৮ম শ্রেণির অনুমোদনে খোলা হয়েছে কলেজ

মমিন হোসেন পড়ে রাজধানীর ব্লু-বার্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে। স্কুল কর্তৃপক্ষ মমিনসহ ৩৯ শিক্ষার্থীর প্রত্যেকের কাছ থেকে এসএসসির ফরম পূরণ বাবদ নিয়েছে আট থেকে ১০ হাজার টাকা করে। মাসে শিক্ষার্থীপ্রতি বেতন নিয়েছে এক হাজার টাকা করে। কোচিংয়ের জন্য নিয়েছে আরো এক হাজার করে। আজ বাদে কাল পরীক্ষা, অথচ এখনো শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও প্রবেশপত্র দেয়নি স্কুল কর্তৃপক্ষ। পরীক্ষার্থীর স্বজনরা ক্যান্টনমেন্টের মাটিকাটা এলাকায় অবস্থিত স্কুলটিতে গেলে কর্তৃপক্ষ বলে, আজ হবে না, কাল আসেন। অবশেষে চেপে ধরার পর জানা গেল, এসএসসি পর্যন্ত পড়ানোরই অনুমতি নেই স্কুলটির। ফরম পূরণের কথা বলে ফি নেওয়া হলেও সেটা আসলে কর্তৃপক্ষ আত্মসাৎ করেছে। আর তাদের প্রতারণার শিকার হয়ে ওই ৩৯ জনের এবার আর পরীক্ষাই দেওয়া হচ্ছে না। আগামী বছরও তারা পরীক্ষায় বসতে পারবে না। কারণ রেজিস্ট্রেশনের কথা বলে নেওয়া টাকাও মেরে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এখন মমিনদের নতুন করে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হতে হবে। মমিনের ভাই শামীম হোসেন গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে প্রবেশপত্রের জন্য ঘুরছি। সকালে গেলে অধ্যক্ষ বলেন, বিকেলে আসেন। বিকেলে গেলে বলেন, রাতে আসেন। রবিবার পুরোটা সময়ই বসে ছিলাম। শেষ পর্যন্ত ফিরে আসতে হয়েছে। আজ (গতকাল) বলছে, একটু ঝামেলা হয়ে গেছে। বোর্ডের ভুলের কারণে সমস্যা হয়েছে। তবে বোর্ডে আমাদের লোক কাজ করছে। পরীক্ষার আগ মুহূর্তে পেয়ে যাবেন।’

তবে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড বলছে ভিন্ন কথা। বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, গত ২৪ জানুয়ারিই তাঁরা স্কুলগুলোতে প্রবেশপত্র বিতরণ সম্পন্ন করেছেন। টুকটাক ঝামেলা ছিল, তা-ও ১ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নিষ্পত্তি হয়েছে। এ মুহূর্তে প্রবেশপত্র ও রেজিস্ট্রেশন কার্ড-সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ তাঁদের হাতে নেই। তাই ওই স্কুলের (ব্লু-বার্ড ইন্টারন্যাশনাল) ৩৯ শিক্ষার্থীর এবার আর পরীক্ষায় বসা হচ্ছে না। তাদের রেজিস্ট্রেশনও হয়নি। আবার নবম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়, ব্লু-বার্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলটি নিম্ন মাধ্যমিক স্কুল হিসেবে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করানোর সাময়িক অনুমতি পায় ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি। এক বছরের জন্য শর্ত সাপেক্ষে অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে নিজস্ব জমিতে স্থানান্তর সাপেক্ষে স্থায়ী অনুমোদন দেওয়ার কথা ছিল। তবে এখন সেই শর্ত মানেনি স্কুলটি। বোর্ড থেকে মৌখিকভাবে বারবার সতর্ক করার পর গত বছরের ১৮ মার্চ চিঠিও দেওয়া হয়েছে। এরপর স্কুল কর্তৃপক্ষ আর যোগাযোগ করছে না।

উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা গতকাল স্কুলের অধ্যক্ষ বাহার উদ্দিনকে প্রায় চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন। অধ্যক্ষ এ সময়ে তাঁর অনুগত এলাকার কিছু লোক নিয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। তবে সেখানে কোনো সুরাহা হয়নি। খবর পেয়ে দুপুরের দিকে ক্যান্টনমেন্ট থানাপুলিশ অধ্যক্ষকে নিয়ে যান। তবে বিকেলের দিকে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের স্কুল পরিদর্শক এ টি এম মইনুল হোসাইন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ স্কুলটির বিষয়ে আগে থেকেই অভিযোগ রয়েছে। আমরা চিঠি দিয়েছি। আর কয়েক দিন দেখব। জবাব না পেলে স্কুলের অনুমোদন বাতিল করা হবে।’

অধ্যক্ষ বাহার উদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রতারণার আরো অভিযোগ রয়েছে। ৯৩/৩ মাটিকাটা এলাকায় অবস্থিত স্কুলটির জমি একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তার। তাঁর কাছ থেকে ভাড়া নিলেও বাহার উদ্দিন এখন নিজেই মালিক সেজে বসে আছেন। সব সময়ই তিনি মাস্তান গোছের কিছু ছেলেকে সঙ্গে রাখেন। মালিককে জমিতে আসতে বাধা দেন। এ ব্যাপারে জমির মালিক ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ও ক্যান্টনমেন্ট থানায় অভিযোগও করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ব্লু-বার্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলটি জুনিয়র হলেও সেখানে কলেজও খোলা হয়েছে। নানা প্রলোভন দেখিয়ে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করা হয়েছে। রমিজউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়, মানিকদি আদর্শ বিদ্যানিকেতন, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলসহ আশপাশের যেসব স্কুলের শিক্ষার্থীরা নবম শ্রেণিতে খারাপ ফলাফল করে তাদের প্রলোভন দেখিয়ে এই স্কুলে নিয়ে আসা হয়। তাদের কাছ থেকে উচ্চহারে ফি নেওয়া হয়। সে টাকায় কয়েক বছরের ব্যবধানে অধ্যক্ষ বাহার উদ্দিন মাটিকাটা এলাকায় একটি বাড়িও করেছেন।

জানা যায়, মমিনসহ যে ৩৯ জন এবার পরীক্ষা দিতে পারছে না তাদের বেশির ভাগই দশম শ্রেণিতে এ স্কুলে ভর্তি হয়েছে। অধ্যক্ষ তাদের অভিভাবকদের বলেছিলেন, ‘ট্রান্সফার প্রক্রিয়ার সব দায়িত্ব আমার।’ এ জন্য মোটা অঙ্কের টাকাও নিয়েছেন তিনি। মাসে এক হাজার টাকা বেতন এবং কোচিং বাবদ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে আরো এক হাজার টাকা করে। এসএসসির ফরম পূরণেও আট থেকে ১০ হাজার করে টাকা নেওয়া হয়েছে।

গতকাল দুপুরের পর থেকে স্কুলটি তালাবদ্ধ ছিল। সরেজমিন গিয়ে দেখা গেল, স্কুলের বাইরে অভিভাবক-শিক্ষার্থীরা অপেক্ষা করছেন। আশপাশে থাকতেন যেসব শিক্ষক তাঁরাও বাসায় তালা মেরে পালিয়েছেন। অপেক্ষারতদের মধ্যে জেসমিন আক্তার নামের এক শিক্ষার্থী শুধুই কাঁদছিল। তার বাবা বাবুল মিয়া বললেন, ‘আমার মেয়ের মতো ৩৯ জন শিক্ষার্থীর জীবন নষ্ট করে দিয়েছে এই প্রতারক (বাহার উদ্দিন)। আমরা তাঁর কঠিন বিচার চাই। আমার মেয়ের দুটি বছর জীবন থেকে নষ্ট করে দিয়েছে। এখন আবার নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে সে পড়ালেখা করতে পারবে কি না এটাই আমার সন্দেহ লাগছে।’

ইভা হোসেন দিপ্তি, আসমা সুলতানা, মিনহাজুল আবেদিন, আশা, প্রমিসহ আরো কয়েকজন শিক্ষার্থীকে পাওয়া গেল। পরীক্ষা দিতে না পারার উৎকণ্ঠায় কুঁকড়ে গেছে তারা। ধরা গলায় আকুতি জানাল, ‘যেকোনো ভাবেই আমরা পরীক্ষা দিতে চাই। আমাদের সহপাঠীরা সবাই এসএসসি পাস করে যাবে। আর আমাদের আবার নবম শ্রেণিতে ভর্তি হতে হবে! এটা কিভাবে মেনে নেব? সরকার যদি বিবেচনা করে আমাদের পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করত তাহলে চিরকৃতজ্ঞ থাকতাম।’

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তপন কুমার সরকার বলেন, ‘নবম শ্রেণিতে এক স্কুলে রেজিস্ট্রেশন করলেও দশম শ্রেণিতে এসে একজন শিক্ষার্থীর অন্য স্কুলে ট্রান্সফারের সুযোগ রয়েছে। বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এ সুযোগ দেওয়া হয়। তবে ট্রান্সফারে বোর্ডের অনুমতি নিতে হবে। কিন্তু ওই স্কুলের তো নবম-দশম শ্রেণির অনুমোদনই নেই, তাই তারা (৩৯ জন) ট্রান্সফারই বা হবে কিভাবে? তার পরও আমরা গত ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রবেশপত্র-সংক্রান্ত নানা ধরনের সমস্যার সমাধান করেছি। কিন্তু ব্লু-বার্ড স্কুলের কেউ কোনো সমস্যা নিয়ে আসেনি। হয়তো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এসএসসির ফরম পূরণের টাকা নেওয়া হলেও তা অধ্যক্ষের পকেটেই রয়ে গেছে। কিন্তু এখন আর ওই শিক্ষার্থীদের জন্য আমাদের কিছুই করার সুযোগ নেই।’

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শ্রীকান্ত কুমার চন্দ বলেন, ‘আমরা খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেব। প্রয়োজনে স্কুলের অনুমোদন বাতিল করা হবে।’

ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি আতিকুর রহমান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অভিভাবকরা অধ্যক্ষকে ঘেরাও করেছে বলে আমরা খবর পাওয়ার পর তাঁকে থানায় নিয়ে আসি। বাহার উদ্দিন শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেওয়ার পর আমরা তাঁকে ছেড়ে দেই। তবে কোনো অভিভাবক যদি থানায় এসে অভিযোগ করে তাহলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। তাঁর (অধ্যক্ষ) নামে আগে থেকেই নানা অভিযোগ রয়েছে। স্কুলের নামে অন্যের জায়গা দখল করে রেখেছে। ভাড়া দেয় না। তিনি ওই এলাকায় সম্প্রতি একটি বাড়িও করেছেন।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ বাহার উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভুল হয়ে গেছে। উপকার করতে গিয়ে ধরা খেয়েছি। আমি অন্য স্কুল থেকে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু রেজিস্ট্রেশন কার্ডসংক্রান্ত ঝামেলার কারণে ফরম পূরণ করতে পারিনি। তবে আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি।’ এখনো কী ফরম পূরণ করা সম্ভব? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বোর্ড থেকে বলেছে, যে স্কুলে রেজিস্ট্রেশন সে স্কুলের নামেই তারা ব্যবস্থা করবেন। তাই বোর্ডের একজনকে ধরে এখনো আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’ কিভাবে এত অল্প সময়ে বাড়ি করলেন, স্কুলের ভাড়া দেন না কেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনার সঙ্গে পরে কথা বলছি।’ এ কথা বলেই ফোনের লাইন কেটে দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.