ইব্রাহীম (আঃ) ও নমরুদের ঘটনা এবং তা থেকে শিক্ষা

হযরত ইব্রাহীম (আ:) বাদশাহ নমরুদের রাজত্বকালে ইরাকের বাবেল (বাগদাদ) শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল আযর। তিনি দেশের প্রধান পুরোহিত ছিলেন।
বাবেল শহরে তখন মূর্তি ও তারকা (চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ) পূজার প্রচলন ছিল।
বয়োপ্রাপ্ত হয়ে ইব্রাহিম (আ:) মূর্তি ও তারকা পূজার বিরোধিতা করলেন। তিনি মূর্তি ও তারকা পূজারীদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হলেন।
তিনি মূর্তি পূজারীদের বললেন, “তোমরা কেন মূর্তিপূজা কর? তোমরা আহবান করলে তারা কী শোনে? তারা তোমাদের কোন উপকার বা ক্ষতি করতে পারে কী? তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের উপাসনা করছ, তারা তোমাদের রিজিকের মালিক না। তাই তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।”
মূর্তি পূজারীরা ইব্রাহীম (আ:) -এর শক্তিশালী যুক্তি খন্ডন করতে পারল না। তারা শুধু বলল, “আমাদের বাপ-দাদারা মূর্তিপূজা করত। তাই আমরাও করি।”
মূর্তি পূজারীদের সাথে বিতর্ক করার পর, ইব্রাহীম (আ:) তারকা পূজারীদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হলেন। তিনি তারকা পূজারীদের বললেন, “সূর্য কিভাবে তোমাদের উপাস্য হতে পারে? সে তো একটি নির্দিষ্ট সময় শেষে ডুবে যায়। আর চন্দ্র ও আকাশের তারাও তোমাদের উপাস্য হতে পারে না। কারণ- একটি নির্দিষ্ট সময় শেষে তারাও সূর্যের মতো হারিয়ে যায়। আমার প্রশ্ন হল, যারা নিজেরাই ডুবে যায় বা হারিয়ে যায়, তারা তোমাদেরকে কিভাবে রক্ষা করবে? অতএব, তোমরা এসব তারকার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর প্রতি ঈমান আন।”
তারকা পূজারীরা ইব্রাহীম (আ:)-এর উপদেশ এক কান দিয়ে শ্রবন করল এবং অন্য কান দিয়ে বের করে দিল। তারা ঈমান আনল না।
আসলে মানুষ যখন কোন কিছুর প্রতি অন্ধভক্তি পোষণ করে, তখন শত চেষ্টা করেও তাদেরকে সুপথে ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই ইব্রাহীম (আ:) ভাবলেন, এমন কিছু করতে হবে যেন পূজারীরা নিজেদের ভুল বুঝতে পারে। তিনি দেশের প্রধান মন্দিরের মূর্তিগুলো ভেঙ্গে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলেন।

যেমন ভাবা, তেমন কাজ। ইব্রাহীম (আ:) দেশের প্রধান মন্দিরে ঢুকে সবগুলো মূর্তি ভেঙ্গে ফেললেন।
পরে পূজারীরা মন্দিরে ঢুকে তাদের মিথ্যা উপাস্যদের অসহায়ত্বের বাস্তব দৃশ্য দেখতে পেল। তারা অত্যন্ত রাগান্বিত হল এবং বাদশাহ নমরুদের দরবারে ইব্রাহীম (আ:)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করল।
বাদশাহ নমরুদ ইব্রাহীম (আ:)-কে রাজদরবারে ডেকে পাঠালেন। ইব্রাহীম (আ:) হাজির হলে বাদশাহ নমরুদ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইব্রাহীম, তোমার উপাস্য কে?”
ইব্রাহীম (আ:) উত্তর দিলেন, “আমার উপাস্য আল্লাহ, যিনি জীবন ও মৃত্যু দান করেন।”
মোটাবুদ্ধির নমরুদ বললেন, “আমিও তো জীবন ও মৃত্যু দান করি! আমি মানুষকে মেরে ফেলতে পারি, আবার মানুষকে না মেরে জীবনও দান করতে পারি!”
ইব্রাহীম (আ:) বললেন, “আমার আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন। আপনি সূর্যকে পশ্চিম দিক থেকে উদিত করতে পারবেন?”
যুক্তিতর্কে হেরে গিয়ে অহংকারী বাদশাহ নমরুদ ইব্রাহীম (আ:)-কে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার হুকুম জারি করলেন।
অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করার আগে ইব্রাহীম (আ:) বললেন, “আমার জন্য আল্লাহ’ই যথেষ্ট। নি:সন্দেহে তিনি উত্তম তত্ত্বাবধায়ক।”
আল্লাহর নির্দেশে তৎক্ষণাৎ আগুন ঠান্ডা হয়ে গেল এবং ইব্রাহীম (আ:) মুক্তি পেলেন।
অত:পর ইব্রাহিম (আ:) তার স্ত্রী সারা ও ভাতিজা লুত (আ:) কে সাথে নিয়ে কেনানে (একটি শহরের নাম) হিজরত করলেন।
আমাদের পিতা ইব্রাহীম (আ:) ও অন্যান্য নবীগণ সারাজীবন মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন। এ কারণে তারা দেশ থেকে পর্যন্ত বিতাড়িত হয়েছেন।
অত্যন্ত দু:খের বিষয় হলেও সত্য যে, আমাদের মুসলিম সমাজে এখনো মূর্তিপূজা বিদ্যমান। মুসলিমরা পীর-আউলিয়াদের মাজার পূজা করে, শ্রদ্ধা প্রদর্শনের নামে শহীদ ও বুদ্ধিজীবীদের কবর বা মূর্তিতে ফুল দেয়, যা মূর্তিপূজার চেয়ে বেশী জঘন্য।
মহান আল্লাহ পথভ্রষ্ট মুসলিম জাতিকে হেদায়েত দিন, এই প্রার্থনাই করি।।