হঠাৎ নড়ে উঠল ‘মৃত’ নবজাতক

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভূমিষ্ঠ হয় এক শিশু। মাতৃগর্ভে ছয় মাস থাকার পর পৃথিবীতে আসে সে। জন্মের পরই নবজাতককে নিয়ে উৎকণ্ঠায় পড়ে স্বজনরা। একসময় শিশুটির নড়াচড়া, শ্বাস-প্রশ্বাসও বন্ধ হয়ে যায়। দায়িত্বশীল চিকিৎসক পরীক্ষা করে জানিয়ে দেন, মারা গেছে শিশুটি। লেখা হয় ডেথ সার্টিফিকেটও। ঘটনাকে দুর্ভাগ্য মেনে নবজাতককে দাফন করতে যায় স্বজনরা। কবর দেওয়ার জন্য গোসল করানো হচ্ছিল শিশুটিকে। ঠিক তখনই নড়ে ওঠে সে। মুখ খুলে হাত-পা নাড়তে থাকে নবজাতকটি। এমন দৃশ্য দেখে চমকে ওঠে কবরস্থানে জড়ো হওয়া লোকজন। শিশুটিকে নিয়ে ফের হাসপাতালে ছোটে তারা। সেখানে চিকিৎসকরা আবার পরীক্ষা করে দেখেন, শিশুটি বেঁচে আছে। গতকাল শনিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও আজিমপুর কবরস্থানে ওই নবজাতককে নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়।

ভুলে মৃত ঘোষণা করা শিশুটিকে এখন নবজাতক ওয়ার্ডের (২১১ ওয়ার্ড) নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভেন্টিলেটরের মাধ্যমে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দিয়ে রাখা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার অবস্থা সংকটাপন্ন। এদিকে জীবিত নবজাতককে মৃত ঘোষণা করার ঘটনায় চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ঢাকা মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ওই শিশুর ডেথ সার্টিফিকেট লেখার ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। এভাবে ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়া ঠিক হয়নি। তিনি জানান, এ ঘটনায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এ বি এম জামালকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি পাঁচ দিনের মধ্যে কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঘটনার জন্য দায়ী চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে পরিচালক ও গাইনি বিভাগীয় প্রধান ভুল ডেথ সার্টিফিকেট লেখা চিকিৎসকের নাম প্রকাশ করেননি।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের প্রধান ডা. ফেরদৌসি ইসলাম জানান, শুক্রবার রাত ১০টার দিকে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা সুলতানা আক্তার হাসপাতালে ভর্তি হন। ভর্তির দুই ঘণ্টা পর স্বাভাবিকভাবেই ছেলেসন্তান প্রসব করেন তিনি। শিশুটি ‘প্রিম্যাচিউরড’ হওয়ায় ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর শ্বাসকষ্ট ছিল ও হৃদস্পন্দন কম ছিল। সঙ্গে সঙ্গে ২১১ নম্বর ওয়ার্ডের ইনকিউবিটরে রাখা হয়। গতকাল সকালে শিশুটির নানি হনুফা বেগম কোলে নিয়ে দেখতে পান, শিশুটির শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক নেই। এরপর ২১২ নম্বর ওয়ার্ডের চিকিৎসককে এটা জানালে তিনি ওয়ার্ডের সহকারী রেজিস্ট্রারকে পরীক্ষা করার নির্দেশ দেন। সহকারী রেজিস্ট্রার হৃদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করে শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর তিনি শিশুটির ডেথ সার্টিফিকেট লেখেন। ডেড সার্টিফিকেট নম্বর ৬৩৭০/১৮০। ডেথ সার্টিফিকেট লেখার পর শনিবার সকালে অভিভাবকরা দাফনের জন্য আজিমপুর কবরস্থানে নিয়ে গোসল করানোর সময় নড়ে ওঠে শিশুটি।

নবজাতকের বাবা জাহাঙ্গীর আলম জানান, ঢাকার কেরানীগঞ্জের চুনকুঠিয়া এলাকায় তাঁদের বাড়ি। মৃত ঘোষণা করা ছেলেটি তাঁর দ্বিতীয় সন্তান। গতকাল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে নবজাতককে নিয়ে তাঁরা আজিমপুর কবরস্থানে যান। সেখানে গোসল করানোর সময় শিশুটি নড়ে ওঠে। এরপর দুপুর ১২টার দিকে শিশুটিকে আবার হাসপাতালে নিয়ে আসেন তাঁরা।

শিশুটির শেষ অবস্থা জানতে চাইলে ডা. ফেরদৌসি ইসলাম বলেন, ‘যেসব শিশু ছয় মাসে ভূমিষ্ঠ হয়, তাদের বাঁচানো খুব কঠিন হয়।’

প্রসঙ্গত, গত বছরের ৪ ডিসেম্বরও অজ্ঞাতপরিচয় এক নারীকে জীবিত অবস্থায় মৃত ঘোষণা করা হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। তিন ঘণ্টা পর মর্গে নেওয়া হলে সেই নারী নড়ে ওঠেন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।