‘সততা স্টোর’ – দোকান আছে, দোকানদার নেই

বিদ্যালয়ের প্রবেশপথে রাখা একটি বড় টেবিলে সাজানো আচার, চকলেট, চুইংগাম, চিপস। আছে খাতা, কলম, জ্যামিতি বক্স, রাবার, স্কেলও। এক পাশে টাঙানো পণ্যের মূল্যসংবলিত লেখা বোর্ড। শিক্ষার্থীরা পছন্দের পণ্য নিয়ে নির্ধারিত ড্রয়ারে টাকা রেখে চলে যাচ্ছে। কোনো বিক্রেতা বা পাহারাদার নেই।

এটা রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দুদুখানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘সততা স্টোর’। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও পড়াশোনার পাশাপাশি নৈতিকতাবোধের শিক্ষা দিতে খোলা হয় সততা স্টোর। ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই স্টোরে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বিক্রি হয়।

গত শনিবার দুদুখানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষকদের বসার কক্ষের পাশে জানালার সামনে একটি বড় টেবিল। তাতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী। টেবিলের একটি ড্রয়ার খোলা। শিক্ষার্থীরা এসে যার যার প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে ড্রয়ারে টাকা রেখে যাচ্ছে। টেবিলের এক পাশে দেয়ালে মূল্যসহ ২৫-২৬টি পণ্যের তালিকা টাঙানো আছে।

৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী স্বর্ণা আকতার একটি পেনসিল নিতে এসেছে। সে বলে, ‘ভুলে বাসায় পেনসিল রেখে এসেছি। তাই এখান থেকে কিনে নিলাম। এ জন্য আমার বাসায় যাওয়া লাগল না। কষ্ট করে বাইরের দোকানেও যেতে হলো না।’

৫ম শ্রেণির শিউলি আকতার, মোবাশ্বির হোসেন, তানিয়া আকতার বলে, আগে স্কুলের সময় তারা ৪০০-৫০০ গজ দূরে দোকানে যেত। এখন বিদ্যালয়ে এ ধরনের ব্যবস্থা করায় কোথাও যেতে হয় না। কোনো জিনিস বিদ্যালয়ের দোকানে না পেলে শিক্ষকদের বললে পরদিন তাঁরা ব্যবস্থা করে দেন। আর বাইরের দোকান থেকে কিছু পণ্য তারা এখানে কম দামে পায়।

৪র্থ শ্রেণির নাজমুল হক বলে, আগে টিফিনের সময় বাইরে থেকে কিছু আনতে গিয়ে তারা প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনায় পড়ত। এখন আর সেই সমস্যায় পড়তে হয় না। পছন্দের জিনিস বিদ্যালয় থেকেই কেনা যাচ্ছে। ইচ্ছেমতো জিনিস কিনে ড্রয়ারে টাকা রেখে দিতে হয়। কারও জন্য অপেক্ষা করতে হয় না।

সহকারী শিক্ষক নাসরীন আকতার বলেন, প্রতিদিন সকাল সাড়ে নয়টা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত বিদ্যালয় চলে। এ সময় শিশুশিক্ষার্থীরা নানা প্রয়োজনে বিদ্যালয় থেকে কয়েক শ গজ দূরের দোকানগুলোতে ছুটে যেত। বিদ্যালয়ের পাশে ব্যস্ত দুদুখানপাড়া সড়ক। এ রাস্তা পার হয়ে দোকানে যাওয়ায় মাঝেমধ্যে ঘটে দুর্ঘটনা। এ ছাড়া কেউ কেউ বাইরে গেলে আর ফিরে আসত না, বিদ্যালয় ফাঁকি দিত। এসব বিষয় মাথায় রেখে তিনি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলামের সঙ্গে পরামর্শ করেন। পরে প্রধান শিক্ষকসহ সবার সহযোগিতায় ‘বিক্রেতা নেই’ এমন দোকান খোলার উদ্যোগ নেন। পাঁচ হাজার টাকার পণ্য কিনে দোকান চালু করা হয়। দোকান থেকে আসা লাভ দুস্থ ও অসহায় শিক্ষার্থীদের পেছনে ব্যয় করা হবে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমা আকতার বলেন, সততা স্টোরের কারণে শিক্ষার্থীরা শিশুকাল থেকেই সততার শিক্ষা পাবে। এ শিক্ষা ভবিষ্যতে তাদের কাজে লাগবে।

বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির উপজেলা শাখার সভাপতি মুহাম্মদ বাবর আলী বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ খুবই প্রশংসার। একদিকে শিশুরা ন্যায্যমূল্যে প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে পারছে, অন্যদিকে নৈতিক শিক্ষা পাচ্ছে।

উপজেলার সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা সাহিদুল ইসলাম বলেন, অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এতে শিশুদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটবে না।