প্রথম ১০০ দিনে বাইডেনের অর্জন কী?কি বলছে জরিপ

প্রেসিডেন্ট পদে জো বাইডেনের প্রথম ১০০দিনে তার অর্জনের ঝুলি অর্ধেক ভর্তি হয়েছে এবং অর্ধেক খালি রয়েছে। এক অর্থে বলা যায় তিনি ভালোই করছেন। তিনি ও তার মিত্ররা কংগ্রেসে করোনাভাইরাস মোকাবেলার জন্য একটি থোক আর্থিক প্রস্তাব পাস করিয়েছেন। দ্বিতীয় আরেকটি বিশাল অর্থ তহবিল পাস করানোর কাজেও অগ্রগতি হচ্ছে। এটি কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যয়বরাদ্দ যেটি বাইডেন প্রশাসন সার্বিকভাবে ব্যাখ্যা করছে ‘অবকাঠামো’ খাতের ব্যয় হিসেবে।

জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকার গরিষ্ঠসংখ্যক জনগণ বাইডেনকে সমর্থন করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রেসিডেন্ট মেয়াদে এই সময় যেখানে ছিলেন তার থেকে অনেকটা এগিয়ে আছেন জো বাইডেন। বাইডেনকে তার ক্যাবিনেটের শীর্ষ পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বড়ধরনের কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। বিচার বিভাগেও তিনি খুব বেশি নতুন মুখ আনেননি।

অনেক আমেরিকানই প্রশাসনিক কাজকর্ম তিনি যেভাবে স্থিরতার সাথে কিন্তু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য রেখে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সেটা পছন্দ করছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট মেয়াদে অবিরত যে নাটকীয় পরিস্থিতি দেখা গেছে, তার পর বাইডেনের ধীরস্থির প্রশাসনিক স্টাইলে অনেকেই স্বস্তিবোধ করছেন। তবে আমেরিকান প্রেসিডেন্টদের পারফরমেন্সের ইতিহাস দেখলে বাইডেনের জনপ্রিয়তার মাপকাঠি কিন্তু নিচের দিকে, যেটা তার অর্জনের ঝুলিতে একটা নেতিবাচক দিক।

তিনি দুই দলের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার এবং ‘এই গৃহযুদ্ধের’ অবসান ঘটানোর কথা বলেছিলেন। কিন্তু তিনি যেসব আইন প্রণয়ন করতে চাইছেন, তাতে এখনও কংগ্রেসের রিপাবিলকান সদস্যদের সমর্থন তিনি পাননি। তার অভিবাসন নীতির বাস্তবায়ন হয়েছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এবং ডান ও বাম দুদিক থেকেই তিনি সমালোচনার শিকার হয়েছেন। স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং বন্দুক নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলোতে তার নীতি কতটা সাফল্য আনতে পারবে – তা এখনও অনিশ্চিত।

বাইডেন প্রশাসন মাত্র তার যাত্রা শুরু করেছে। তবে ক্ষমতা গ্রহণের ১০০ দিন পর প্রেসিডেন্ট কোথায় দাঁড়িয়ে, চাপের মুখে তার নতুন প্রশাসন কী অর্জন করতে পারল, তার একটা মূল্যায়ন করার রীতি অনেক দিনের পুরনো। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্রে তার অর্জনের একটা খতিয়ান।

করোনাভাইরাস

প্রথম ১০০ দিনে তার সাফল্য ও ব্যর্থতার খতিয়ান দেখতে গেলে যে বিষয়টা বিচারের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাওয়া দরকার – সেটা হলো করোনাভাইরাস মহামারি তিনি কীভাবে মোকাবেলা করেছেন। বাইডেন যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন কভিড-১৯ থেকে আমেরিকানদের মৃত্যুর হার প্রায় প্রতিদিনই ছিল ৩০০০ করে। এখন মৃত্যু হার সাত দিনের গড় হিসাবে দিনে ৭০৭ এবং এই সংখ্যা কমছে। এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ তার প্রশাসনের নেওয়া ভ্যাকসিন কর্মসূচি।

বাইডেন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ক্ষমতা হাতে নেওয়ার প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে তিনি দশ কোটি ডোজ টিকা দেবেন। প্রথম একশ দিনে আমেরিকা সেই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এখন বিশ কোটি ডোজের বেশি টিকা প্রদান করা হয়েছে। আমেরিকার প্রাপ্ত বয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৫২% এরই মধ্যেই অন্তত এক ডোজ ভ্যাকসিন পেয়েছেন।

তিনি যখন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন, টিকা বিতরণের বিষয়টি ছিল বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে। ট্রাম্পের শাসনামলে টেস্টিং এবং পিপিই বিতরণের ক্ষেত্রে সমন্বয়ের ব্যাপারে অনেক সমস্যা ছিল। ডেমোক্র্যাট প্রশাসন কভিড মোকাবেলায় অতিরিক্ত অর্থ বিল পাস করিয়ে তহবিল বাড়িয়েছে এবং কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয়ের ব্যবস্থা নিয়ে টিকাদান কর্মসূচিতে গতি সঞ্চার করেছে।

এখন বাইডেন প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ – টিকা নিতে অনাগ্রহী আমেরিকানদের ভ্যাকসিন নিতে উদ্বুদ্ধ করা এবং কভিড মহামারি ধাক্কা কাটিয়ে ওঠা।

অর্থনীতি

কভিডের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ছিল বাইডেনের প্রথম অগ্রাধিকার। কিন্তু মহামারির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার তার প্রেসিডেন্সির দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি যখন ক্ষমতা হাতে নেন তখন ২০২০ এর লকডাউনের কারণে আমেরিকার অর্থনীতি ব্যাপকভাবে সঙ্কুচিত হয়েছিল। গোড়া থেকেই তার প্রশাসন এবং কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা প্রবৃদ্ধি চাঙ্গা করার লক্ষ্যে বিশাল অঙ্কের সরকারি তহবিল অনুমোদন করেছে।

ফেব্রুয়ারি মাসে যে ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলারের সাহায্য প্যাকেজ পাস করা হয় তার আওতাভুক্ত ছিল বহু আমেরিকানের জন্য সরাসরি অর্থ সাহায্য, বাড়তি বেকার ভাতা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও রাজ্য সরকারগুলোর জন্য অর্থ তহবিল। এছাড়া শিশুদের জন্য যে সহায়তা প্যাকেজ দেয়া হয়েছে, অনুমান করা হচ্ছে তা আমেরিকায় তরুণদের মধ্যে দারিদ্রের হার অর্ধেকে নামিয়ে আনবে।

অর্থনীতিবিদরা আভাস দিয়েছেন যে ২০২১ সালে আমেরিকার প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬%। ১৯৮০ দশকের পর প্রবৃদ্ধির এত নিম্ন হার দেখা যায়নি। মহামারির দীর্ঘ মেয়াদী অর্থনৈতিক প্রভাব বাইডেনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তবে এই মুহূর্তে বেকারত্ব কমছে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো আবার খুলতে শুরু করেছে এবং শেয়ার বাজার চাঙ্গা হচ্ছে। সেটা আপাতত প্রেসিডেন্টের জন্য স্বস্তির খবর।

অভিবাসন

অভিবাসনের ক্ষেত্রে বাইডেন বড়ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন। মধ্য আমেরিকা থেকে আসা শরণার্থীদের পুর্নবাসন সংক্রান্ত ইস্যুগুলো নিয়ে অনেক জটিলতা এখনও রয়ে গেছে। সীমান্ত দিয়ে শরণার্থীদের ঢোকার ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসনের সময় যেসব কঠোর আইনকানুনগুলো ছিল বাইডেন তার অনেকগুলোই কিছু অংশে শিথিল করলেও অভিবাসন আন্দোলনকারীরা সেগুলো যথেষ্ট বলে মনে করছেন না।

অভিবাসীদের অনুপ্রবেশের হার যদি না কমে এবং এর ফলে সীমান্ত এলাকাগুলোর মানুষদের জন্য যদি সমস্যা সৃষ্টি হয়, সেটা খবরের শিরোনাম হবে এবং তখন সেটা বাইডেন প্রশাসনের জন্য বড়ধরনের রাজনৈতিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

পরিবেশ

বাইডেন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে তার প্রচারাভিযান চালানোর সময় থেকেই পরিবেশ রক্ষা নিয়ে সরব ছিলেন। তার প্রচারণা যতই গতি পেয়েছে ততই তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবেলার ব্যাপারে সোচ্চার হয়েছেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি পরিবেশ সংক্রান্ত নীতি সংস্কারে উদ্যোগী হয়েছেন।

তিনি দ্রুত প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে আমেরিকাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন, কিস্টোন এক্সএল তেলের পাইপলাইন নির্মাণের কাজ বাতিল করে দিয়েছেন এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সময় বন্ধ হয়ে যাওয়া কিছু কিছু আইনবিধি আবার ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।

গত সপ্তাহে তিনি আমেরিকার কার্বন নির্গমনের মাত্রা ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০% কমিয়ে ২০০৫ সালের চেয়েও তা কমনোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার আন্তর্জাতিক ‘জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন’-এ কাজের চেয়ে হয়ত কথা হয়েছে বেশি, কিন্তু বাইডেন যে ২ ট্রিলিয়ন ডলার অবকাঠামো উন্নয়ন বাজেট পাসের প্রস্তাব দিয়েছেন তাতে দূষণ-মুক্তভাবে জ্বালানি উৎপাদন, বিদ্যুতচালিত গাড়ির জন্য সহায়তা, জলবায়ু গবেষণা খাতে অর্থ সাহায্য ও জীবাশ্ম জ্বালানির ক্ষেত্রগুলো দূষণমুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

পররাষ্ট্র নীতি

বাইডেন তার প্রেসিডেন্ট মেয়াদ শুরুর সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আমেরিকাকে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা প্রথম’ এই পররাষ্ট্র নীতি থেকে সরিয়ে আনবেন। ক্ষমতার প্রথম ১০০ দিনে বাইডেনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো আফগানিস্তান থেকে আমেরিকান সৈন্য প্রত্যাহারের চূড়ান্ত পর্যায় নিশ্চিত করা। তবে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট মেয়াদকালেই।

ট্রাম্প ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তি থেকে আমেরিকাকে প্রত্যাহার করে নেবার পর সেই চুক্তিতে ফেরত যাবার জন্য আলোচনার প্রক্রিয়া বাইডেন তেমন দ্রুততার সাথে শুরু করতে পারেননি। এখানেও তিনি খুব বড় কোনো চমক এখনও পর্যন্ত দেখাতে পারেননি।

বাইডেন তার পূর্বসুরীর তুলনায় রাশিয়ার প্রতি আরো কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি ব্যাংকের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন, যা জোরদার করা হলে রাশিয়ার ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দল চীনা প্রতিনিধিদের সাথে মানবাধিকার লংঘন নিয়ে বাকযুদ্ধে জড়িয়েছে। বাইডেন প্রশাসন আমেরিকার মিত্র দেশগুলোর সাথে একজোট হয়ে স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলোকে মোকাবেলার লক্ষ্যে একটা জোটবদ্ধ উদ্যোগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

তবে পররাষ্ট্র নীতির দিক দিয়ে বাইডেনের প্রথম ১০০ দিন মূলত কথা, পর্যালোচনা এবং মূল্যায়নের পর্যায়ে রয়ে গেছে। সেখানে নতুন কোনো নীতি গ্রহণের উদ্যোগ দেখা যায়নি।

বাণিজ্য

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট মেয়াদের আগে আমেরিকায় বাণিজ্যের ব্যাপারে দুই দলের নেতারাই প্রাধান্য দিয়েছেন মুক্ত বাণিজ্যকে এবং তারা বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক চুক্তিভিত্তিক বাণিজ্যকে মুক্ত বাজার ব্যবস্থা ও বাণিজ্য বৃদ্ধির পথ হিসেবে দেখেছেন।

কিন্তু ট্রাম্প তার শাসনামলে সেই ধারা বদলে দিয়েছিলেন। তিনি জোর দিয়েছিলেন শুল্ক ব্যবহারের ওপর এবং আমেরিকার বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় তিনি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপকে উৎসাহিত করেছেন।

প্রবীণ রাজনীতিক বাইডেন তার প্রথম ১০০ দিনে ট্রাম্পের আনা পরিবর্তনগুলো বদলানোর খুব একটা উদ্যোগ নেননি। চীনের ওপর শুল্ক তিনি বজায় রেখেছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে অ্যালুমিনিয়ম বাণিজ্যে তিনি আবার শুল্ক বসিয়েছেন।

ইউরোপিয় ইউনিয়ন এবং ব্রিটেনের ক্ষেত্রে তিনি কিছু কিছু শুল্ক শিথিল করেছেন বটে, কিন্তু বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় শুল্ক ব্যবহারের ট্রাম্প নীতি থেকে সরে আসার ব্যাপারে তার কোন আগ্রহ অন্তত প্রথম ১০০ দিনে তিনি দেখাননি।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।