মাওঃ মাসউদের মধ্যে আছে স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মাওলানা আবুল কালাম আজাদের যোগ্যতা

আমি অতীতে দেখেছি, বড় বড় আলেমদেরকে বৃদ্ধ বয়সে জনবিচ্ছিন্ন করে দেন তাঁর আশপাশের মতলবাজ লোকেরা। শায়খে কৌড়িয়া (র.), হযরত হাফেজ্জী হুজুর (র.), শায়খুল হাদিস আজিজুল হক (র.) প্রমূখের নেতৃত্বকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। দেখেছি তাদের আশপাশের লোকেরা তাদেরকে কীভাবে নিজ চিন্তা থেকে সরিয়ে ভিন্নপথে নিয়ে জনবিচ্ছিন্ন করেছেন। এই বুজুর্গদের অনেকের সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কও ছিলো। অনেকের মনের কথাও জানি। ওরা খুবই মুখলেস লোক ছিলেন। কিন্তু শেষ জীবনে বার্ধক্যজানিত কারণে অন্যের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। এই বুজুর্গদের জীবনের শেষের দিকের বিভিন্ন ঘটনা দেখে খুবই দুঃখ হতো আর অনুভব করতাম হযরত নবী করিম (স.) কেন আল্লাহর কাছে বার্ধক্য থেকে মাফি চেয়েছেন। আমি অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, হযরত নবী করিম (স.) যতদিন পৃথিবীতে ছিলেন ততদিনের পর অর্থাৎ ৬০/৬৫ বছর বয়সের পর কাউকে কোন দায়িত্বশীল নেতৃত্বে রাখা অনুচিৎ। কারণ, এরপর তারা পরনির্ভশীল হয়ে যান। যারা এই বয়সে পা রাখবেন তারা অবশ্যই কম বয়সীদের জন্য বরকতি। মানুষ তাদের কাছ থেকে দোয়া নিবে, পরামর্শ নিবে, তবে তারা নেতৃত্বে থাকতে পারবেন না। এই নিয়ম চালু হয়েগেলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এবং বুজুর্গরা আর অপমানিত হয়ে বিদায় নেবেন না।

কওমী মাদরাসার সনদের সরকারি স্বীকৃতি নিয়ে পাল্টা-পাল্টি বক্তব্য হচ্ছে মিডিয়ায়, ফেইসবুকে, কিংবা অন্যান্য বৈঠকে। মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদের নেতৃত্বে কওমী মাদরাসা শিক্ষা কমিশন করে সরকার ইতোমধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে এ বিষয়ে। মানছেন না একদল। যারা মানছেন না তারা কারা? চোখ দিলে দেখা যাবে বেশির ভাগ বিএনপি-জোটের মানুষ ওরা। আল্লামা আহমদ শফিকে এখানে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বয়স্ক মানুষ। আশপাশের লোকেরা যা বলবে তিনি তা-ই করবেন। শাপলা চত্বরে তাঁকে ধোঁকা দিয়েছে বিএনপি-জামায়াত জোটের লোকেরা। আজও কওমী মাদরাসার সনদের স্বীকৃতি নিয়ে তাঁকে ধোকার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে ওরা। হুজুরকে সবাই শ্রদ্ধা করে। এই শ্রদ্ধার সুযোগে একদল স্বার্থপর মানুষ তাঁকে ভুল বুঝিয়ে ব্যবহার করে নিচ্ছে। যা হুজুরের জনপ্রিয়তা হ্রাসের জন্য একটি অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

বিএনপি-জামায়াত জোটের যারা মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদের নেতৃত্ব মানতে পারছেন না তাদের কাছে একটি প্রশ্ন, যিনি সরকারের বিরোধীতা করেন কিংবা সরকার বিরোধীদের সহযোগিতা করেন, তার কি আশা করা উচিৎ হবে সরকার তাঁর নেতৃত্বে কওমী মাদরাসার স্বীকৃতি দিবে? এমন আশা তো বাংলাদেশে পাগলও করবে না। আপনি কি আপনার প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কোনদিন এমন কারো কাছে দিবেন যিনি আপনাকে প্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন? নিশ্চয় দিবেন না। তা হলে কীভাবে আশা করেন, শেখ হাসিনা সরকার আপনাদের মাধ্যমে কওমী সনদের স্বীকৃতি দেবে? এমন চিন্তা নিশ্চয় বোকামি।

আপনারা তো পারলেন না আপনাদের বিএনপি-জামায়াত জোটের মাধ্যমে কওমী সনদের স্বীকৃতি আনতে। এই স্বীকৃতির জন্য শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক জোটে থেকেও জোট সরকারের কাছে দাবী জানিয়ে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সামনে লাগাতার কয়েকদিন অনশন করলেন, তবু কাজ হলো না। আপানারা আপনাদের জোট সরকারকে দিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন কেন বিজ্ঞাপনও জারি করতে পারেননি, তা কি ভুলে গেলেন? শেষ পর্যন্ত শায়খুল হাদিস জোট থেকে বেরিয়ে কওমীর সনদের স্বীকৃতি সহ বিভিন্ন বিষয়ের চুক্তিতে আওয়ামীলীগের সাথে জোট করতে বাধ্য হলেন। যদিও সেই জোট দীর্ঘস্থায়ী থাকেনি আওয়ামীলীগের নির্বাচনি কৌশলের কারণে।

মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদকে যে যাই বলুন, তিনি একজন প্রাজ্ঞ আলেম। তিনি যখন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একলাখ আলেমের ফতোয়া নিয়েছেন তখন আপনারা তাঁকে দালাল বলে চিহ্নিত করেছেন। আমি ফেইসবুকে তাঁর পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছিলাম, তিনি দালাল নয়, একদিন প্রমাণ হবে তিনি কত প্রাজ্ঞ এবং বিচক্ষণ মানুষ। গুলশানের ঘটনার পর সবাই স্বীকার করেছেন, মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ যদি একলাখ আলেমের ফতোয়া না নিতেন তবে সম্পূর্ণ দোষ প্রথমেই চলে আসতো মাদরাসাগুলোর উপরে। আল্লামা আহমদ শফি শাপলা চত্বরের ঘটনার পরে জামায়াত-বিএনপি জোটের খপ্পর থেকে বেরিয়ে যেভাবে রক্ষা করেছিলেন এদেশের অসংখ্য মাদরাসাকে, তেমনি মাওলানা মাসউদও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে স্বাক্ষর নিয়ে রক্ষা করেছেন আলেম, উলামা এবং মাদরাসাগুলোকে।

মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদের নেতৃত্বে সরকার ইতোমধ্যে কওমী মাদরাসার সনদের স্বীকৃতির প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। তা কম কথা নয়। জামায়াতি আর বামরা চায় না কওমী মাদারাসার সনদের সরকারী স্বীকৃতি আসুক। কারণ, তারা জানে এদেশে কওমী মাদরাসা যতদিন থাকবে ততদিন তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারবে না। আর জামায়াতিরা ভালো করেই জানে, মাওলানা মাসউদের নেতৃত্বে কওমী মাদরাসার সনদের স্বীকৃতি এলে কমপক্ষে এই সব প্রতিষ্ঠানে কোনদিন মাওদুদীবাদ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না।

কওমীর হুজুরদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। আমি আশা করি তারা শত ইখতিলাফের পরও কওমীর সনদের স্বীকৃতির জন্য মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদের নেতৃত্ব মেনে নিবেন। কারণ, এর আর কোন বিকল্প নেই। সরকারের উচিৎ বিষয়টিকে ঝুলিয়ে না রেখে খুব দ্রুত কমিশনের মাধ্যমে কাজ সম্পাদন করা। কেউ কেউ এই মূহুর্তে না মানলেও পরে অবশ্য মেনে নিবেন। স্বীকৃতি এসেগেলে ছাত্র-শিক্ষকেরাই ভেতর থেকে আন্দোলন করবেন বোর্ডে প্রবেশের জন্য। বড়গুলো প্রথম দিকে লাজে হয়তো ডুকবে না, ক্ষেত্র বিশেষ বিরোধীতা করবে। কিন্তু ছোটগুলো অবশ্যই প্রথম পর্যায়ে বোর্ডে ডুকে যাবে।

মাওলানা মাসউদের মধ্যে আমি দেখি স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মাওলানা আবুল কালাম আজাদের যোগ্যতা। মাওলানা আজাদকে নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকার পরও আজ দীর্ঘদিন পরে স্বীকার করতে হবে তিনি ভারতের জন্য যে শিক্ষানীতি, পদ্ধতি চালু করেছিলেন তা গোটা ভারতবর্ষের কোন দেশই আজ পর্যন্ত অতিক্রম করতে পারেনি। আমার বিশ্বাস, মাওলানা মাসউদ কওমী মাদরাসার জন্য এমন একটি সেলেবাস তৈরির যোগ্যতা রাখেন যার মধ্যে ঈমান-আকিদা যেমন পূর্ণাঙ্গরূপে থাকবে, তেমনি থাকবে দুনিয়ার সাথে প্রতিযোগিতা করার মতো যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা।