শেকল-তালায় ৬ বছর বন্দী ৮ বছরের শিশুটি-খবরটি ফেসবুকে এখন ভাইরাল

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, আট বছরের শিশু মাধবী ছয় বছর ধরে শেকল-তালায় বন্দী জীবন কাটাচ্ছে। তা-ও নগরীর ষোলশহর স্টেশন সংলগ্ন গ্রীন ভ্যালি আবাসিকের ২ নম্বর সড়কের ওপরই। খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে মলমূত্র ত্যাগ সবই সেখানে। কেবল রাতের বেলা ঘুমানোর সময়ই তাকে বাসায় নেওয়া হয়।

শুক্রবার (০৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, চসিকের সদ্য কংক্রিট ঢালাইয়ের সড়কটিতে মাধবীর খুঁটিটি বিশেষভাবে স্থান দেওয়া হয়েছে। ডান পায়ে শেকল পেঁচিয়ে মাঝারি আকৃতির একটি তালা, কিছুটা বড় আকৃতির আরেকটি তালা খুঁটির সঙ্গে। শেকল যাতে গলিয়ে নিয়ে পালিয়ে যেতে না পারে সে জন্য লম্বাকৃতির একটি নাট-বল্টু ব্যবহার করা হয়েছে। আশপাশের মানুষ, বিশেষ করে শিশু-কিশোররা মাধবীকে উত্ত্যক্ত করছে। রাস্তায় ছড়িয়ে আছে বিস্কুট, চিপস। অমানবিক পরিবেশে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে শিশুটি। মাধবীর ভালো নাম শারমিন আকতার।  

মাধবীর মা মেরেজা বেগম বাংলানিউজকে জানালেন, মাধবীকে শেকল দিয়ে বেঁধে রেখেই তিনি প্রতিদিন দুটি বাসায় বুয়ার কাজ করেন। তার স্বামী সাইদুল ইসলাম রিকশা চালান।

গাইবান্ধার লক্ষ্মীপুরের কামালপাড়ার মেরেজা জানান, চট্টগ্রাম শহরে যখন চায়ের কাপ এক টাকা ছিল তখন তিনি এখানে আসেন। এখন চায়ের কাপ ছয় টাকা হয়েছে। কিন্তু তখন যে পরিশ্রম করতেন এখন তার দ্বিগুণ পরিশ্রম করেও সংসারের ঘানি টানতে কষ্ট হচ্ছে।

বললেন, তিন ছেলে দুই মেয়ের মধ্যে মাধবী চার নম্বর সন্তান। প্রথম দুবছর স্বাভাবিক ছিল। এরপর খেয়াল করলাম, সে কথা বলতে পারে না। বাবা, মা ডাকতে পারে না। এভাবেই বড় হচ্ছে। খালি দৌড়াদৌড়ি করে, দ্বিগ্বিদিক ছোটাছুটি করে। একপর্যায়ে আশপাশের ভবনের ছাদে ওঠে লাফ দিতে চায়। ঝুলে থাকে। উঁচু দেয়ালে উঠে হাঁটতে থাকে। মানুষ আতঙ্কিত হয়। আমাদের ভয় হয়, কখন কোন অঘটন ঘটে।

শুরুর দিকের কথা জানতে চাইলে বলেন, দুতিন মাস পরপর খিঁচুনি ওঠে। জিভ বের হয়ে যায় তখন। মেয়ের নড়াচড়ার শক্তিও থাকে না ওই সময়। সবাই বলে জ্বিনের বাতাস লেগেছে। আমরা ওঝা-বৈদ্যের কাছে ঝাড়-ফুঁক করি। তিন হাজার টাকা সিএনজি ট্যাক্সি ভাড়া দিয়ে রাঙামাটির বড়ইছড়ির পাহাড়ি বৈদ্যের কাছে নিয়ে গেছি মাধবীকে। বৈদ্য মাত্র পাঁচ টাকা ফি নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, মাধবীর দুটি জ্বিন আছে। একটি ভালো, আরেকটি খারাপ।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে গেছেন কিনা জানতে চাইলে মেরেজা বাংলানিউজকে বললেন, ছয় বছরে তিনবার নিয়ে গেছি। যখন বেশি বেশি খিঁচুনি উঠেছিল। আমরা গরিব মানুষ বাচ্চার চিকিৎসার টাকা পাবো কই?

মাধবীর মায়ের কথার সূত্র ধরে চমেক হাসপাতালের মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ডা. মহিউদ্দিন সিকদারের সঙ্গে মোবাইলে কথা হয় বাংলানিউজের। তিনি বললেন, খিঁচুনি রোগ থাকলে, মৃগী রোগ থাকলে অনেকের মানসিক অসুখও দেখা দেয়। এক্ষেত্রে অস্বাভাবিক-উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে। দীর্ঘকাল যদি সুচিকিৎসা না হয় তবে জটিল ‍আকার ধারণ করে। মাধবীর কী হয়েছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলাই ভালো হবে।

ঝাড়-ফুঁক ও ওঝা-বৈদ্যের চিকিৎসাকে ভণ্ডামি ও কুসংস্কার আখ্যা দিয়ে এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, নিম্নআয়ের লোকজনের ঝাড়-ফুঁকে বেশি ঝোঁক লক্ষ করা যায়। একটি শিশুকে শেকল-তালা দিয়ে বেঁধে রাখা সমস্যার সমাধান নয়। সমাধান হচ্ছে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ। ক্যানসারের যেখানে চিকিৎসা হচ্ছে সেখানে ওই শিশুর অবশ্যই চিকিৎসা রয়েছে। বেঁধে রাখলে ক্রমে তার মেজাজ আরও খারাপ হবে, আরও উগ্র আচরণ করবে। রোগ-জীবাণুর সঙ্গে বসবাসের ফলে নানান স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে। যত দ্রুত সম্ভব শিশুটিকে হাসপাতালে নিয়ে আসা উচিত। মেয়েটিকে খিঁচুনির জন্যে নিউরোমেডিসিন বিভাগে এবং মানসিক সমস্যার জন্যে আমাদের বিভাগে চিকিৎসা দিতে হবে। তার সুচিকৎসা পাওয়াটা নাগরিক অধিকার।

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের (বিএইচআরসি) মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক বাবুর মতামত জানতে চাইলে বাংলানিউজকে বলেন, এতটুকুন একটি বাচ্চার সঙ্গে এ ধরনের অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে এই প্রথম শুনলাম। হয়তো পরিবারটির অজ্ঞতা বা কুসংস্কার কিংবা আর্থিক অসচ্ছলতার কারণেই অনাকাঙ্ক্ষিত এ ঘটনা। কালই (শনিবার) আমরা শিশুটিকে দেখতে যাবো। তাকে চমেক হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করবো।

সুত্রঃ বাংলানিউজ২৪.কম