স্টরম-২৬ অভিযানে ৯ জঙ্গি নিহত

কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় সোয়াত র‌্যাব পুলিশের রাতভর অপারেশন, ৯ জঙ্গি নিহত ।  রাজধানীর কল্যাণপুরে একটি জঙ্গি আস্তানায় যৌথ অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে ৯ জঙ্গি নিহত হয়েছে। আহত অবস্থায় আটক করা হয়েছে একজনকে। গত সোমবার গভীর রাত থেকে গতকাল মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত কল্যাণপুর গার্লস হাই স্কুলের পাশের একটি বাড়িতে এ অভিযান চলে। পুলিশের ভাষ্য মতে, হতাহতরা নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সদস্য। তারা বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা করছিল। গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলাকারী এবং কল্যাণপুরে নিহতরা একই গ্রুপের সদস্য।

কল্যাণপুরে ৫ নম্বর সড়কের ৫৩ নম্বর বাসায় ওই অভিযান চালানো হয়। ছয়তলা ভবনটির নাম তাজ মঞ্জিল। তবে দেখতে অনেকটা জাহাজের মতো বলে স্থানীয়দের কাছে সেটি ‘জাহাজ বিল্ডিং’ নামে পরিচিত। পুলিশের দাবি, হতাহত জঙ্গিরা ভবনটির পঞ্চম তলার একটি ফ্ল্যাটে মেস করে থাকত। জানা গেছে, ১৪ দিন আগে তারা ফ্ল্যাটটি ভাড়া নিয়েছিল।

আহত যুবকের নাম রাকিবুল হাসান রিগ্যান। তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গতকাল রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নিহত ৯ যুবকের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে হাসপাতালে সাংবাদিকদের কাছে রিগ্যান দাবি করেছে, পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে নিহতদের মধ্যে সে আটজনকে চেনে। তারা হলো—রবিন, সাব্বির, তাপস, অভি, আতিক, সোহান, ইমরান ও ইকবাল।

পুলিশ বলছে, নিহত সবার বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। চেহারা ও বেশভূষা দেখে তাদের উচ্চশিক্ষিত মনে হয়েছে। অভিযানের পর ওই মেস থেকে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি পরিচয়পত্র পাওয়া গেছে। সেগুলো আসল কি না যাচাই করে দেখা হচ্ছে। গতকাল রাতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়বেসাইটে নিহত ৯ জনের ছবি প্রকাশ করেছে পুলিশ। তাদের পরিচয় উদ্ধারে তথ্য দিয়ে সহায়তার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

রিগ্যানের বাড়ি বগুড়া সদরে সরকারি আজিজুল হক কলেজসংলগ্ন জামিলনগরে। পরিবার ও পুলিশের দাবি, বগুড়ার সরকারি শাহ সুলতান কলেজ থেকে গত বছর এইচএসসি পাসের পর সে এক বছর ধরে নিখোঁজ ছিল। গতকাল হাসপাতালে সাংবাদিকদের কাছে রিগ্যান দাবি করে, জাহাজ বিল্ডিংয়ের ওই মেসে সে রান্নার কাজ করত।

পুলিশ জানায়, সোমবার রাত ১২টার পর থেকেই কল্যাণপুর এলাকায় জঙ্গিবিরোধী অভিযান শুরু হয়। একপর্যায়ে জাহাজ বিল্ডিংয়ে জঙ্গিদের উপস্থিতি টের পাওয়ার পর অভিযান জোরদার করা হয়। পুলিশের পাশাপাশি সোয়াত, র‌্যাব, ডিবি, বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল ও ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল অভিযানে অংশ নেয়। তবে ওই মেসে মূল অভিযান চালানো হয় ভোর ৫টা ৫১ মিনিট থেকে ৬টা ৫১ মিনিট পর্যন্ত। অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন স্টর্ম টোয়েন্টি সিক্স’।

পুলিশ জানায়, অভিযান শেষে ওই মেস থেকে ৯ জঙ্গির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের পরনে ছিল কালো রঙের পাঞ্জাবি, মাথায় ছিল পাগড়ি। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মারুফ হাসান জানান, ঘটনাস্থল থেকে জঙ্গিদের ব্যবহৃত ১৩টি হ্যান্ড গ্রেনেড, সেভেন পয়েন্ট ৬৫ বোরের চারটি পিস্তল, সাতটি ম্যাগাজিন, ২২টি গুলি, ১৯টি ডেটোনেটর, পাঁচ কেজি বিস্ফোরক জেল, একটি তরবারি, তিনটি কমান্ডো চাকু, ১২টি গেরিলা চাকু, আরবি লেখা দুটি কালো পতাকা, ব্যানার, কয়েকটি ব্যাগ ও জিহাদি বই জব্দ করা হয়েছে। ঘটনার পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জাহাজ বিল্ডিংয়ের মালিকের স্ত্রী ও ছেলেসহ ১১ জনকে আটক করেছে পুলিশ। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে গতকাল ঘটনাস্থলের আশপাশের এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল।

অভিযানের পর গতকাল সকালে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক ও ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া কল্যাণপুরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘নিহতরা সবাই জেএমবির সক্রিয় সদস্য। গুলশান ও শোলাকিয়া হামলায় যারা অংশ নিয়েছিল তারা এবং কল্যাণপুরে নিহতরা একই গ্রুপের সদস্য বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি।’

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সোমবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে মিরপুর থানার পুলিশ কল্যাণপুরের বিভিন্ন বাসায় অভিযান শুরু করে। একপর্যায়ে তারা জাহাজ বিল্ডিংয়ে অভিযানে যান। সেখানে পঞ্চম তলায় একটি ফ্ল্যাটের দরজায় নক করার পর ভেতর থেকে কোনো সাড়া-শব্দ আসছিল না। একপর্যায়ে পুলিশ বাধ্য হয়ে দরজায় আঘাত করলে ‘আল্লাহু আকবার’ স্লোগান দিয়ে ভেতর থেকে পুলিশের ওপর হামলা চালানো হয়। এ অবস্থায় খবর দিয়ে থানা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ এনে পুরো বাড়িটি ঘিরে ফেলা হয়। রাত ২টার পর ডিবি, সোয়াত ও র‌্যাবের পাঁচ শতাধিক সদস্য ঘটনাস্থলে যান। এ সময় পুলিশ হ্যান্ড মাইকে ঘোষণা দিয়ে নিরাপত্তার খাতিরে স্থানীয়দের ঘরের ভেতর থাকতে বলে। মাইকিংয়ে জানানো হয়, ‘একটি বাসায় জঙ্গিরা অবস্থান করছে, তাদের ধরতে অভিযান চালানো হচ্ছে।’ মাইকিং শেষে ওই বাসায় ফের অভিযান শুরু করে পুলিশ-র‌্যাব। রাত সাড়ে ৩টার দিকে বাসার ভেতর থেকে গুলির শব্দ শোনা যায়। মাঝে কিছুটা বিরতি দিয়ে ফজরের আজানের পর শুরু হয় প্রচণ্ড গোলাগুলি। গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। এ অবস্থা চলে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে। সকালে ভেতর থেকে গুলির শব্দ থেমে গেলে পুলিশ ও র‌্যাব ওই ফ্ল্যাটে ঢুকে দেখতে পায়, জঙ্গিদের মধ্যে ৯ জনই মারা গেছে। একজন আহত হয়েছে, তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

তবে হাসপাতালের রেজিস্টার অনুযায়ী রাত ৩টা ৩৮ মিনিটে রিগ্যানকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, রাত ২টার পরই আহত রিগ্যানকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ সময় তার হাতে হাতকড়া পরানো ছিল।

মিরপুর থানার ওসি ভূঁইয়া মাহবুব হোসেনের ভাষ্য মতে, জঙ্গিবিরোধী অভিযান শুরুর ঘণ্টা দেড়েক পর রাত ২টার দিকে শীর্ষ কর্মকর্তাদের ডেকে কল্যাণপুরের ৫ নম্বর সড়কে আরো পুলিশ মোতায়েন করতে বলা হয়। অভিযানের শুরুতে পুলিশ চারদিক থেকে ঘেরাও করে ওই ভবনে ঢোকার চেষ্টা করলে পাঁচতলার আস্তানা থেকে কয়েকজন জঙ্গি নেমে এসে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে গুলি ছুড়তে শুরু করে। একপর্যায়ে ভবনটির পেছন দিকে একটি টিনশেড বাড়ির ওপরে দুজন জঙ্গি লাফ দিয়ে পড়ে এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা ছোড়ে। পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। পুলিশের গুলিতে এক জঙ্গি আহত হয়, তাকে আমরা গ্রেপ্তার করি। আরেকজন পালিয়ে যায়।

গতকাল সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জাহাজ বিল্ডিংয়ের প্রতিটি তলায় চারটি করে ইউনিট রয়েছে। দোতলায় বাড়িওয়ালার ছেলে ও তাঁর স্ত্রী-সন্তানরা থাকেন। তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় কয়েকটি পরিবারকে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলায় ব্যাচেলররা মেস করে থাকেন। নিচতলার অর্ধেক গ্যারেজ, আরেক অংশ ব্যাচেলরদের ভাড়া দেওয়া হয়। দুপুরে আলাপকালে বাড়িটির কেয়ারটেকার মোমিন হোসেন জানান, তিনি ১৫ বছর ধরে এ বাড়িতে চাকরি করছেন। তাঁর ভাষ্য মতে, বাড়ির মালিক আতাহার উদ্দিন আহমেদ গুলশান এলাকায় থাকেন। তিনি কাস্টমসের সাবেক কর্মকর্তা। তাঁর দুই মেয়ে, এক ছেলে। ছেলে মাজহারুল ইসলাম জুয়েল আমেরিকাপ্রবাসী। বছরে দু-একবার তিনি দেশে আসেন। তখন স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে দোতলার পশ্চিম পাশে থাকেন। সম্প্রতি তিনি (জুয়েল) দেশে এসেছেন।

মোমিন হোসেন বলেন, ‘কাজে যোগ দেওয়ার পরই দেখি ব্যাচেলরদের ভাড়া দেওয়া হয়। মাঝেমধ্যে ফ্যামিলিও ভাড়া নেয়। তবে কোনো পরিবার ওঠার পাঁচ-ছয় মাস পরই চলে যায়।’ পঞ্চম তলার ওই মেস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, “গত ১২ জুলাই রবিন নামের এক যুবক ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেয়। ভাড়া ঠিক হয় মাসে ছয় হাজার টাকা। সে (রবিন) জানায়, ‘তারা সাতজন থাকবে, সবাই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে।’ ভাড়া দেওয়ার সময় সবার কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র নেওয়া হয়েছে।”

গতকালের অভিযান সম্পর্কে মোমিন হোসেন বলেন, ‘রাত সাড়ে ১২টার পর পুলিশ এসে আমাকে ঘুম থেকে তোলে। তারা বলে, তোমাদের বাসায় অভিযান চালানো হবে। সঙ্গে সঙ্গে আমি জুয়েল আংকেলকে বিষয়টি জানাই। ওই সময় তিনি টিভি দেখছিলেন। পরে অভিযান শুরু হয়। তবে নিহতদের লাশ আমাকে দেখতে দেওয়া হয়নি।’ পুলিশ জানিয়েছে, ব্যাচেলররা মিথ্যা তথ্য দিয়ে বাসাটি ভাড়া নিয়েছিল, তারা আসলে জঙ্গি।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের এক কর্মকর্তার ভাষ্য মতে, জঙ্গিরা মিরপুর বাঙলা কলেজের ছাত্র পরিচয় দিয়ে ওই ভবনে উঠেছিল। ওই বাসা থেকে এ রকম বেশ কিছু ‘ভুয়া আইডি কার্ড’ জব্দ করা হয়েছে। রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের বেশ কিছু বইয়ের পাশাপাশি কয়েক বস্তা জিহাদি বই জব্দ করা হয়েছে।

নিহতদের গায়ে কালো পোশাক : গতকাল সকালে অভিযান শেষ হওয়ার পর বাড়িটি অতিরিক্ত পুলিশ পাহারায় রাখা হয়। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের লোকজন ও পুলিশ বাড়ির ভেতর ঢুকে। পরে পুলিশ কর্মকর্তাদের মোবাইল ফোনে তোলা ছবিতে দেখা যায়, মেঝেতে পড়ে থাকা যুবকদের কারো কারো পরনে ছিল কালো রঙের পাঞ্জাবি-পাজামা। কারো কারো মাথায় পাগড়িও দেখা গেছে। ছবিতে ঘরের ভেতর ও সিঁড়িতে কয়েকটি লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। মেঝেতে রক্ত জমাট বেঁধে ছিল। ঘরের ভেতর আসবাব বিশেষ কিছু নেই। একটি প্লাস্টিকের তাক রয়েছে, তাতে কিছু বই রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে তোশক, বালিশ ও চাদর এবং কয়েকটি ব্যাগ।

অভিযান শেষ হলেও গতকাল সাংবাদিকদের বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তবে দুপুরে এক ফাঁকে কালের কণ্ঠ’র প্রতিবেদক ভেতরে ঢুকে নিচতলার সিঁড়িতে অসংখ্য গুলির খোসা পড়ে থাকতে দেখেন। দোতলা, তিনতলা ও চতুর্থ তলার সিঁড়িতে গুলির খোসা এবং দেয়ালে গুলির চিহ্ন দেখা যায়। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে একজন এসআই জানান, পঞ্চম তলার ওই ফ্ল্যাটের দেয়ালে অনেক গুলির চিহ্ন রয়েছে। জঙ্গিরা আগুন দিয়ে টাকা ও কিছু কাগজপত্র পুড়িয়ে দিয়েছে। অনেকগুলো ব্যাকপ্যাক জব্দ করা হয়েছে।

লাশ ঢাকা মেডিক্যাল মর্গে : গতকাল বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে তিনটি অ্যাম্বুল্যান্সে করে ৯ জনের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। লাশগুলো পুলিশ পাহারা রাখা হয়েছে। সাংবাদিকদের লাশের কাছে ভিড়তে দেওয়া হয়নি। সূত্র জানায়, প্রতিটি লাশের শরীরে অসংখ্য গুলির চিহ্ন রয়েছে। আজ বুধবার ময়নাতদন্ত হবে।

‘আমি আইএস সদস্য’ : আহত রিগ্যানকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তৃতীয় তলার কেবিন ব্লকের ৩৭ নম্বর কেবিনে রাখা হয়েছে। কেবিনের চারপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তার বাম ঊরুতে গুলি লেগেছে, মাথায়ও আঘাত লেগেছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক খাজা আবদুল গফুর বলেন, আপাতত সে (রিগ্যান) বিপদমুক্ত।

গতকাল হাসপাতালে ভর্তির পরপরই রিগ্যান সাংবাদিকদের বলে, ‘আমি আইএসের সদস্য। এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে আমি এ পথে এসেছি। আমি ওই বাসায় রান্নার কাজ করতাম। বাসার বাইরে বের হতাম না।’ সে কথা বলার একপর্যায়ে পুলিশ উপস্থিত সাংবাদিকদের কেবিন থেকে বের করে দেয়।

১১ জন আটক : জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জাহাজ বিল্ডিংয়ের মালিকের ছেলে জুয়েল, তাঁর মা মমতাজ বেগম, জুয়েলের এক চাচাতো ভাই, কেয়ারটেকার মোমিন হোসেন, ষষ্ঠ তলার ব্যাচেলার ভাড়াটিয়া শ্যামলী পলিটেকনিক্যালের ছাত্র আবু সায়েম আশিক, একটি অনলাইন পত্রিকার সাংবাদিক ইকবাল অনিক, কুড়িগ্রামের সাহাবুল, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী কামরুল ইসলামসহ ১১ জনকে আটক করে ডিবিতে নেওয়া হয়।

ডিএমপির মিরপুর ডিভিশনের পুলিশের উপকমিশনার মাসুদ আহম্মেদ জানান, জাহাজ বিল্ডিংয়ের মালিক কখন কাকে বাসা ভাড়া দিতেন, সে ব্যাপারে পুলিশকে কোনো তথ্য দিতেন না। জঙ্গিদের কাছে বাসা ভাড়া দেওয়ার অভিযোগে মালিকের স্ত্রী-ছেলেকে আটক করা হয়েছে।

ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের আটক করা হয়েছে। অযথা হয়রানি করা হবে না। জঙ্গি সম্পৃক্ততা থাকলে গ্রেপ্তার দেখানো হবে।

আইএস নয়, জেএমবি : গতকাল সকালে পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশে বড় ধরনের নাশকতা চালানোর উদ্দেশ্য জঙ্গিরা এই বাসাটিতে অবস্থান করছিল। তারা নিজেদের বলে আইএস। আর আমরা বলছি ওরা জেএমবি। তারা আইএসের ব্যানারে দেশে অরাজকতা চালানোর চেষ্টা করছে। জঙ্গিদের যে প্রকারই হোক নিধন করা হবে।’ তিনি বলেন, তারা (নিহত ৯ জন) গুলশান হামলায় অংশ নেওয়া জঙ্গিদের মতোই কলো পোশাক পরা ছিল।

‘অন্যতম সফল অভিযান’ : গতকালের অভিযানকে ‘ইতিহাসের অন্যতম সফল অভিযান’ বলে অভিহিত করেছেন ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। দুপুরে ডিএমপি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ যা আমরা পেয়েছি, তাতে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে গুলশান হামলায় যারা অংশগ্রহণ করেছিল তারা এবং এরা (কল্যাণপুরে নিহতরা) একই গ্রুপের সদস্য। গুলশানে জঙ্গিদের যে রকম ব্যাকপ্যাক পাওয়া গিয়েছিল, এখানেও সেগুলো পাওয়া গেছে। গুলশান হামলার মতোই বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা নিয়েই কল্যাণপুরে আস্তানা গেড়েছিল ওরা। তারা গুলশান হামলায় জড়িত জঙ্গিগোষ্ঠী দলেরই সদস্য। হামলার ধরন, হামলাকারীদের বয়স, বেশভূষাসহ দুটি ঘটনার মধ্যে তুলনা করে ‘মোটামুটি মিল’ পাওয়া গেছে। এদের সবার বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে, বেশির ভাগই উচ্চশিক্ষিত।”

ডিএমপি কমিশনার বলেন, নিহত জঙ্গিদের পরিচয় সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাদের নাম, ঠিকানা ও পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে। অভিযানের পর ওই মেস থেকে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি পরিচয়পত্র পাওয়া গেছে। সেগুলো আসল কি না যাচাই করে দেখা হচ্ছে। নিহত জঙ্গিদের পরনে কালো পাঞ্জাবি এবং জিন্সের প্যান্ট ছিল। একজন ছাড়া বাকি সবার পায়ে কেডস ছিল।

অভিযান সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সোমবার মধ্যরাতের পর ছয়তলা ওই ভবন ঘেরাও করে অভিযান শুরু হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দিকে শুরুতেই বোমা ও গুলি ছোড়ে জঙ্গিরা। ওই সময় পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। অভিযানের একপর্যায়ে মাইকিং করে জঙ্গিদের আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়। তাদের কথাবার্তা শুনে এবং চেহারা ও বেশভূষা দেখে উচ্চশিক্ষিত বলে মনে হয়েছে। তাদের ব্যাপারে কোনো তথ্যাদি না রাখায় বাড়িওয়ালাকে আটক করা হয়েছে।

দেশবাসীকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর : বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশবাসীকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। গতকাল দুপুরে সচিবালয়ের নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, চলমান জঙ্গিবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে। এ জন্য জনসাধারণের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান সফল হয়েছে। ওই আস্তানায় থাকা জঙ্গিরা দু-এক দিনের মধ্যে বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা করছিল।