সোজা করে পৃথিবীকে দেখতে পেল মাত্র আট মাস, ১৩ বছরেই ফুরিয়ে গেল তার জীবন

তখন বিকেল ৩টে। খাওয়া শেষ করে বিছানায় শুয়ে শুয়ে টিভিতে কার্টুন দেখছিল বছর ১৩-র মহেন্দ্র আহিরওয়ার। সর্ব ক্ষণের সঙ্গী তার মা অভ্যেস মতো জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘‘এখন কেমন আছিস রে?’’ এক গাল হেসে মহেন্দ্র জানায়, “ভাল আছি মা।” কিন্তু সেই হাসিটাই যে ছেলের শেষ হাসি হয়ে যাবে ঘূণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি সুমিত্রাদেবী। সংসারের কাজে তিনি একটু বাইরে বেরিয়েছিলেন। সেই সময়েই হঠাত্ বুকে ব্যথা শুরু হয় মহেন্দ্রর। মা-কে ডাকতে থাকে সে।

কিছু ক্ষণের মধ্যে সুমিত্রাদেবী ফিরে আসেন। ছেলের কাছে গিয়ে তাঁর বুকে হাত বুলিয়ে দেন তিনি। দু’বার জোরে কেশে ওঠে মহেন্দ্র। কিন্তু, তৃতীয় বার কাশতে গিয়ে মায়ের কোলেই এলিয়ে পড়ে সে। আর কোনও সাড়া নেই। ছেলের নিথর দেহ ঝাঁকিয়ে চিত্কার করতে থাকেন মা। ছেলে নিশ্চুপ! কান্না শুনে পাড়ার লোকজন জড়ো হয়ে যায়। মিনিট পনেরোর মধ্যে চিকিত্সক আসেন। কিন্তু, মাইওপ্যাথি নামে বিরল রোগে আক্রান্ত মহেন্দ্র আহিরওয়ার তত ক্ষণে সব চিকিত্সার ঊর্ধ্বে! গত শনিবারের এই ঘটনায় শোকস্তব্ধ গোটা দুনিয়া।

 

মধ্যপ্রদেশের ছত্তরপুর জেলার প্রত্যন্ত একটি গ্রাম ছাতি পাহাদি। অনেকেরই চেনা এই নাম। সৌজন্য মহেন্দ্র আহিরওয়ার। মাইওপ্যাথি নামে দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ায়, সে জগতটাকে দেখত উল্টো ভাবে। কাঁধ থেকে প্রায় ১৮০ ডিগ্রি ভাবে ঝুলে থাকত গলাশুদ্ধ মাথা। ওই অবস্থায় কোনও কাজ করার ক্ষমতা ছিল না তার। স্নান করা থেকে খাওয়ানো— সব কিছুতেই ভরসা মা। শরীরের এমন অদ্ভুত গঠন দেখে বন্ধুরা তামাশা করত! মহেন্দ্রের দুই ভাই ও এক বোন রয়েছে। আর্থিক অনটন তো রয়েইছে। তার উপর ছেলের এত বড় রোগের চিকিত্সা কী করে করবেন, দুশ্চিন্তায় ঘুম আসত না বাবা মুকেশের। চিকিত্সা তো দূর অস্ত্‌, এতবড় পরিবারে মুখে দু’মুঠো অন্ন তুলতেই হিমশিম খেতে হয় তাঁকে।

1000026

তবে, মহেন্দ্র-র চিকিত্সার জন্য একটা সময়ের পরে আলোর দিশা দেখতে পান বাবা-মা। তার জীবন নিয়ে তৈরি হয়েছিল নানা ডকুমেন্ট্রি, খবর। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে তার নাম। অর্থিক অনটনে বড় হওয়া মহেন্দ্রর ‘করুণ গল্প’ অনেকেরই মন স্পর্শ করে। এক ব্রিটিশ মহিলা মহেন্দ্রর পরিবারের পাশে এসে দাঁড়াম। তার চিকিত্সার জন্য তিনি একটি ক্রাউডফান্ডিংয়ের ব্যবস্থা করেন। ফেসবুক, টুইটারে তার নামে প্রোফাইল তৈরি করে অর্থ সাহায্যের আবেদন জানানো হয়। তহবিল থেকে পাওয়া প্রায় ১২ হাজার পাউন্ড কিশোরের পরিবারের তুলে দেন ওই মহিলা।

জন্মগত মাইওপ্যাথিতে আক্রান্ত এমন বিরলতম রোগের অস্ত্রোপচার ভারতে সেই প্রথম হয়। দিল্লির এক বেসরকারি হাসপাতালে মহেন্দ্রর এই অস্ত্রোপচার সফল ভাবে করেন চিকিত্সকরা। প্রায় দশ ঘণ্টা ধরে চলা অস্ত্রোপচারে ধাতুর প্লেট লাগিয়ে গলাকে সোজা করা হয়। চিকিত্সক রাজাগোপালন কৃষ্ণন জানান, “খুব পজেটিভ ছেলে মহেন্দ্র। অস্ত্রোপচারের দুই এক দিনের মধ্যে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে সে।” কিন্তু অস্ত্রোপচারের আট মাস পর মহেন্দ্র এমন আকস্মিক ভাবে চলে যাওয়ায় হতবাক চিকিত্সক কৃষ্ণন। তিনি জানান, অস্ত্রোপচারের পর নতুন কোনও রোগের লক্ষণ দেখা যায়নি মহেন্দ্রর। যদি অস্বাভাবিক কিছু দেখা যেত, তা হলে জটিল অপারেশন চলাকালীন বা আসিইউতেই মারা যেতে পারত সে। কিন্তু, মাইওপ্যাথিতে আক্রান্ত হওয়ার কারণে মহেন্দ্রর হার্ট ভীষণ দুর্বল ছিল, সে কারণেই মৃত্যু হতে পারে বলে মনে করছেন কৃষ্ণন।

পৃথিবীকে সোজা করে দেখার সুযোগ হয়তো বেশি দিন পায়নি মহেন্দ্র। কিন্তু এত কষ্টের মধ্যেও তার অমায়িক হাসিতে গোটা ছাতি পাহাদি গ্রাম থেকে সোশ্যাল মিডিয়া বাঁচার লড়াইকে সোজা করে দেখতে শিখেছিল। প্রচারে আসার পর সে রাতারাতি ‘হিরো’ বনে যায় সবার কাছে। তাই তার এমন হঠাত্ চলে যাওয়া শোকস্তব্ধ সবাই। তবে এই শোকস্তব্ধতার মধ্যেই সুমিত্রাদেবী এখনও ছেলের শেষ কথাটা শুনতে পান, “ভাল আছি মা।”