হিটলার কেন এত অসংখ্য ইহুদিদের হত্যা করেছিল?

hitlar

গত কয়েকদিন আগে পত্রিকায় দেখলাম ইসরাইলে ইহুদিদের সংখ্যা ৬ মিলিয়ন মানে ৬০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। খবরটি পড়ে ভাবছিলাম, এটা কি এমন গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। ৬০ লাখ ছাড়িয়েছে তো কি হয়েছে? পুরো সংবাদ পড়ে এর শানেনযুল বুঝতে পারলাম। ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে ব্যাপকহারে ইহুদি নিধন হয়েছে জার্মানির নাৎসি বাহিনী দ্বারা তা ইতিহাসে হলোকাস্ট নামে পরিচিত। এই হলোকাস্টে ৬০ লাখের উপর ইহুদিদের হত্যা করা হয়েছে বর্বরচিত ভাবে যা থেকে অবোধ শিশু ও নারীরাও রক্ষা পাইনি। সেই সময়কার জার্মানির চ্যান্সেলার এড্লফ হিটলার ছিল সেই গণহত্যার কুখ্যাত নায়ক।

এড্লফ হিটলার কেন ইহুদিদের ঘৃণা করতো?এই প্রশেড়বর উত্তর খুব একটা সোজা না। এই প্রশেড়বর উত্তর নিয়ে গত ৭০ বছর ধরে গবেষণা চলছে। আমার নিজেরও এই ব্যাপারটিতে গভীর আগ্রহ আছে। মানবজাতি সৃষ্টির পর থেকেই জাতিগত দাঙ্গা, ধর্ম নিয়ে যুদ্ধ ও হানাহানির বিরাট ইতিহাস রয়েছে। আমি ওসব দিকে যেতে চাই না। এই প্রবন্ধে আমার আগ্রহ শুধুমাত্র হিটলারকে ঘিরে। কেন সে এই জঘণ্য কাজটা করলো? শুধু কি নিজের স্বার্থে? নাকি শুধুমাত্র জার্মানদের স্বার্থ রক্ষায়? কে কতটুকু জানে এই বিষয়ে এটাও আমি জানার চেষ্টা করে এই প্রবন্ধে স্থান দিব ঠিক করেছি।

সর্বপ্রথমে আমার বড় ছেলে আযানকে (ছেলে হিসেবে নয়, আমেরিকান ইউনিভার্সিটির ছাত্র হিসেবে) জিজ্ঞেস করলাম, কেন হিটলার ইহুদিদের ঘৃণা করতো? ছেলে (১৯ বছর বয়স) একমুহুর্ত নিল না উত্তর দিতে। বলল, হিটলার অনেক ছবি আঁকতো। তখন তার খুব ইচ্ছা ছিল আর্ট স্কুলে ভর্তি হওয়া। হিটলার ভিয়েনাতে থাকতো। জানা যায় তাকে আর্ট কলেজে থেকে বেশ কয়েকবার প্রত্যাখ্যাত হতে হয়েছিল। কারণ আর্ট স্কুলের রেকটর ছিলেন ইহুদি। এবং ইহুদি ছাত্ররা সংখ্যাগরীষ্ঠ ছিল পুরো কলেজে। আযানের সামনে ছিল ল্যাপটপ। সে দ্রুত আমাকে হিটলারের আঁকা অনেক ছবি দেখাল। ছবিগুলো দেখে আমার ভালই লাগলো। ভালোই ছবি আঁকতো হিটলার।

হিটলারের লেখা দুই পর্বের বই “মেইন ক্যাম্প এর অংশবিশেষ পড়ে আরও অজানা অনেক কিছু জানা গেল। তবে সব যে সত্য তা অবশ্যই না। অনেক কিছুই বাড়িয়ে লেখা রয়েছে। বইটির অরিজিনাল

ভার্শনের দাম ২০০০ ডলার। তবে সাধারণ ভার্শন ১৩ ডলারে ওয়াল-মার্টে পাওয়া যায়। তবে বইটি লাইব্রেরীতেও আছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ৭০ বছর পার হয়ে গেছে। হিটলার ও তার স্ত্রী ইভা ব্রাইনের কথিত আত্মহত্যা বা মৃত্যুর পর গত সত্তুর বছরে অসংখ্য বই বেরিয়েছে এই হলোকাস্ট বিষয়ে। সম্প্রতি একটি বইয়ে লেখা হয়েছে হিটলার আত্মহত্যা করেনি। সেসময়ে সে তার স্ত্রী সহ সাবমেরিনে করে জার্মানি থেকে আর্জেন্টিনা পালিয়ে গিয়েছিল এবং সেখানে বার্ধক্যজনিত কারণে পরে মারা যায়। যদিও এই বিষয়টিকে কেউ বিশ্বাস করেনি। কন্সপিরেসী থীওরীতে এই জাতীয় অনেক আজগুবী বিষয় জানা যায়।

২০০৯ সালে জামার্নিতে প্রকাশিত জার্মান ইতিহাসবিদ ও প্রবীন সাংবাদিক ড: জে. রিকার-এর লেখা বই “নভেম্বর নাইন: হাউ ওয়ার্ল্ড ওয়ার ওয়ান লেড টু দ্য হলোকাস্ট” থেকে জানা যায় হিটলার প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের পরাজিত হওয়ার কারণ হিসেবে একমাত্র ইহুদিদের দায়ী করতো। ইহুদিরাই জার্মানদের বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে এই বিশ্বাস ছিল হিটলারের। এবং তার আরো দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, নভেম্বর ৯, ১৯১৮ সালে জামার্নির রাজতন্ত্রের বিলোপ ইহুদিদের দ্বারা সংগঠিত হয়েছিল। তখন হিটলার বসবাস করতো মিউনিখে এবং সেখান থেকেই ইহুদিরা বিপ্লব করে রাজতন্ত্র ধ্বংস করেছিল। হিটলার সবসময় মনে করতো দেশ ইহুদিদের দ্বারা বিষাক্ত হয়ে উঠেছে এবং দেশের অভ্যন্তরে তারা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তবে ড: রিকার দ্বিমত পোষণ করেন হিটলারের এন্টিসেমিটিজম বা ইহুদি-বিদ্বেষের পূর্ববর্তী ধারণার সাথে যাতে বলা হয়েছে হিটলারের মনে ইহুদিদের বিরুদ্ধে ঘৃণার বীজ বপন হয়েছিল যখন ১৯০৭ সালে হিটলারের মা ক্লারা মারা যান একজন ইহুদি ডাক্তার এডওয়ার্ড ব্লোচ-এর অধীনে চিকিৎসারত অবস্থায়। তিনি লিখেছেন, হিটলার একমাত্র ভালোবাসতো তার মা ও জার্মান জনগণকে। তার মনের মধ্যে বিভ্রম সৃষ্টি হয়েছিল যে ইহুদিদের নির্মূল করতে পারলেই বিশ্ব জয় করতে পারবে।

ড: রিকার হিটলারের অনেক বক্তৃতা বিশ্লেষণ করে উপরোক্ত যুক্তি খাঁড়া করেছেন। জার্মান পত্র-পত্রিকা এই বইটিকে গুরুত্বপূর্ণ ও তথ্যমূলক বলে অভিহিত ও প্রশংসা করেছে।

তবে ব্রিটিশ টেলিগ্রাফ পত্রিকা ড: রিকার-এর এই বইয়ে অনেক স্ববিরোধী বক্তব্য পর্যবেক্ষণ করেছে। হিটলারকে মহৎ বানানোর চেষ্টাও এই বইতে করা হয়েছে। যদিও সাধারণ জার্মান নাগরিকগণ হিটলারকে এখনো হিরো মনে করে। এই বইতে আমেরিকান ইতিহাসবিদ রুডল্ফ বিনিয়নের হিটলারের ইহুদি বিদ্বেশের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত ইহুদি ডাক্তার দ্বারা তার মায়ের চিকিৎসা প্রμিয়াকে সমর্থন করা হয়নি। এমনকি যেখানে সবাই জানে হিটলার সেই ইহুদি ডাক্তারকে মনপ্রাণে ঘৃণা করতো এবং কখনও ক্ষমা করেনি। ১৯৪০ সালে সেই ইহুদি ডাক্তার সব সম্পত্তি বিμি করে স্ত্রী সহ আমেরিকাতে চলে যায়। বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের মতো। ব্রিজিট হামান নামক আরেক জার্মান ইতিহাসবিদ ও লেখক তাঁর এক বইতে লিখেছেন হিটলারের মায়ের চিকিৎসককে হিটলার সৎ ইহুদি মনে করতো।

১৯৩০ সালের প্রথমদিকে হিটলারের নাৎসী বাহিনী জার্মানিতে ক্ষমতায় আসে। এবং ১৯৩৩ সালে হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর নিযুক্ত হন। হিটলার জার্মানির জনগণকে বোঝাতে সক্ষম হন যে তিনি চ্যান্সেলর হলে দেশকে উনড়বতির পথে নিয়ে যাবেন এবং দেশের বিরুদ্ধে সকল প্রতিবন্ধকতা অচিরেই দূর করবেন। তখন প্রথম মহাযুদ্ধে জার্মানির শোচনীয় পরাজয় ও পরবর্তীতে গ্রেট ডিপ্রেশনের চাপে জনগণের অবস্থা ছিল করুণ। এডলফ্ হিটলাকে সকল জার্মান সমর্থন করে। ১০ লাখ ইহুদি নিধনে তাদের যে কোনো আপত্তি ছিল না তা সহজেই বোঝা যায়। কারণ জনগণের সমর্থন না থাকলে হিটলারের একার পক্ষে এত লোক হত্যা সম্ভব ছিল না এটা সহজেই অনুমেয়। চ্যান্সেলর হওয়ার পর হিটলার জার্মানদের অনেক সুযোগ সুবিধা দান করেন। জনগণকে সোসাল বেনিফিট দেন, ট্যাক্স কমান এবং সৈন্যদের বেতন ভাতা এবং সুযোগ-সুবিধার প্রচুর বৃদ্ধি করেন। ইহুদিদের হত্যার ব্যাপারে জার্মানদের কোনো মাথাব্যথা না হওয়ার কারণ আরেক কারণ ছিল

রাশিয়া। তারা মনে করতো রাশিয়াতে হরদম এটা হচ্ছে। জার্মান জনগণের স্বার্থে নাৎসী বাহিনী যা ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ করেছে তা তারা মনে করতো হিটলার তার জনগণকে ভালোবেসেই করেছে।

মনে প্রশড়ব জাগে, হিটলার এখন বেঁচে থাকলে কি করতেন? কারণ মানুষের দেহের ভেতর কোটি কোটি কোষের মতো সারা পৃথিবীতে ইহুদিরা জাল বিছিয়ে রয়েছে। আর এর পেছনে রয়েছে ইহুদিদের নিজেদের মধ্যে একত্বতা। এরাই এখন বিশ্বের বড় বড় সব কম্পানির শীর্ষে বসে রাজত্ব করছে। আমেরিকাও এর ব্যতিμম নয়। ইতিহাস এখন সাক্ষী যে হিটলারের ইহুদি নিধণ ফর্মুলা একটি ব্যর্থ প্রজেক্ট ছাড়া কিছুই নয়।