বিজ্ঞান ও কোরআনের আলোকে ভূমিকম্প

কম্পিত জনপদ, আতঙ্কিত মানুষ। দেশের সবচেয়ে নিরাপদ স্থান সচিবালয় থেকে পড়িমরি করে মানুষ ছুটছে জীবন ভয়ে। একই অবস্থা সারা দেশের, যে যেখানে আছে, ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায়। অফিস-আদালতে কর্মরত ব্যক্তিরা ফাইল-পত্র ফেলে, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানরত শিক্ষক তাঁর ছাত্রদের নিয়ে, দোকানের ব্যবসায়ী তাঁর ক্যাশবাক্স ফেলে, গৃহবধূ রান্নাঘরে উনুনের উপর আধা সেদ্ধ ভাত-তরকারি ফেলে এক নিঃশ্বাসে রাস্তায়! বাঁচার জন্য এ-এক প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। বলছিলাম অতি সম্প্রতি হয়ে যাওয়া ভূমিকম্পের কথা। দীর্ঘ ছয় শ কিলোমিটার দূরে উৎসারিত এ কম্পনের ঝাঁকুনিতে বাংলাদেশে এত মারাত্মক ভীতিকর অবস্থা! আর এর উৎসস্থল নেপালের চারপাশ তো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আশ্চর্য হলো, এ যেন ভূমিকম্পের বিভীষিকা নিয়ে কোরআনের বাণীরই বাস্তব রূপ। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মানব সকল! তোমরা ভয় করো তোমাদের রবকে। নিশ্চয়ই কিয়ামত দিবসের ভূকম্পন হবে একটা মারাত্মক ব্যাপার। যে দিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, স্তন্যদায়ী মা তার দুগ্ধপোষ্য সন্তানের কথা ভুলে যাবে আর সব গর্ভবতীর গর্ভপাত হয়ে যাবে। দৃশ্যত মানুষকে মাতালের মতো দেখাবে, আসলে তারা নেশাগ্রস্ত হবে না। বস্তুত আল্লাহর শাস্তি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ’- (সুরা আল-হজ : ১, ২)। এ দৃশ্য কিয়ামত দিবসের। আজাব হিসেবে ভূমিকম্প এসে অতীতে হজরত সালেহ ও শোয়াইব (আ.)-এর সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে দিয়েছিল। সুরা আরাফের ৭৮, ৯১ ও ৯২ নাম্বার আয়াতে সেসব ঘটনার বিবরণ রয়েছে।

Earthquake-Today-11

ভূমিকম্প কেন হয় : ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে বললে মহান আল্লাহর ইচ্ছাতেই ভূমিকম্পসহ সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বান্দার শাস্তির জন্য অবতীর্ণ হয়। মানুষ যখন অধিক পাপাচার করে, তখন আসমানি শাস্তি নেমে আসে। ইরশাদ হয়েছে, ‘জলে ও স্থলে মানুষের কর্মযজ্ঞের কারণে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। যাতে তারা তাদের কর্মকাণ্ডের কিয়দংশের শাস্তি ভোগ করে’- (সুরা আর রূম : ৪১)। আর ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানীদের মতে, বিভিন্ন কারণে ভূগর্ভে সৃষ্ট চাপ উদ্গীরণের ফলে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। ভূতত্ত্ববিদগণ ভূগর্ভে চাপ সৃষ্টির অনেক কারণ নির্ণয় করেছেন। আসলে আমরা ভূত্বকের উপরি ভাগে তথা ভূপৃষ্ঠে বসবাস করি। আর এই ভূত্বক তার সমগ্র আয়তনসহ কয়েকটা প্লেটের (slab) ওপর স্থাপিত। ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানীদের মতে, প্লেটগুলোর আয়তন কয়েক হাজার বর্গমাইল থেকে কয়েক কোটি বর্গমাইল হতে পারে। এগুলোর মধ্যভাগ অত্যন্ত স্থিতিশীল কিন্তু প্রান্তভাগগুলো খুবই ক্রিয়াশীল। এ যাবৎকালের অনুসন্ধানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্লেট (pacific plate), ইউরেশিয়া প্লেট (Eurasian plate), অস্ট্রেলিয়া প্লেট (Australian plate), উত্তর আমেরিকান প্লেট (North american plate), দক্ষিণ আমেরিকান প্লেট (South  american plate), আফ্রিকা প্লেট (Africa plate), অ্যান্টার্কটিকা প্লেট (Antarctic plate) সহ ছোট বড় ২৭টির সন্ধান পাওয়া গেছে। প্লেটগুলোর অনবরত সঞ্চরণের ফলে এর প্রান্তদেশ ভূগর্ভস্থ তাপ নির্গমনের তথা ভূমিকম্পের কেন্দ্র বা উৎস হিসেবে এ যাবৎকালের অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে। ভূতাত্ত্বিক জরিপ মতে, বাংলাদেশ প্লেটের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত হওয়ার ফলে অদূর ভবিষ্যতে এখানে ভূমিকম্পের উৎস তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে নেপাল ও সিলংয়ে অবস্থিত প্রান্তভাগ কখনো উৎসে পরিণত হলে এ দেশে যে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা আছে, সে আশঙ্কায় ভূতত্ত্ববিদগণ মারাত্মকভাকে শঙ্কিত। ‘প্লেটের অনবরত সঞ্চরণের ফলে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়’- এ তথ্যটিও পবিত্র কোরআনের দেওয়া তথ্যেরই প্রতিধ্বনি। ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা কি দেখে না, আমি ভূপৃষ্ঠকে ক্রমাগত সংকুচিত করে নিয়ে আসছি? আল্লাহই বিধি নির্র্ধারণকারী, তাঁর বিধান পরিবর্তন করার ক্ষমতা কারো নেই। তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী’- (সুরা আর্ রা’দ : ৪১)।

rail-damage

ভূমিকম্প আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা বড় সতর্কসংকেত। অতএব আল্লাহর আজাব থেকে বাঁচতে হলে তাঁর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে, অন্য কোনোভাবে তাঁর শাস্তি থেকে বাঁচার উপায় নেই। কওমে আ’দ, কওমে সামুদ, কওমে লুত, কওমে হুদ শক্তি-প্রতিপত্তিতে অনন্য থাকা সত্ত্বেও তারা আল্লাহর আজাব থেকে রক্ষা পায়নি। আমাদের সমাজে, আমাদের দ্বারা হয় না এমন কোনো পাপ নেই। তাই উপযুক্ততা বিচারে আমরা অত্যন্ত কঠিন শাস্তির যোগ্য। সুতরাং বাঁচার জন্য আল্লাহর দরবারে তওবা করে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে একনিষ্ঠভাবে। মহান আল্লাহ সে আহ্বানই জানিয়েছেন আমাদের। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে একনিষ্ঠভাবে তওবা করো- (সুরা আত্-তাহরীম : ৮)।

লেখক : পেশ ইমাম ও খতিব, রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.