহরিয়ার, আবীর মোহাম্মদ, শাকিলুজ্জামান ও ইনতেজার হাসনাইন। তাঁরাও ব্র্যাকে ইইই, সিএসই ও ইসিই [ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং] বিভাগে পড়েন। সহকারী হিসেবে এলেন মেকালিক্যাল ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট মনির হোসেন।

রোবটের নকশা করা হলো। নাম রাখা হলো ‘মঙ্গলতরী’। শুরু হলো তৈরি। এটি উঁচু-নিচু পথ পাড়ি দিতে পারবে, মঙ্গলে নেমে এই গ্রহের মাটি সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ করে পৃথিবীতে সংকেত ও প্রয়োজনীয় তথ্য পাঠাতে পারবে। ব্যাটারির মাধ্যমে ২৫-৩০ মিনিট চলতে পারবে।

একদিকে রোবট বানানোর কাজ এগিয়ে চলছে, অন্যদিকে তাঁরা মঙ্গলভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য অনলাইনে আবেদন শুরু করলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জে [ইউআরসি] আবেদন করে সাড়া পেলেন না। ব্রিটেনের ইউকে ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জে [ইউকেইউআরসি] আবেদনের সঙ্গে মঙ্গলতরীর ভিডিও ও তথ্য যুক্ত করে দিলেন। এবার আবেদন গ্রহণ করা হলো। পরে পাঁচ হাজার টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি জমা দেওয়া হলো। ২০১৫ সালের জুনের শেষের দিকে রেজিস্ট্রেশনের দুই ঘণ্টার মধ্যে প্রতিযোগিতাটির আয়োজক ‘দ্য মার্স সোসাইটি’ একটি ফিরতি মেইল দিয়ে জানাল, আপনারা ২০১৬ সালের ২৩ জুলাই ইউকেইউআরসিতে অংশ নেবেন। এ ছাড়া এ বছরের ১০ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ডের ইউরোপিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জে [ইআরসি] যাবে ‘মঙ্গলতরী’।

‘মঙ্গলতরী’ নিয়ে বলতে গিয়ে দলনেতা নিয়াজ শরীফ বলেন, ‘রোবটটি তৈরি করতে অনেক যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়েছে। এ জন্য ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি রোবট ক্লাব আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দুই লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে।’ রোবট নিয়ে স্মরণীয় ঘটনার কথা বললেন মাসনূর, ‘রোবটটি টেস্ট করার জন্য আমরা এ বছরের ১০ মার্চ আশুলিয়ায় গিয়েছিলাম। সেখানে মঙ্গলতরী উল্টে গেল। ভয় পেয়ে আমরা ভাবতে লাগলাম, তাহলে মঙ্গলে গিয়ে কি এই দশাই হবে? পরে অবশ্য সব ঠিকঠাক হয়েছে। মঙ্গলতরী এখন মঙ্গল বিজয়ের জন্য পুরোপুরি তৈরি।’ মঙ্গলতরী আজ ম্যানচেস্টারের জন্য বিমানে উঠছে। সেখানে সে ২৩ ও ২৪ জুলাই ইউকেইউআরসি প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। মঙ্গলের সঙ্গে সাতজন যাচ্ছেন বিদেশে।

এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ, পোল্যান্ড, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, নেপালসহ ১০টি দেশের প্রতিযোগীরা অংশ নেবেন। নিয়াজ সাফল্যের ব্যাপারে বললেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন থেকে একাধিক শক্তিশালী দল অংশ নেবে। সেখানে আমরা তৃতীয় হওয়ার জন্য লড়ব।’ আর মঙ্গলতরীর উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান বললেন, ‘এটি পাহাড়ে ওঠার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী বলে এই রোবট সেখানে ভালো করবে বলে আমি আশাবাদী।’