মান্নাকে আমি যেভাবে প্রথম দেখেছিলাম – তাসলিমা

মাহমুদুর রহমান মান্নাকে আমি প্রথম দেখেছিলাম ১৯৭৯ সালে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের নবীন বরণ উৎসবে। আমি তখন নবীন। সবে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছি। গান কবিতা বক্তৃতা শুনিয়ে নবীনদের বরণ করে নিচ্ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন। জাসদের বরণ অনুষ্ঠানে ঢাকা থেকে এসেছিলেন মাহমুদুর রহমান মান্না। ঢাকা থেকে যত নেতা এসেছিলেন, সবচেয়ে ভালো বক্তৃতা করেছিলেন মাহমুদুর রহমান মান্না। কী যে মুগ্ধ হয়েছিলাম মান্নার বক্তৃতা শুনে। সবার জন্য শিক্ষা স্বাস্থ্য, সবার জন্য অন্ন বস্ত্র, সবার জন্য নিরাপত্তার দাবি সবচেয়ে বেশি ছিল মান্নার কণ্ঠে। আমার সতেরো আঠারো বছর বয়সের মুগ্ধতা সত্যি বলতে কী, কখনও ফিকে হয়নি। কিছু জিনিস চিরকাল রয়ে যায় স্মৃতিতে। বড় হয়ে খবরের কাগজে পড়েছি মাহমুদুর রহমান মান্নার নিয়মিত কলাম। একই কাগজে আমিও তখন লিখতাম। খুব গর্ব হত, যে পত্রিকায় মান্নার মতো আদর্শ রাজনীতিক লেখেন, সেই পত্রিকায় আমিও লিখি।

কিন্তু কাল শুনলাম তিনি নাকি দেশে কিছু লাশ ফেলে দেওয়ার কথা বলেছেন। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। মনে পড়ছিল এককালের সেই প্রচণ্ড আদর্শবাদী মান্নাকে, যাঁর আহবানে যুব সমাজ দেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছিল। কোথায় গেল দেশ গড়া! আজ মান্না দেশের লোককে গুলি করে মেরে ফেলা হলে আপত্তি করবেন না বলে জানিয়েছেন। কবে থেকে যে তিনিও দেশের নোংরা রাজনীতিতে জড়িয়ে গেছেন জানি না। খুব বেশি কিছু না জানাও হয়তো ভালো। ও-ই ভালো ছিল, জানতাম যে, দেশে এখনও কিছু আদর্শবান মানুষ আছেন, যাঁরা দেশ এবং দেশের মানুষের নিরাপত্তার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিতে পারেন।

রাজনীতিকদের সবকিছু হয়তো জানতে নেই। তাঁরা যেটুকু জানান, শুধু সেটুকু জানাই হয়তো ভালো। শুধু সেটুকু জানলে আমাদের মনে আশা ভরসা, সুখ স্বপ্ন, সবকিছু অক্ষত অবস্থায় থাকে। তাঁদের লাশ ফেলে দেওয়ার ইচ্ছের কথা জানলে আমাদের পায়ের তলার মাটি সরে যায়। কেবল কি মান্নারই, লাশ ফেলে দেওয়ার ইচ্ছে নিশ্চয়ই আরও অনেক রাজনীতিকের। তাঁরা তাদের অনুসারীদের ইন্ধন জোগাচ্ছেন দেশে আগুন জ্বালাতে, দেশ ছাই করে দিতে। দেশটা ধূর্ত, চতুর, স্বার্থপর আর ফন্দিবাজ রাজনীতিকদের হাতে বন্দি। দেশটা বড় অসহায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.