অবশেষে কওমি সনদের স্বীকৃতি এ বছরেই ইনশা-আল্লাহ – সমন্বয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী !

শেষমেশ আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে কওমি মাদ্রাসা সনদের সরকারি স্বীকৃতি প্রদানের কার্যক্রম। চলতি বছরের মধ্যেই এই কার্যক্রম একটি ফলপ্রসূ জায়গায় পৌঁছাবে বলে আশা করছেন আলেমরা। সরকারি স্বীকৃতির বিষয়টি দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল কয়েক দফায় আলেমদের সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণার পর বিভক্ত আলেমদের ঐক্যমতে আনতে তার উদ্যোগেই এই কার্যক্রম আগের চেয়ে জোরালো হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কওমি সনদ স্বীকৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত আলেমদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কমিশনের সদস্য সচিব মাওলানা রুহুল আমীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর আশাবাদী। এ বছরেই স্বীকৃতির বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে যাবে।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বীকৃতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সনদ দিতে হলে ন্যূনতম একটি কারিক্যুলাম দরকার। আমরা কওমি মাদ্রাসা কমিশন গঠন করে দিয়েছি।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উনাদের নিয়ে আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও দেখা করেছি।’ তিনি বলেছেন, ‘মেজরিটি এক হয়ে আসলেই স্বীকৃতি দেওয়া হবে। আমি আশাবাদী, এবার তারা মেজরিটি হবেন এবং এ বছরের মধ্যেই স্বীকৃতির বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ‘আলেমরা নিজেদের মধ্যেও বসছেন,আলোচনা করছেন। আমি আশাবাদী।’

মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসঊদ বলেছেন, ‘ঈদুল আজহার পরই কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা সনদের স্বীকৃতি আসছে।’ তার প্রচার বিভাগের দায়িত্বে থাকা মাওলানা মাসঊদুল কাদির স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে মাওলানা মাসঊদ বলেছেন, ‘আমরা যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি। ইনশাআল্লাহ খুব শিগগিরই কওমি স্বকীয়তা বজায় রেখেই স্বীকৃতি আসবে।’

গত ১১ আগস্ট বাংলাদেশ জমিয়াতুল উলামা আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা দেওয়ার পরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আলেমদের সঙ্গে কথা বলার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর তিনি বেফাকসহ কয়েকজন আলেমের সঙ্গে বৈঠক করেন। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার মাওলানা রুহুল আমীনের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। ওই সাক্ষাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সনদের স্বীকৃতি তার নিয়ে আলাপ হয়। এর আগে গত মাসের শেষ দিকে মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসঊদ এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে কথা বলেছেন।

মাওলানা মাসঊদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্বীকৃতির জন্যই তো কাজ করছি। গত কয়েক বছর ধরে শিক্ষক-ছাত্ররা চাইছেন। এখন এটি নিয়ে জনমত গঠনের কাজ চলছে। সবাইকে এক হতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জমিয়তুল উলামার সম্মেলনে বলেছেন, ‘আমি মনে করি, সময়টা আমরা বাড়িয়ে দিয়ে যদি আরও কিছু সদস্য নিতে হয়, তাদেরকে নিয়ে এই কাজটা খুব দ্রুত করা দরকার। আমি খুব তাড়াতাড়ি এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেব, আমাদের ধর্মমন্ত্রীও এখানে আছেন, আমি তাকে বলবো এই উদ্যোগটা নিতে।’

২০১২ সালের এপ্রিলে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, শিক্ষাদানের বিষয় এবং কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা সনদের সরকারি স্বীকৃতির লক্ষ্যে সুপারিশ প্রণয়নে ‘বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কমিশন’ গঠিত হয়। ওই কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন মাওলানা শফী, কো-চেয়ারম্যান ছিলেন ফরিদ উদ্দিন মাসঊদ এবং সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন মাওলানা রুহুল আমিন।

মাওলানা রুহুল আমিন জানান, ‘কমিশন পুরো সিলেবাস প্রণয়ন করে এবং সুপারিশ করে। এর ভিত্তিতে মন্ত্রিসভায় যেদিন বিষয়টি ওঠার কথা, এর আগের দিন শফী সাহেব লাখ লাখ লাশ পড়ার হুমকি দিয়েছিলেন। এ কারণেই থমকে যায় সনদ কার্যক্রম। তবে এবার আর ওই রকম হুমকি আসবে না বলে মনে হয়।’

এদিকে কওমি সনদের স্বীকৃতির বিষয়ে সবচেয়ে বড় বাধা ধরা হয় বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বেফাককে। এই বোর্ডের মহাসচিব আবদুল জব্বার সাবেক শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে সোচ্চার। এরই মধ্যে বাংলা ট্রিবিউনের এ প্রতিবেদককে তিনি পরিষ্কারভাবেই বলেছেন, ‘মাওলানা ফরিদ উদ্দিন ও রুহুল আমিনের সঙ্গে বেশি আলেম নেই। স্বীকৃতি দিলে তার বেফাকের অধীনেই দিতে হবে।’

যদিও দেশের আরও একটি শীর্ষ কওমি বোর্ড ‘সম্মিলিত কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড’ স্বীকৃতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বসুন্ধরায় আয়োজিত এই বোর্ডের সভায় আলেমরা দাবি করেন, ২০১২ সালে গঠিত শিক্ষা কমিশনের প্রস্তাবের আলোকেই স্বীকৃতি দিতে হবে।

তবে বেফাক মনে করছে, যে সরকার শিক্ষা আইন করছে, সে সরকার কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি দেবে, এমনটি সন্দেহজনক। জামিয়া রাহমানিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও বেফাকের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মাহফুযূল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সারা দেশে আলেম ও মাদ্রাসাগুলো আওয়ামী লীগ ও প্রশাসনের হয়রানির বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। আবার সরকার শিক্ষা আইন পাশ করেছে। তো পরিকল্পনা বুঝতে পারছি, বস্তুত সরকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। স্বীকৃতির মূল লক্ষ্য নিয়ন্ত্রণ করা কিনা,এ নিয়ে সন্দেহ আছে আমাদের।’

শিক্ষা কমিশনের বিষয়ে মাওলানা মাহফুযূল হক বলেন, ‘২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, ধর্মমন্ত্রী ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজিকে নিয়ে মাওলানা ফরিদ উদ্দিন ও মাওলানা রুহুল আমীনকে ডেকে স্বীকৃতির কথা বললেন। তো প্রকৃত প্রতিনিধিত্বশীল আলেমদের না রেখে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হওয়ায় আমাদের সন্দেহ আছে।’

বেফাকের বাধার বিষয়ে রুহুল আমীন বলেন, ‘যারা ইসলামী দল করেন, তারা ছাত্রদের ওপর প্রভাব হারাবেন, এমন আশঙ্কা থেকেই স্বীকৃতির বিরোধিতা করতে পারেন।’

আলেমদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বীকৃতির দাবিতে রুহুল আমীন সমর্থক আলেম-শিক্ষার্থীরা ২০১৩ সালেই স্বীকৃতি বাস্তবায়ন কমিটি করেছিল। এবার ফরীদ উদ্দিন মাসঊদের সমর্থকরাও ১৮ আগস্ট ‘কওমি শিক্ষাসনদ স্বীকৃতি বাস্তবায়ন পরিষদ’ গঠন করে বিভিন্ন মাদ্রাসায় কাজ শুরু করে।

এ নিয়ে মাওলানা রুহুল আমীন বলেন, ‘সরকার যদি জোর করে দিতে চায়, তাহলে লাখ লাখ লাশ পড়ার হুমকিতে কিছু আসে যায় না। কিন্তু সরকার আন্তরিক। প্রধানমন্ত্রী চান যে, আলেমরা ঐক্যবদ্ধভাবে স্বীকৃতি নিয়ে কাজ করুক।’  তিনি বলেন, ‘কমিশন দারুল উলুম দেওবন্দের উসূলে হাশতে গানার শর্তেই প্রস্তাব দেয়। আমরা এটার বাস্তবায়ন চাই। আল্লামা শফী আমাদের মুরব্বি। উনি স্বীকৃতির পক্ষে। স্বীকৃতি উনিও চান।’

 কাদের নিয়ে হচ্ছে কমিশন ও কর্তৃপক্ষ

সরকারের ঘনিষ্ট দুজন আলেম জানান, সাবেক কমিশনের মতো নতুন কর্তৃপক্ষ হলেও আল্লামা শফীকেই চেয়ারম্যান দেখতে চান তারা। এ নিয়ে সরকারের সবুজ সংকেত আছে। এ পদে আসতে যাত্রাবাড়ি মাদ্রাসার মাহমুদুল হাসানও সক্রিয় হয়েছেন বলে তার অনুসারী এক আলেম জানান।

সদস্য সচিব হিসেবে আসতে পারেন মাওলানা রুহুল আমীন। তবে এ পদে আসতে চান বেফাকের মহাসচিব আবদুল জব্বার। তবে শেষ পর্যন্ত জব্বার টিকবেন না বলেও জানা গেছে সরকারের ঘনিষ্ঠ এক সূত্রের বরাতে। জানতে চাইলে রুহুল আমীন বলেন, ‘এ বিষয়ে মন্তব্য করবো না।’

কো-চেয়ারম্যান হিসেবে মাওলানা ফরিদকেই পছন্দ অনেকের। তবে লালবাগ মাদ্রাসার প্রভাবশালী এক আলেম জানান, অনেক আলেম তাকে পছন্দ করেন না। যদিও লাখো আলেমের ফতোয়া প্রকাশ করে তিনি ইতোমধ্যে আলোচিত হয়েছেন।  তার ভাষ্য, ‘কোনও পদ নয়। স্বীকৃতিটাই বাস্তবায়ন হোক।’