যে বানী শুনিয়ে বেহেশতের সুসংবাদ দিলেন আবু হোরায়রা (রা)

এটা জেনেছি আবু হুরাইরা রা:-এর কাছ থেকে। রাসূলুল্লাহ সা:কে ঘিরে সবাই বসেছিলেন। সেখানে আরো উপস্থিত আবু বকর রা: ও ওমর রা:। কথা বলতে বলতে হুজুর সা: উঠে গেলেন। দীর্ঘ সময় তার আর দেখা নেই। উদ্বিগ্ন সবাই রাসূল সা:-এর জন্য। কোনো বিপদ ঘটেনি তো? সর্বপ্রথম উঠে দাঁড়ালেন আবু হুরাইরা রা:, তাঁর তালাশে। কাছেই বনি নাজ্জারের আনসারদের একটি বাগান। সে বাগানের প্রবেশপথ কোথায় তা-ও চট করে খুঁজে পাওয়া গেল না। দেখা গেল বাইরের একটি কুয়ো থেকে বাগানের ভেতরে নালাটি প্রবেশ করেছে। শরীর সঙ্কুচিত করে নালার মধ্যেই ঢুকে পড়লেন আবু হুরাইরা রা:। এভাবে সামনাসামনি এসে হাজির হলেন রাসূল সা:-এর সামনে। বললেন, আমরা সবাই আপনার জন্য চিন্তিত হঠাৎ করে চলে আসায়। পেছনে পেছনে আরো সবাই আসছে। এবার বলুন, কেন আপনি এখানে?
রাসূল সা: বললেন, আমার প্রিয় আবু হুরাইরা, আমার এই জুতোজোড়া নিয়ে তুমি বাইরে যাও এবং বাইরে যাকেই দেখতে পাও, প্রথমে তাকে বিশ্বাসের সাথে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ শাহাদাতের এই বাণী শুনিয়ে দিয়ে তাকে বেহেশতের সুসংবাদ দাও। বেরিয়ে হুরাইরা রা: পেলেন হজরত ওমর রা:কে। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি জানেন এই জুতোজোড়া কার? ওমর রা: বললেন, এটি আমার রাসূল সা:-এর। আবু হুরাইয়া রা: বললেন, তিনি আমাকে দিয়ে বলে পাঠিয়েছেন, যে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ শাহাদাতের বাণী উচ্চারণ করেছে, তাকে যেন বেহেশতের সুসংবাদ দিই। হজরত ওমর আবু হুরাইরা রা:-এর বুকে এত জোরে আঘাত করলেন যে, তিনি চিত হয়ে পড়ে গেলেন। তিনি বললেন, তুমি হুজুর সা:-এর কাছে ফিরে যাও। আবু হুরাইরা রা: কাঁদতে কাঁদতে রাসূল সা:-এর কাছে ফিরে গেলেন এবং বললেন, ওমর রা:কে আমি প্রথম দেখতে পাই এবং আপনার জুতোজোড়া তাকে দিয়ে বেহেশতের সুসংবাদ শোনাই। এরপরই আমি পাই তার কাছ থেকে আঘাত। ওমর রা:-এর সাথে দেখা হলে তিনি হুজুর সা:-কে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি এমনটি বলেছেন যে, আপনার জুতোজোড়ার সাথে আমার জন্য বেহেশতের সুসংবাদ। রাসূল সা: বললেন, হ্যাঁ, আমি বলেছি। তখন ওমর রা: বললেন, আমার মা-বাপ আপনার ওপর কোরবান, এমনটি করবেন না। আমার ভয় হয়, লোকেরা এর ওপরই ভরসা করবে। তাদের আমল করতে দিন। রাসূল সা: বললেন, তাই হবে ওমর রা:। ওদেরকে আমল করতে দাও [জামউল ফাওয়ায়েদ: হায়াতুস সাহাবাহ]।

1000064
এরপরে আছে এমন সংবাদ, যাতে মুমিনরা হবে উল্লসিত। তাতে শুধু বেহেশতের সংবাদ। আমি পড়ে যেন প্রথমবার বেহেশতের মধ্যে প্রবেশ করলাম [এটা রেওয়ায়েত সূত্রে বর্ণনা করেছেন ইমাম বোখারি ও ইমাম মুসলিম]। তারা বলেছেন, এক দিন নিশীথকালে বের হয়ে দেখলাম, রাসূল সা: রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন। সম্পূর্ণ একাকী। ধারে কাছে আর কেউ নেই। ভাবলাম, হয়তো তাঁর ভালো লাগছে চাঁদের আলোয় একাকী হাঁটতে। যেন কায়ার পেছনে ছায়া। রাসূল সা: জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে? উত্তরকারী বললেন, আমি আবুজার রা:। আপনার ওপর আমার জান কোরবান। রাসূল সা: বললেন, ‘হে আমার অনুসারী আবুজার, তুমি আমার আরো কাছে এসো।’ অনেকক্ষণ তার সাথে হাঁটলাম। বুঝলাম তিনি একটা কিছু ভাবছেন এবং এখনি তাঁর ভাবনার সাথে আমাকে কিছু বলবেন। আমি উন্মুখ হয়ে তার জবানের দিকে তাকিয়ে। কী বলবেন কে জানে? রাসূল সা: বললেন, ‘জানো আবুজার, ধনীরাই কেয়ামতের দিনে হবে দরিদ্রের চেয়েও দরিদ্র। শুধু সেই ক’জন বাদে যারা দিনে রাতে ডানে বামে আগে পেছনে শুধু দান করে চলেছে। আর সারা দিন শুধু তালাশ করছে শুদ্ধ আমলের। আরো কিছুক্ষণ হাঁটলেন দু’জন। চলো এখানে বসি।’
আবুজার রা: বললেন, আমাকে তিনি একটি সমতল জায়গায় বসালেন, যার আশপাশে ছোট ছোট পাথরের নুড়ি। হুজুর সা: বললেন, যতক্ষণ ফিরে না আসছি, এখানেই বসে থাকো। তারপর সেই ধু-ধু প্রান্তরে তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন। যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু প্রস্তরময় মরুভূমি। কাউকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। যখন ফিরে আসছেন, তখন তাঁর দু-একটি শব্দ আমার কানে আসে। তিনি বলছেন, যদি সে জেনা করে, যদি সে চুরি করে? আবুজার রা: বললেন, আমি অনেকক্ষণ আপনাকে না দেখে ধৈর্য হারিয়ে ফেলছিলাম। আল্লাহ তায়ালা আপনার ওপরে আমার জান কোরবান করুন। আপনি ময়দানে কার সাথে কথা বলছিলেন? কেউ তো আপনার কথার উত্তর দিচ্ছিল না। রাসূল সা: বললেন, সাথে জিব্রাইল আ:। তিনি বলে গেলেন, আপনার উম্মতদের শুভ সংবাদ দিন। যদি কেউ আল্লাহ্র সাথে শরিক না করে, সে বেহেশতে যাবে। রাসূল সা: জিজ্ঞেস করলেন, যদি সে জেনা করে, চুরি করে? জিব্রাইল আ: বললেন, হ্যাঁ। যদি সে চুরিও করে, জেনাও করে; তা হলেও আল্লাহ্র সাথে শরিক না করলে সে বেহেশতে যাবে। তারপরে বললেন, যদি সে শরাবও পান করে [এগুলো সংগৃহীত বোখারি, মুসলিম ও তিরমিজি থেকে]। যদিও আবুজার রা: নিজেও এর সবই অপছন্দ করেন [জামউল ফাওয়ায়েদ]।

লেখক : সাহিত্য-সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব
mabbasi@dhaka.net