হাজরে আসওয়াদে দিনে তিনবার চুম্বনের সুযোগ পাবেন শুধু নারীরা

হজ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরজ ইবাদত। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি। যে সব শর্তের ভিত্তিতে পুরুষের ওপর হজ ফরজ হয়- নারীর জন্য তারচে’ অতিরিক্ত কিছু শর্ত রয়েছে। আবার তাদের জন্য কিছু ছাড়ও রয়েছে যা পুরুষের নেই। আর এসবই করা হয়েছে নারীর সুবিধা, সুরক্ষা ও নিরাপত্তার লক্ষ্যে। এতে নারীকে হেয় করা হয়নি; বরং বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করা হয়েছে।

হজের সময় ফরজ তওয়াফের সময় তো বটেই, এমনকি নফল তওয়াফ করা ও হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করার জন্য নারী-পুরুষের ধাক্কাধাক্কি রীতিমত আঁৎকে উঠার মতো। তার পরও নারীদের হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের কসরত থেকে বিরত রাখা যায় না। নারীদের সেই আকাঙ্খার প্রতি সম্মান জানিয়ে সৌদি আরবের শূরা কাউন্সিল হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের সুবিধার্থে নারীদের জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ করার চিন্তা-ভাবনা করছেন।

হাজরে আসওয়াদ চুমু দেওয়ার জন্য দিনের ৬ ঘন্টা শুধু নারীদের জন্য নির্ধারিত করার প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। ওই ৬ ঘন্টাকে আবার ৩ ভাগে ২ ঘন্টা করে ভাগ করে দিনের তিনটি সময় নির্ধারণ করা হবে। সে হিসেবে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ৬ ঘণ্টা হাজরে আসওয়াদ উন্মুক্ত থাকবে শুধুমাত্র নারীদের জন্য।

সৌদি আরবের শূরা কাউন্সিলের ইসলামি বিষয়ক বিশেষ কমিটির প্রধান ড. মুযি দাগিসারের সিদ্ধান্ত অনুসারে নারীদের সুবিধার্থে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। শীঘ্রই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে এর বাস্তবায়ন শুরু হবে।

সৌদি শূরা কাউন্সিলের সিদ্ধান্তে নারীদের জন্য হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের সাধ ও স্বপ্নপূরণ বেশ সহজ। এতদিন নারী-পুরুষ একসঙ্গে হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের জন্য ভীড় করতো। এরও অবসান হতে যাচ্ছে।

হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর একটি প্রাগৈতিহাসিক ইসলামি নিদর্শন এবং বেহেশতের বহু মূল্যবান বরকতময় উপকরণ। এটি পবিত্র কাবাগৃহের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে প্রায় চার ফুট উঁচু দেয়ালের কিছুটা ভেতরে পোঁতা কালো থালার মতো একটি গোল পাথর। কালো বর্ণের বলে এর নাম রাখা হয়েছে হাজরে আসওয়াদ।

কিন্তু এটা প্রথমে কালো ছিল না; এর রং সম্পূর্ণ সাদা ছিল। ক্রমান্বয়ে এর মাথার রংটুকু কালো হয়ে গেছে; তা-ও হঠাৎ করে নয়। বরং আস্তে আস্তে দীর্ঘদিন ধরে কালো হয়েছে। আদম সন্তানের গুনাহ পাথরটিকে কালো করে দিয়েছে।

মূলত হাজরে আসওয়াদ ছিল রুপার মতো ধবধবে সাদা বেহেশতের একটি ইয়াকুত পাথর। কোনো এক দুর্ঘটনায় তা কয়েকটি টুকরো হয়ে গিয়েছিল। এ টুকরোগুলো মূল্যবান ধাতুর সাহায্যে জোড়া দিয়ে একত্র করা হয়েছে। একটি চাঁদির পাত্রে কাবাগৃহের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে দেয়ালের সঙ্গে এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে, যা দেখলে ও স্পর্শ করলে একটু উঁচু অনুভূত হবে।

হাদিস শরিফে হাজরে আসওয়াদকে বেহেশতি পাথর বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘রোকনে আসওয়াদ অর্থাৎ হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইবরাহিম বেহেশতের দু’টো ইয়াকুত পাথর।’ –সুনানে তিরমিজি

প্রতিবছর হজের সময় হাজিদের অন্যতম কাজ আল্লাহর প্রেমে ব্যাকুল হয়ে পবিত্র কাবাঘর জিয়ারত ও তাওয়াফ করা। হাজরে আসওয়াদ তাওয়াফ শুরুর স্থানে অবস্থিত। প্রথমে এখান থেকেই তাওয়াফ শুরু করতে হয়। কাবাগৃহ তাওয়াফ ও প্রদক্ষিণের সময় হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করা ও চুম্বন করা সুন্নত।

নবী করিম (সা.) হাজরে আসওয়াদে চুমু দিয়েছেন এবং এর ওপর দুই হাত বিছিয়ে দিয়েছিলেন। তাই এতে চুম্বন করার ফজিলত অনেক বেশি। মূলত এই পাথরকে চুমু দেওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য প্রকাশ করা। এই চুমু খাওয়া সুন্নত। পরকালীন কল্যাণ লাভের আশায় মুসলমানেরা এতে চুমু খায়।

নবী করিম (সা.)-এর সুন্নতের অনুসরণে সাহাবায়ে কেরাম হাজরে আসওয়াদকে স্পর্শ ও চুম্বন করেছেন। প্রখ্যাত সাহাবি হজরত উমর ফারুক (রা.) হাজরে আসওয়াদকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘আমি জানি, তুমি একখানা পাথর, তোমার উপকার ও ক্ষতিসাধন করার কোনো ক্ষমতা নেই। যদি আমি হজরত রাসূলুল্লাহকে (সা.) তোমার গায়ে চুমু দিতে না দেখতাম, তাহলে আমি কখনও তোমাকে চুমু দিতাম না।’

হজের মৌসুমে অনেকেই বায়তুল্লাহ শরিফ তাওয়াফের সময় হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের জন্য রীতিমতো যুদ্ধ শুরু করে দেন। এটা ঠিক না। যদি হাজরে আসওয়াদ চুম্বন দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে ডান হাত দিয়ে ইশারা করলেও চলবে। কালো পাথরটির দিকে সম্প্রসারিত করে স্বীয় হস্তে চুম্বন করলেও সুন্নত আদায় হয়ে যাবে এবং আল্লাহতায়ালা হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের অশেষ সওয়াব ও বরকত দান করবেন।

-সৌদি গেজেট অবলম্বনে