যমুনার ১০ চরে ১১ ঘণ্টার অভিযান

বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলার যমুনা নদীর দুর্গম ১০টি চরে জঙ্গিবিরোধী ব্যাপক অভিযান চালানো হয়েছে। র‌্যাব, বিজিবি ও পুলিশের ছয় শতাধিক সদস্য গত রবিবার ভোর ৪টা থেকে গতকাল সোমবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত অভিযান চালান।

তবে ১১ ঘণ্টার অভিযানে কোনো জঙ্গি সদস্যকে আটক করতে পারেননি তাঁরা। উদ্ধার হয়নি কোনো আগ্নেয়াস্ত্র। অভিযান শেষে র‌্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এসব চরে জঙ্গি আস্তানা ও তাদের প্রশিক্ষণ শিবিরের একাধিক স্থান চিহ্নিত হয়েছে। অভিযানকালে একটি পরিত্যক্ত ঘর থেকে ৯টি জিহাদি বই, তিনটি চাপাতি, তিনটি ছুরি ও এক কয়েল ইলেকট্রিক তার জব্দ করা হয়েছে। গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর এই প্রথম জঙ্গিবিরোধী এত বড় অভিযান চালানো হলো।

অভিযান শেষে গতকাল বিকেলে সারিয়াকান্দির কাজলা ইউনিয়নের দক্ষিণ টেংরাকুড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে র‌্যাব। সেখানে র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি শোলাকিয়ায় হামলার ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার শফিউলকে সারিয়াকান্দিতে জঙ্গি আস্তানায় প্রশিক্ষণ দিতে আনা হয়েছিল। শফিউলকে বোটে করে দুর্গম চর কাজলার জামথৌল ঘাট হয়ে টেংরাকুড়া এলাকায় নেওয়া হয় এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে শোলাকিয়ায় হামলার জন্য পাঠানো হয়। র‌্যাবের কাছে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে কিছু সরঞ্জাম পাওয়া গেছে যা থেকে বোঝা যায়, এটি জঙ্গি আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। অভিযানের খবর পেয়ে জঙ্গিরা আস্তানা গুটিয়ে চলে গেছে।’

বেনজীর আহমেদ ঢাকা থেকে সড়কপথে গতকাল বিকেলে টেংরাকুড়ায় পৌঁছেন। অভিযান সফল দাবি করে তিনি জঙ্গি ও সন্ত্রাস দমনে জনগণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি ঘোষণা দেন, জঙ্গি দলের কোনো সদস্য ফিরে এসে তার দলের বিষয়ে তথ্য দিলে, জঙ্গি সদস্যদের ধরিয়ে দিতে সহযোগিতা করলে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও তার পরিবারের নিরাপত্তা দেবে র‌্যাব। আর সাধারণ মানুষ জঙ্গিদের ব্যাপারে সঠিক তথ্য দিলে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। গতকাল সকাল থেকেই বগুড়াসহ সারা দেশে অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়ে। বগুড়া থেকে সাংবাদিকরা দুপুর ১২টায় টেংরাকুড়ায় পৌঁছলে র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা তাঁদের কাছে দাবি করেন, বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ করে নিশ্চিত হওয়া যাবে তাদের মধ্যে কে জড়িত আর কে জড়িত নয়।

তবে বিকেলে র‌্যাবের প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় আটকের আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষে র‌্যাবের মহাপরিচালক সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন করারও সুযোগ দেননি। অভিযানে অংশ নেওয়া বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুজ্জামান ফারুকি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ধুনট ও সারিয়াকান্দিতে অভিযান চালানোর কথা বলে র‌্যাব আমাদের কাছে ফোর্স চেয়েছিল। আমরা ২০০ জন পুলিশ সদস্য দিয়েছি।’

কাজলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাশেদ সরকার জানান, অভিযানের ব্যাপারে আগে থেকে তিনি কিছু জানতেন না। শেষ মুহৃর্তে তাঁর সহযোগিতা চাওয়া হয়। তিনি সাধ্যমতো সহযোগিতা করেছেন। তবে বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেছেন, ‘অভিযানে প্রশিক্ষণকেন্দ্র বা ব্যাপক কিছু পাওয়া যায়নি। চরে একটা কলাবাগান আছে, সেখান থেকে চারটি চাপাতি, তিনটি চাকু এবং কিছু জিহাদি বই পাওয়া গেছে।’ যমুনার দুর্গম চর টেংরাকুড়া। কাজলা ইউনিয়নের মধ্যে হলেও সারিয়াকান্দি সদর থেকে কালিতলা পর্যন্ত সড়কপথে গিয়ে তারপর নদীপথে প্রায় দুই ঘণ্টায় ১৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সেখানে যেতে হয়। তবে টেংরাকুড়ার সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা ভালো জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার। সেখান থেকে মাদারগঞ্জের দূরত্ব মাত্র ছয় কিলোমিটার। সড়কপথে গাড়ি নিয়ে সেখানে যাওয়া যায়।

অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া র‌্যাব-১২-এর অধিনায়ক শাহাবুদ্দিন খান জানান, রবিবার রাত ১২টার পর ফোর্সের সদস্যদের টেংরাকুড়ায় জড়ো করা হয়। ভোর ৪টা থেকে অভিযান শুরু হয়, চলে বিকেল ৩টা পর্যন্ত। তাঁর ভাষ্যমতে, অভিযানের আগে তাঁদের গোয়েন্দা বিভাগ এ অঞ্চল থেকে তথ্য নিয়েছে। তারা নিশ্চিত হয়েছে যে সেখানে জঙ্গিদের তত্পরতা রয়েছে। এ কারণে অভিযান পরিচালনার সুবিধার্থে তারা সারিয়াকান্দি ও ধুনটকে দুটি জোনে ভাগ করে। জোন-১-এ রাখা হয় কাজলা ইউনিয়নের টেংরাকুড়া এলাকা। জোন-২-এ রাখা হয় ধুনটের নিমগাছি এলাকার তালপট্টি, নান্দিয়ারপাড়া, নিমগাছি, দক্ষিণ বেরেরবাড়ি, নাংলু ও ফরিদপুরকে। তবে টেংরাকুড়া এলাকাটি অনেক বড়। এর মধ্যে আশপাশে চরঘাগুয়া, জামথল, বেড়াপাঁচবাড়িয়া ও মাদারগঞ্জের পাকরুল এলাকা রয়েছে।

অভিযানসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, শফিউল ইসলাম জিজ্ঞাসাবাদে গোয়েন্দাদের কাছে স্বীকার করেছে, জেএমবির হামলার নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে বেশ কয়েকজন জঙ্গি। সে সবার নাম জানে না। তবে তাদের কাছে ‘বড় ভাই’ হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীর সবার নাম জানে। জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে কয়েকটি গ্রুপ চালাচ্ছে ‘বাইক হাসান’ নামের আরেক জঙ্গি নেতা। তার দলে রয়েছে রিয়াজুল ও গোলাম রাব্বানী। তারা যেকোনো হামলার আগে ঘটনাস্থল রেকি করে। জাহাঙ্গীরের হাতে বড় ধরনের অস্ত্র রয়েছে। এসব অস্ত্র উত্তরাঞ্চলের কোনো চর এলাকায় মজুদ থাকতে পারে। জাহাঙ্গীরই তাদের (শফিউলসহ অন্যদের) গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে বাসা ভাড়া করে দিয়েছিল। তাদের আরেকটি আস্তানা ছিল জামালপুরে। সেখানে তাদের সবার যাতায়াত ছিল। এ দুটি বাসায় একাধিকবার আসে বাইক হাসানও। এ দলে ছিল খালেক নামে আরেক জঙ্গি। তাকে সবাই ‘মামা খালেক’ বলে ডাকে। বিজয় নামের এক যুবকও রয়েছে। তারা সবাই অস্ত্র পরিচালনায় প্রশিক্ষিত। যমুনার চরে তাদের অস্ত্র চালনোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। গুলশান হামলায় অংশ নেওয়া জঙ্গিরাও এ অঞ্চলে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। ওই প্রশিক্ষণে সে নিজেও ছিল। গত জুনের প্রথম সপ্তাহে চূড়ান্ত প্রশিক্ষণ শেষে তাদের বড় ধরনের হামলার জন্য প্রস্তুত করা হয়।

গুলশানে হামলাকারী পাঁচজন গত ২৭ জুন ঢাকায় যায়। ১ জুলাই তারা হামলা চালায়। এরপর সে (শফিউল), আবীরসহ চারজন ৩ জুলাই শোলাকিয়ায় যায়। ব্রিফিংয়ে র‌্যাবের ডিজি বেনজীর আহমেদ জানান, তাঁদের কাছে তথ্য রয়েছে বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলে যমুনার বিভিন্ন চরে জঙ্গিরা গোপনে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। সেখানে তারা অস্ত্র চালানো শিখেছে মাসের পর মাস ধরে। স্থানীয় লোকজনের একটি অংশ এই জঙ্গিদের আশ্রয় না দিলে এভাবে তারা আস্তানা করতে পারত না। এ কারণে এখন অভিযানে জঙ্গিদের প্রশ্রয়দাতাকেও খুঁজে বের করা হবে।

গতকালের অভিযানে অংশ নেওয়া র‌্যাবের মেজর পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুদিন আগেই অভিযান চালানোর কথা ছিল। কিন্তু আরো নিশ্চিত হতে এবং প্রাপ্ত যাবতীয় তথ্য পর্যালোচনা শেষে রবিবার রাতে অভিযান চালানো হয়। অভিযান সফল হয়েছে। সেখানে যে জঙ্গি ঘাঁটি ছিল তার প্রমাণ মিলেছে। আমরা জানতে পেরেছি জেএমবি নেতা মাওলানা মাহফুজ, মাওলানা সায়েমসহ চার থেকে পাঁচজন এসব ঘাঁটিতে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিত।’

টেংরাকুড়া গ্রামের বাসিন্দাদের অনেকেই পরিচয় না প্রকাশের শর্তে জানিয়েছে, রাত ২টার দিকে হঠাৎ অনেক গাড়ির শব্দ ও আলোতে তাদের ঘুম ভেঙে যায়। সে সময় হ্যান্ড মাইকে সবাইকে যার যার ঘরে থাকতে বলা হয়। এরপর সারা রাত বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি করা হয়। চরে এতসংখ্যক র‌্যাব ও পুলিশ এর আগে তারা দেখেনি। স্থানীয়রা জানায়, এ অঞ্চলে কখনো পুলিশি টহল হয় না। এ সুযোগকেই কাজে লাগিয়েছে অপরাধীরা। বগুড়ার পুলিশ কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন কিছুই টের পায়নি। নিজেদের এলাকা না হওয়ায় জামালপুরের পুলিশও এখানে কখনো আসেনি।

র‌্যাবের মহাপরিচালক বলেন, তাঁরও ধারণা ছিল এটি একটি চর। চারদিকে পানি থাকবে। কিন্তু এ অঞ্চলে যে সরাসরি সড়কপথ (টেংরাকুড়া থেকে মাদারগঞ্জ পর্যন্ত) তৈরি হয়েছে তা তাঁদের জানা ছিল না। দুপুরে দক্ষিণ টেংরাকুড়া চরের গ্রামে গিয়ে দেখা যায় র‌্যাবের নেতৃত্বে সেখানে পুলিশ ও বিজিবির ছয় শতাধিক সদস্য সশস্ত্র অবস্থান নিয়েছে। কর্মকর্তাদের ব্যবহূত পাজারো জিপ, মাইক্রোবাস ও ভ্যান মিলে শতাধিক গাড়ি পার্ক করে রাখা হয়েছে স্থানীয় শাহজালাল বাজারের পাশের আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাঠে। সেখানে চরের মাঠে বালির মধ্যে মঞ্চ করে প্রেস ব্রিফিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। বিকেল ৪টায় র‌্যাবের মহাপরিচালক সেখানে পৌঁছান। ব্রিফিং চলাকালে তাঁকে নিতে একটি হেলিকপ্টার আসে। আধাঘণ্টার ব্রিফিং শেষে তিনি হেলিকপ্টারে করে র‌্যাবের অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে ঢাকায় ফিরে যান।

র‌্যাব-১২-এর অধিনায়ক শাহাবুদ্দিন খান বলেন, ‘শুধু সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধার হলেই যে অভিযান ভালো হয় তা নয়। আমরা সারা রাত বৃষ্টিতে ভিজে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়েছি। এলাকা ঘেরাও করে জঙ্গিদের আস্তানা চিহ্নিত করেছি। সে কারণে এটি সফল অভিযান। আর এ বিশাল প্রস্তুতি চরের মানুষের জন্য একটি বড় মেসেজ। তাদের বলা হয়েছে অপরিচিতদের ব্যাপারে সচেতন থাকতে। সন্দেহভাজন কাউকে দেখলে র‌্যাবকে খবর দিতে।’

অভিযান শেষ হয়েছে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, আজকের (সোমবার) মতো শেষ। কর্মকর্তারা ফিরে গেছেন। তবে প্রয়োজনে যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো জায়গায় অভিযান চালানো হবে। অভিযানের খবর জানাতে বিকেলে ধুনটের সোনাহাটা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন র‌্যাব-৫ (রাজশাহী)-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মাহবুব আলম। তাঁর ভাষ্যমতে, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে র্যবের নেতৃত্বে বিজিবি ও পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে। তবে অভিযানে কোনো জঙ্গি বা সন্দেহভাজন কাউকে আটক করা হয়নি।